‘মৃত, গরহাজির, স্থানান্তরিত ও ডুপ্লিকেট’ হিসেবে চিহ্নিত ভোটারদের বাদ দিয়ে ‘অন্য’ যে ভোটারদের নাম এসআইআর-এ বাদ গিয়েছে, নির্বাচন কমিশন তাঁদেরই নাম নাগরিকত্ব যাচাইয়ের জন্য কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের কাছে পাঠাবে। পশ্চিমবঙ্গে যে সব ভোটার ‘তথ্যগত অসঙ্গতি’-র জন্য ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন, তাঁদের নামও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের কাছে পাঠানো হবে। তবে এঁদের মধ্যে যে সব ব্যক্তি এসআইআর-এর আপিল ট্রাইবুনালের ছাড়পত্র পেয়ে যাবেন, তাঁদের নাম নাগরিকত্ব যাচাই করার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের কাছে পাঠানো হবে না। বিরোধীদের অভিযোগ, এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গোটা দেশে ঘুরপথে এনআরসি-র কাজ শুরু হয়ে যাচ্ছে।
বুধবারই সুপ্রিম কোর্ট এসআইআরের সাংবিধানিক বৈধতায় সিলমোহর দেয়। নির্বাচন কমিশনকে নির্দেশ দেয়, এসআইআর-এর সময় যে সব ব্যক্তির নাগরিকত্ব নিয়ে কমিশন সন্তুষ্ট হতে পারেনি বলে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দিয়েছে, তাঁদের চূড়ান্ত নাগরিকত্ব পরীক্ষার জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতাপ্রাপ্ত সংস্থার কাছে পাঠাতে হবে।
নির্বাচন কমিশন সূত্রের বক্তব্য, ১৯৫৫ সালের নাগরিকত্ব আইন অনুযায়ী কেন্দ্রের ক্ষমতাপ্রাপ্ত সংস্থা হল ফরেনার্স রেজিস্ট্রেশন অফিস (এফআরও) ও ফরেনার্স রিজিয়োনাল রেজিস্ট্রেশন অফিস (এফআরআরও)। যা কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের ‘ব্যুরো অব ইমিগ্রেশন’-এর অধীনে। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মেনে তাদের কাছে বিহার, পশ্চিমবঙ্গ-সহ ১৩টি রাজ্যে এসআইআর-এ বাদ যাওয়া নামের তালিকা পাঠানো হবে। মূলত ‘মৃত, গরহাজির, স্থানান্তরিত ও ডুপ্লিকেট’ বাদে ‘অন্য’ শ্রেণিতে থাকা যে সব নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ গিয়েছে, তাঁদেরই নাগরিকত্ব ‘সন্দেহজনক’ তালিকায় রয়েছে। একই সঙ্গে যাঁদের নাম তথ্যগত অসঙ্গতির জন্য বাদ পড়বে, তাঁদের নাগরিকত্ব ‘সন্দেহজনক’ তালিকায় থাকবে।
কমিশন সূত্র জানাচ্ছে, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মেনে, কমিশনের ইআরও বা এইআরও ভোটার তালিকায় চিহ্নিত ‘সন্দেহভাজন নাগরিক’-দের নামের তালিকা কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের এফআরও বা এফআরআরও-র কাছে পাঠিয়ে দেবেন। যদি যাচাই করে দেখা যায়, তাঁদের ভারতীয় নাগরিকত্বের দাবি সঠিক, তা হলে এফআরও, এফআরআরও-র তরফ থেকে আবার সে সব নাম কমিশনের কাছে পাঠানো হবে। তাঁদের নাম ভোটার তালিকায় যোগ করা হবে। যাঁরা নিজেদের নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে পারবেন না, তাঁদের এফআরও, এফআরআরও রাজ্যের আটক শিবির বা হোল্ডিং সেন্টারে পাঠানোর নির্দেশ দিতে পারে। সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের নির্দেশ মেনে পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি সরকার জেলায় জেলায় আটক শিবির তৈরির নির্দেশিকা জারি করেছে।
কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, বিহারের পরে ১২টি রাজ্যের এসআইআরে ৬.৫ কোটি নাম ‘মৃত, অনুপস্থিত, স্থানান্তরিত ও ডুপ্লিকেট’ বলে ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছিল। এর বাইরে আরও ১২.৭ লক্ষ নাম ‘অন্য’ তালিকায় রয়েছে। এর বাইরে প্রায় ৩৬ লক্ষ ভোটারের নামে অন্য কেউ ফর্ম-৭-এর মাধ্যমে আপত্তি তোলায় বাদ গিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের ২৭ লক্ষ নাম তথ্যগত অসঙ্গতির জন্য বাদ গিয়েছে। যাঁদের সামনে সুপ্রিম কোর্টের তৈরি আপিল ট্রাইবুনালে আবেদন জানানোর সুযোগ রয়েছে।
বিরোধীদের অভিযোগ, এই প্রক্রিয়ায় দেশ জুড়ে ঘুরপথে এনআরসি বা জাতীয় নাগরিক পঞ্জির কাজ শুরু হয়ে যাচ্ছে। সিপিএম পলিটবুরো বিবৃতি দিয়ে বলেছে, ‘সুপ্রিম কোর্ট বলেছে, নাগরিকত্ব নির্ধারণ নির্বাচন কমিশনের এক্তিয়ারের বাইরে। কিন্তু সেই নাগরিকত্বের মাপকাঠিতেই কমিশন যাঁদের নাম বাদ দিয়েছে, তাঁদের নাম কেন্দ্রের নির্দিষ্ট সংস্থার কাছে নাগরিকত্ব যাচাইয়ের জন্য পাঠাতে বলেছে। তাঁদের সবাইকে নিজেদের নাগরিকত্ব প্রমাণে বাধ্য করা হচ্ছে। যা আসলে ঘুরপথে এনআরসি চালু করা। যে এনআরসি-র বিরুদ্ধে গোটা দেশ প্রতিবাদ জানিয়েছিল।’
কংগ্রেসের প্রধান মুখপাত্র জয়রাম রমেশ বলেন, ‘‘কারা ভোট দেবেন, কারা দেবেন না, সেটাই ঠিক করছে মোদী সরকার। এসআইআর সেই উদ্দেশ্যেই। পশ্চিমবঙ্গ বা বিহার, বাছাই করা ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। এখন তাঁদের আপিল প্রক্রিয়ার মধ্যে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে, যা আসলে যথেচ্ছাচার।’’
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)