সুপ্রিম কোর্টের পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চ ২০২৩ সালে রায়ে নির্বাচন কমিশনারদের আচরণের মানদণ্ড ঠিক করে দিয়েছিল। বর্তমান মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার সেই মাপকাঠিতে ‘নিদারুণ ভাবে ব্যর্থ’ বলে বিরোধীরা তাঁর অপসারণের প্রস্তাবে অভিযোগ তুলেছেন। বিরোধী শিবির তাদের প্রস্তাবে জানিয়েছে, সুপ্রিম কোর্টের ওই রায়ের বিরুদ্ধে গিয়ে মোদী সরকার ২০২৩ সালে নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ আইন তৈরি করেছিল। সেই আইনেই জ্ঞানেশ কুমারকে নিযুক্ত করা হয়েছিল। অথচ মোদী সরকারের সেই আইনের সাংবিধানিক বৈধতাই সুপ্রিম কোর্টে চ্যালেঞ্জের মুখে।
তাৎপর্যপূর্ণ হল, শুক্রবারই সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে, মোদী সরকারের ২০২৩ সালের নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ আইনকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে যে সব মামলা দায়ের হয়েছে, আগামী ৭ এপ্রিল সেই সব মামলার শুনানি হবে। যার অর্থ, সংসদে ও সুপ্রিম কোর্টে একই সঙ্গে জ্ঞানেশ কুমারের নিয়োগ নিয়ে প্রশ্নের বিচার হতে চলেছে।
গত ১৩ মার্চ লোকসভা ও রাজ্যসভায় মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের পদ থেকে জ্ঞানেশ কুমারকে অপসারণের প্রস্তাবের নোটিস জমা দিয়েছেন বিরোধীরা। বিরোধীরা নোটিসে দাবি তুলেছেন, জ্ঞানেশ কুমারের ‘প্রমাণিত অসদাচরণ’-এর জন্য তাঁকে অপসারণ করতে রাষ্ট্রপতিকে বার্তা পাঠানো হোক। ১০ পৃষ্ঠার এই নোটিসে প্রথম ভাগে তিনটি বিষয় রয়েছে। এক, এই প্রস্তাবের সাংবিধানিক ও আইনি ভিত্তি ব্যাখ্যা করা হয়েছে। দুই, আইনে মুখ্যনির্বাচন কমিশনারের ‘প্রমাণিত অসদাচরণ’-এর কী কী ব্যাখ্যা রয়েছে, তা বলা হয়েছে। তিন, সুপ্রিম কোর্ট নির্বাচন কমিশনারের আচরণের কী মানদণ্ড ঠিক করে দিয়েছিল, তা জানানো হয়েছে। এই ক্ষেত্রেই সুপ্রিম কোর্টের ২০২৩ সালের পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চের রায় উল্লেখ করেছেন বিরোধীরা।
‘অনুপ বারানওয়াল বনাম ভারত সরকার’ নামে পরিচিত এই মামলার রায়ে সুপ্রিম কোর্ট বলেছিল, ‘একজন স্বাধীন নির্বাচন কমিশনার পক্ষপাতদুষ্ট হতে পারেন না। ঝড়ের মধ্যেও তাঁকে তুলাদণ্ড সমান ভাবে ধরে থাকতে হবে। তিনি ক্ষমতাবানের অনুগত হতে পারবেন না। কিন্তু দুর্বল ও নিপীড়িতের উদ্ধার করতে হবে। নির্বাচন কমিশন দেশের কাছে দায়বদ্ধ। দেশের মানুষ তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকেন যাতে গণতন্ত্র সবসময় সুরক্ষিত থাকে।’ বিরোধীদের অভিযোগ, এই মাপকাঠিতেই জ্ঞানেশ কুমারের বিচার হওয়া উচিত। কিন্তু তিনি মাপকাঠিতে একেবারেই উতরোতে পারেননি।
এর পরে জ্ঞানেশ কুমারের ‘অসদাচরণ’ প্রমাণ করতে তাঁর বিরুদ্ধে বিরোধীরা তাঁদের নোটিসে সাত দফা অভিযোগ তুলেছেন। এক, জ্ঞানেশের নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। দুই, তিনি পক্ষপাতিত্ব ও বৈষম্য করছেন। তিন, নির্বাচনী প্রতারণার তদন্তে বাধা দিয়েছেন। চার, বিহারে এসআইআর-এ বহু মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে। পাঁচ, সেই বিহার মডেল গোটা দেশে প্রয়োগ হচ্ছে। ছয়, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অমান্য করছেন। সাত, কমিশনের স্বাধীনতা রক্ষায় ব্যর্থ হয়ে তিনি শাসকের অঙ্গুলিহেলনেকাজ করছেন।
