×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

১৯ জুন ২০২১ ই-পেপার

৭১ সাংসদের সায়, প্রধান বিচারপতিকে ইমপিচমেন্টের প্রস্তাব পেশ

নিজস্ব সংবাদদাতা
নয়াদিল্লি ২১ এপ্রিল ২০১৮ ০৩:৫৭
প্রধান বিচারপতি দীপক মিশ্র

প্রধান বিচারপতি দীপক মিশ্র

স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে এই প্রথম সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতিকে পদ থেকে সরানোর চেষ্টা শুরু হল।

কংগ্রেস, দুই বাম দল, সপা-বসপা-সহ উচ্চকক্ষের ৭১ সাংসদের স্বাক্ষর নিয়ে আজ রাজ্যসভার চেয়ারম্যান বেঙ্কাইয়া নায়ডুর কাছে প্রধান বিচারপতি দীপক মিশ্রকে ইমপিচ করার প্রস্তাব পেশ হল। প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে লোয়া-মামলার রায় আসার পরের দিনই। কংগ্রেসের দাবি, রেওয়াজ মেনে আজ থেকেই পদ ছাড়া উচিত প্রধান বিচারপতির।

কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলির মতে, লোয়া-মামলায় কংগ্রেসের মিথ্যাচার প্রমাণ হওয়ার পরে এটি বদলার আবেদন। কংগ্রেসের কপিল সিব্বল বলেন, এক সপ্তাহ আগেই বেঙ্কাইয়ার সময় চাওয়া হয়েছিল। আজ তিনি দেখা করেন। এর সঙ্গে লোয়া-মামলার সম্পর্ক নেই।

Advertisement

বিরোধীদের অভিযোগ

• লখনউয়ের মেডিক্যাল কলেজের পরিচালন সংস্থা প্রসাদ এডুকেশনাল ট্রাস্টের কর্তারা সুপ্রিম কোর্ট ও ইলাহাবাদ হাইকোর্টের বিচারপতিদের বিশেষ সুবিধা দিয়ে সুবিধেজনক রায় হাসিলের চেষ্টা করেছিলেন বলে অভিযোগ। এই ঘটনার সঙ্গে প্রধান বিচারপতির যুক্ত থাকার অভিযোগ বিরোধীদের।

• ওই ঘটনায় তদন্তের দাবিতে মামলা প্রধান বিচারপতি নিজেই শুনেছেন, রায়ও দিয়েছেন। ফলে বিচারপতিদের আচরণবিধির প্রথম নীতি ভাঙার অভিযোগ।

• প্রধান বিচারপতি পুরনো তারিখ বসিয়ে ২০১৭-র ৬ নভেম্বরের প্রশাসনিক নির্দেশিকা জারি করেন বলে অভিযোগ। যা কারচুপির মতো গুরুতর অপরাধের মধ্যে পড়ে।

• আইনজীবী থাকাকালীন প্রধান বিচারপতি অসত্য হলফনামা দিয়ে ওড়িশায় সরকারি জমি আদায় করেছিলেন বলে অভিযোগ। ২০১২-তে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি হওয়ার পরে তিনি তা ফেরত দেন।

• কোন মামলা কোন বিচারপতি শুনবেন, তা ঠিক করার ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে ‘ইচ্ছেমতো’ রাজনৈতিক ভাবে স্পর্শকাতর মামলা, বিশেষ কিছু আইনজীবীর মামলা নির্দিষ্ট কয়েকজন বিচারপতির কাছেই পাঠিয়েছেন, যাতে ‘পূর্বনির্ধারিত’ রায় দেওয়া হয়।

(বিরোধীদের প্রস্তাবে উল্লিখিত অভিযোগ)

বিজেপির বক্তব্য, মনমোহন সিংহ ইমপিচমেন্টে আপত্তি তুলেছেন। তাই তিনি সই করেননি। আপত্তি আছে চিদম্বরম, অভিষেক মনু সিঙ্ঘভিদেরও। কংগ্রেসের দাবি, প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মনমোহনকে এতে সামিল করা হয়নি। কিন্তু রাহুল গাঁধী, সনিয়া এবং মনমোহনরে পূর্ণ সম্মতি আছে। যাঁদের বিরুদ্ধে মামলা আছে, তাঁদেরও সই নেওয়া হয়নি।

