এক চোখে দেখতে পান না, প্রতিস্থাপন করা হয়েছে কিডনিও, শীর্ণকায় রানাকে ফিরিয়ে দিতে হয়েছিল অগ্রিম নেওয়া টাকা
২০১০ সালে রাজনৈতিক থ্রিলার ঘরানার ‘লিডার’ ছবির মাধ্যমে তেলুগু ইন্ডাস্ট্রিতে অভিনেতা হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেন রানা দগ্গুবতী। এক বছর পর ২০১১ সালে ‘দম মারো দম’ ছবির মাধ্যমে বলিপাড়ায়ও পা রাখেন তিনি। এস এস রাজামৌলীর ‘বাহুবলী’তে অভিনয়ের পর তাঁর জনপ্রিয়তা আকাশ ছুঁয়ে ফেলে।
দেহসৌষ্ঠব, রূপ, স্টান্টে পারদর্শী। ফিটনেস বিষয়ে বেশ সচেতন, স্বাস্থ্যবান ‘বাহুবলী’ খ্যাত অভিনেতা রানা দগ্গুবতী। কিন্তু বড়পর্দায় ক্যামেরার আড়ালে অভিনেতার বাস্তব একেবারেই আলাদা। এক চোখে দেখতে পান না রানা। কিডনির সমস্যা বেড়ে যাওয়ায় কিডনি প্রতিস্থাপনও করাতে হয়েছে তাঁকে। স্বাস্থ্যের প্রভাব পড়েছে তাঁর পেশাজীবনেও।
দক্ষিণের চলচ্চিত্রজগতের প্রযোজক সুরেশ বাবুর ছেলে এবং জনপ্রিয় প্রযোজক ডি. রামানাইডুর নাতি রানা। পরিবারের সূত্রে বিনোদনজগতের সঙ্গে শৈশব থেকেই যুক্ত তিনি। অভিনয়ের আগে তিনি চলচ্চিত্রনির্মাণের কারিগরির কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। বহু ছবিতে ‘ভিস্যুয়াল এফেক্টস’-এর কাজও করেছেন তিনি।
২০১০ সালে রাজনৈতিক থ্রিলার ঘরানার ‘লিডার’ ছবির মাধ্যমে তেলুগু ইন্ডাস্ট্রিতে অভিনেতা হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেন রানা। এক বছর পর ২০১১ সালে ‘দম মারো দম’ ছবির মাধ্যমে বলিপাড়ায়ও পা রাখেন তিনি। হিন্দি, তামিল এবং তেলুগু ভাষার ছবিতে পর পর অভিনয় করছিলেন রানা। এস এস রাজামৌলীর ‘বাহুবলী’তে ভল্লালদেবের চরিত্রে অভিনয়ের পর তাঁর জনপ্রিয়তা আকাশ ছুঁয়ে ফেলে।
সুঠাম চেহারার জন্য রানা এমন চরিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাব পেতে শুরু করেন যে, তাঁর জন্য নিয়মিত শরীরচর্চা এবং দেহসৌষ্ঠব বজায় রাখা প্রয়োজন। কিন্তু কাজের চাপে তিনি স্বাস্থ্যের প্রতি অবহেলা করতে শুরু করেন। চিকিৎসকদের সাবধানবাণী থাকা সত্ত্বেও তা কানে তোলেননি রানা। পরে তার মূল্যও দিতে হয় অভিনেতাকে।
সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে রানা জানান, দীর্ঘ দিন ধরে হাইপারটেনশনের সমস্যায় ভুগছিলেন তিনি, যা ধীরে ধীরে তাঁর কিডনির কার্যক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছিল। চিকিৎসকেরা সেই বিষয়ে রানাকে সাবধানও করেছিলেন। কিন্তু অতিরিক্ত কাজের চাপ নিয়ে নেওয়ায় স্বাস্থ্যকে অবহেলা করেছিলেন অভিনেতা।
আরও পড়ুন:
২০১৭ সালে কিডনির সমস্যা গুরুতর আকার ধারণ করেছিল রানার। কিডনি প্রায় অচল হয়ে পড়েছিল তাঁর। কিডনি প্রতিস্থাপন করা ছাড়া উপায় ছিল না। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর কিডনিদাতার সন্ধান পান রানা। শোনা যায়, অভিনেতার পরিবারের এক সদস্যই নাকি কিডনি দান করতে রাজি হন।