আইনজীবীদের ব্যাখ্যা, ‘অনুপ বারানওয়াল বনাম ভারত সরকার’ মামলায় মূলত মুখ্য নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগ পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। বিচারপতি কে এম জোসেফ, বিচারপতি অজয় রাস্তোগি, বিচারপতি অনিরুদ্ধ বসু, বিচারপতি হৃষিকেশ রায় এবং বিচারপতি সি টি রবিকুমারের বেঞ্চ রায় দিয়েছিল, কেন্দ্রীয় সরকার নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগের আইন তৈরি করবে। তত দিন প্রধানমন্ত্রী, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি ও লোকসভার বিরোধী দলনেতাকে নিয়ে তৈরি কমিটি নির্বাচন কমিশনার পদে নিয়োগের সুপারিশ করবে। কিন্তু মোদী সরকার আইন তৈরি করে যে কমিটি তৈরি করে, তাতে প্রধান বিচারপতিকে বাদ দিয়ে দেওয়া হয়। তার বদলে প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলনেতার সঙ্গে আর এক কেন্দ্রীয় মন্ত্রীকে রাখা হয়। যার অর্থ, কমিটিতে তিন জনের মধ্যে দু’জনই সরকারের লোক।
বিরোধীরা তাঁদের প্রস্তাবে বলেছেন, জ্ঞানেশ কুমারের নিয়োগের ক্ষেত্রে লোকসভার বিরোধী দলনেতা হিসেবে রাহুল গান্ধী ওই কমিটিতে আপত্তি জানিয়েছিলেন। তা সত্ত্বেও তাঁকে নিয়োগ করা হয়। আইনজীবীদের বক্তব্য, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ লঙ্ঘন করে এই আইনের বিরুদ্ধেই সুপ্রিম কোর্টে মামলা ঝুলে রয়েছে। শুক্রবারই প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত বলেছেন, তাঁর বা ভবিষ্যতের কোনও প্রধান বিচারপতির এই মামলার বিচার করা উচিত নয়। তাই অন্য কোনও বেঞ্চে ৭ এপ্রিল এই মামলার শুনানি হবে। ইতিমধ্যে লোকসভার স্পিকার ও রাজ্যসভার চেয়ারম্যানকেও বিরোধীদের প্রস্তাব গ্রহণ করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
সংবিধানের ৩২৪(৫), ১২৪ (৪)-তম অনুচ্ছেদ, ২০২৩ সালের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার, নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ আইনের ১১(২) ধারা এবং বিচারপতি তদন্ত আইনের প্রক্রিয়া মেনে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে অপসারণ করা যায়। আইনজীবী তথা রাজ্যসভার সাংসদ কপিল সিব্বল আজ সমাজমাধ্যমে এ বিষয়ে এক আলাপচারিতায় বলেছেন, ভারতের ইতিহাসে প্রথমবার মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে অপসারণের প্রস্তাবের নোটিস জমা পড়েছে। তা গ্রহণ করা হবে কি না, না কি প্রত্যাখ্যান করা হবে, তা লোকসভার স্পিকার ও রাজ্যসভার চেয়ারম্যানের উপরে নির্ভর করছে। লোকসভা ও রাজ্যসভা, সংসদের দুই কক্ষেই নোটিস জমা পড়েছে। নোটিস জমা দেওয়ার জন্য রাজ্যসভায় অন্তত ৫০ জন সদস্যের, লোকসভায় অন্তত ১০০ জন সাংসদের সই থাকা দরকার। নোটিসে রাজ্যসভার ৬৩ জন লোকসভার ১৩০জনের সই রয়েছে। এই প্রক্রিয়াসুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের অপসারণের প্রক্রিয়ার মতোই। জমা পড়ার পর এই নোটিস গৃহীত হতে পারে বা তা খারিজও করতে পারেন স্পিকার এবং রাজ্যসভার চেয়ারম্যান। ন্যূনতম প্রয়োজনের চেয়ে কত বেশি সাংসদের সই জমা পড়েছে, তার উপর প্রস্তাবের গ্রহণযোগ্যতা নির্ভরকরে না।
সিব্বল বলেন, যদি নোটিস গৃহীত হয়, তা হলে স্পিকার বা চেয়ারম্যান তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করবেন। কমিটিকে এক জন সুপ্রিম কোর্টের কর্মরত বিচারপতি, কোনও হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতি ও বিশিষ্ট আইনজ্ঞ থাকতে হবে। কমিটি স্পিকার বা চেয়ারম্যানকে রিপোর্ট দেবে। কমিটি যদি অভিযোগ ঠিক বলে মনে করে, তা হলে বিরোধীদের প্রস্তাব নিয়ে লোকসভা, রাজ্যসভায় বা কোনও একটি কক্ষে আলোচনা, ভোটাভুটি হবে। সংশ্লিষ্ট কক্ষের মোট সদস্যের সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থন এবং উপস্থিত ও ভোটে অংশ নেওয়া সদস্যদের দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থনে অপসারণের প্রস্তাব পাশ হলে তা রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানো হবে।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)