ইমপিচ-ইতিহাস

• সৌমিত্র সেন

২০১১-য় কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি থাকাকালীন ৩৩.২৩ লক্ষ টাকা নয়ছয়ের অভিযোগে ইমপিচমেন্ট প্রস্তাব রাজ্যসভায় পাশও হয়ে গিয়েছিল। লোকসভায় প্রস্তাব যাওয়ার আগেই ইস্তফা দেন।

• পি ডি দিনকরণ

সিকিম হাইকোর্টের বিচারপতির বিরুদ্ধে দুর্নীতি, জমি দখলের অভিযোগে তদন্ত কমিটি গঠন রাজ্যসভার চেয়ারম্যানের। ২০১১-র জুলাইয়ে প্রক্রিয়া শুরুর আগেই ইস্তফা।

• জে বি পারদিওয়ালা

২০১৫-য় গুজরাত হাইকোর্টের এই বিচারপতি হার্দিক পটেলের বিরুদ্ধে মামলার তফসিলি জাতি-জনজাতির সংরক্ষণ নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করেন। উপরাষ্ট্রপতির কাছে ইমপিচমেন্টের নোটিস যাওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তিনি রায় থেকে ওই মন্তব্য সরিয়ে নেন।

• ভি রামস্বামী

প্রথম বিচারপতি, যাঁর বিরুদ্ধে দেশে প্রথম ইমপিচমেন্টের প্রক্রিয়া শুরু হয়। পঞ্জাব ও হরিয়ানা হাইকোর্টের বিচারপতি থাকাকালীন নিজের সরকারি বাসভবনের পিছনে যথেচ্ছ খরচের অভিযোগ ওঠে। কিন্তু লোকসভায় প্রস্তাব ভোটাভুটিতে নাকচ হয়। সে সময় রামস্বামীর হয়ে লোকসভায় সওয়াল করেছিলেন কপিল সিব্বল।

ইমপিচমেন্ট প্রক্রিয়া

• বিচারপতিকে পদ থেকে হটানোর নোটিস দিতে হয় লোকসভার স্পিকার বা রাজ্যসভার চেয়ারম্যানকে। লোকসভার ক্ষেত্রে ১০০ জন, রাজ্যসভার ক্ষেত্রে ৫০ জন সাংসদের সই প্রয়োজন।

• প্রস্তাব গৃহীত হলে অভিযোগের তদন্তের জন্য ৩ সদস্যের কমিটি।

• কমিটি অভিযোগ ঠিক মনে করলে সংসদে প্রস্তাব বিবেচনা।

• প্রস্তাব পাশের জন্য মোট সাংসদদের মধ্যে অর্ধেকের বেশি সদস্যের সমর্থন, উপস্থিত ও ভোটরত সদস্যদের দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থন প্রয়োজন।

• সংসদের দু’টি কক্ষেই প্রস্তাব পাশ হলে রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানো হবে। রাষ্ট্রপতি বিচারপতিকে অপসারণের নির্দেশ জারি করবেন।

অতঃকিম্? কংগ্রেস বলছে, বেঙ্কাইয়া এ প্রস্তাব গ্রহণ বা খারিজ করতে পারেন। মাসখানেকের মধ্যে সেটা না হলে ফের হল্লা করবে দল। যদি খারিজ করেন? তা হলে আইনি পথে যাওয়া হবে। সে ক্ষেত্রে তা বিচার করবেন দীপক মিশ্রের পরে সুপ্রিম কোর্টের সবথেকে প্রবীণ বিচারপতি চেলমেশ্বর। ২২ জুন তাঁর অবসর। এর মধ্যে বেঙ্কাইয়া প্রস্তাব খারিজ করলে মামলা তাঁর বেঞ্চে যাবে। না হলে বিচারপতি রঞ্জন গগৈ-এর বেঞ্চে। এই দু’জনেই জানুয়ারিতে দীপক মিশ্রের বিরুদ্ধে নানা প্রশ্ন তুলেছিলেন। বেঙ্কাইয়া প্রস্তাব মানলেও ইমপিচমেন্ট প্রক্রিয়া শেষ হতে সময় লাগবে। ফলে ২ অক্টোবর দীপক মিশ্রের অবসরের আগে প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হওয়া কঠিন।

বিজেপি তাই বলছে, এটি নিছকই রাহুল গাঁধীর রাজনীতি। দীপক মিশ্রকে শুধু চাপ আর হুমকি দেওয়া হচ্ছে, যাতে নিজে থেকে তিনি সরে যান। কারণ, কংগ্রেস মনে করছে তিনি পদে থাকলে বিজেপির পক্ষেই রায় দেবেন।

Advertisement