২০১৭ সালে মুম্বইয়ের এক হাসপাতালে কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয় রানার। কিডনির সমস্যা সারতে না সারতেই হার্টের অসুখ ধরা পড়ে তাঁর। চিকিৎসার জন্য দীর্ঘ দিন আমেরিকায় ছিলেন অভিনেতা। সেই সময় অভিনয় থেকে সাময়িক বিরতিও নিতে হয়েছিল তাঁকে।
রানা সাক্ষাৎকারে জানান, অসুস্থতার কারণে তাঁর স্বাস্থ্য ভীষণ দুর্বল হয়ে গিয়েছিল। তিনি বেশ কয়েকটি ছবিতে অভিনয়ের জন্য চুক্তিপত্রে সই করে ফেলেছিলেন। কিন্তু শীর্ণকায় চেহারা নিয়ে যে আর সেই চরিত্রগুলিতে অভিনয় করা যাবে না, তা স্পষ্ট বুঝতে পেরেছিলেন অভিনেতা।
সাক্ষাৎকারে রানা বলেন, ‘‘আমার কাছে এমন এমন চরিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাব এসেছিল, যার জন্য সুঠাম শরীর থাকার প্রয়োজন। কুস্তিগিরের চরিত্রের প্রস্তাবও পেয়েছিলাম। বুঝতে পারছিলাম, এই চরিত্রগুলি হাতছাড়া হয়ে যাবে। আমি অভিনয় করতে পারব না। চুক্তিপত্রে সই করার পর অগ্রিম হিসাবে যা টাকা পেয়েছিলাম, সব ফিরিয়ে দিতে শুরু করেছিলাম।’’
আরও পড়ুন:
অভিনয় ছাড়া কী করবেন তা স্থির করতে পারছিলেন না রানা। অভিনয় থেকে সাময়িক বিরতি নিয়ে তিনি তাই স্বাস্থ্যের প্রতি নজর দিলেন। নিয়মিত শরীরচর্চা এবং সঠিক ডায়েট মেনে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠেন তিনি।
২০১৭ সালের পর কয়েকটি ছবিতে অভিনয় করলেও ক্যামেরার আড়ালেই বেশি করে কাজ করতে শুরু করেন রানা। প্রযোজনা থেকে শুরু করে নেপথ্য কণ্ঠশিল্পী হিসাবে কাজ করেন তিনি। ২০২৫ সালে মুক্তি পাওয়া দুলেকর সলমন অভিনীত ‘কান্থা’ ছবিতে শেষ অভিনয় দেখা গিয়েছে রানার। সেই ছবির প্রযোজনার দায়িত্বেও ছিলেন তিনি।
শৈশব থেকেই এক চোখে দেখতে পান না রানা। সেই অবস্থায় দিনের পর দিন অভিনয় করে চলেছেন তিনি। রানা এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, শৈশবে তাঁর চোখে একাধিক বার অস্ত্রোপচার করানো হয়েছিল। তাঁর বাবা-মা অনেক নামকরা চিকিৎসককেও দেখিয়েছিলেন। তবে কোনও চিকিৎসাতেই তাঁর দৃষ্টিশক্তি ফিরে আসেনি।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই শারীরিক অক্ষমতাকে শক্তি হিসাবে গ্রহণ করে নেন রানা। রানার দাবি, এই সমস্যাটি তাঁর জন্মগত। খুব সম্ভবত অপটিক নার্ভের কোনও ত্রুটি থেকেই চোখে এই সমস্যা দেখা দিয়েছিল তাঁর। ডান চোখে কোনও কিছুই স্পষ্ট দেখতে পান না তিনি। বাঁ চোখই তাঁর সম্বল।
রানার মা নাকি উৎসাহ দেওয়ার জন্য অভিনেতাকে বলতেন, ‘‘তোর জন্য জীবনে অনেক বড় কিছু অপেক্ষা করছে। চোখের সমস্যা তোর জীবনের একটা অংশ।’’ মায়ের এই ইতিবাচক মানসিকতা থেকেই কেরিয়ারে এগিয়ে যাওয়ার জোর পেয়েছেন বলে দাবি ‘বাহুবলী’র অভিনেতার।