Advertisement
E-Paper

নাটকে অতীত-দর্শন বরাকে

প্রখ্যাত নাট্যকার দীনবন্ধু মিত্রের নাটক ‘কমলেকামিনী’। রচিত হয়েছিল ১৮৭৩ সালে। ১৮৭১ সালে তিনি ডাক বিভাগের আধিকারিক হিসেবে শিলচরে এসেছিলেন। নাট্যকারের কথায়, কাছাড়ের মানুষের অতুলনীয় ভালবাসা তিনি পেয়েছিলেন।

প্রদীপ নাথ

শেষ আপডেট: ১৭ জানুয়ারি ২০১৭ ০২:২৬

প্রখ্যাত নাট্যকার দীনবন্ধু মিত্রের নাটক ‘কমলেকামিনী’। রচিত হয়েছিল ১৮৭৩ সালে।

১৮৭১ সালে তিনি ডাক বিভাগের আধিকারিক হিসেবে শিলচরে এসেছিলেন। নাট্যকারের কথায়, কাছাড়ের মানুষের অতুলনীয় ভালবাসা তিনি পেয়েছিলেন। তারই প্রতিদানে কাছাড়ের প্রেক্ষাপটে নাটক রচনার ইচ্ছা জাগে। কিন্তু এখানকার সমাজ-জীবনে নাটকের কোনও উপাদান তাঁর চোখে ধরা পড়েনি। একদিন শিলচরের আদালত প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে শুনলেন এক কবিয়ালের কণ্ঠে ‘বরমার গান’। তখনই ঠিক করলেন ব্রহ্মযুদ্ধ নিয়ে নাটক লিখবেন। এরই ফসল ‘কমলেকামিনী’।

১৮৭৩ সালের ২০ ডিসেম্বর এবং ১৮৭৪ সালের ১৪ মার্চ কলকাতায় নাটকটি মঞ্চস্থ হয়। কিন্তু যে অঞ্চলের প্রেক্ষাপটে নাটকটি রচিত হয়েছিল, সেখানে তা এর আগে কখনও অভিনীত হয়নি। গত ২৮ ডিসেম্বর এই অঞ্চলে প্রথম মঞ্চস্থ হল ‘কমলেকামিনী’। শিলচর বঙ্গভবনে। বরাক উপত্যকা বঙ্গ সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্মেলন এ ব্যাপারে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়ায় তা সম্ভব হয়। সময়ের সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে একে সম্পাদনা করেছেন লোকগবেষক অমলেন্দু ভট্টাচার্য।

Advertisement

নাটকটির নির্দেশনার দায়িত্বে ছিলেন শেখর দেবরায়। শুরুতেই তিনি যুদ্ধের বাতাবরণ ফুটিয়ে তোলেন। মার্শাল আর্টের কী অপূর্ব মুন্সিয়ানা! ঢাল-তলোয়ার, বর্শার ফলকের সংঘাত। নাটকটিকে প্রথমেই উচ্চগ্রামে বেঁধে দেন নির্দেশক। খুব পরিপাটি মঞ্চ। মাঝখানে রাজসিংহাসন। মঞ্চের প্রথম ভাগে দু’পাশে বেদী। বাহুল্য নেই। শেখর দেবরায়ের নির্দেশিত নাটকে আগেও দেখা গিয়েছি, গোটা মঞ্চকে তিনি খুব সুন্দর ভাবে ব্যবহার করেন। এখানেও তার ব্যতিক্রম নয়।

নাটকটি আবর্তিত হয়েছে মণিপুর রাজের উপ-সেনাপতি শিখণ্ডীবাহনকে কেন্দ্র করে। কাছাড়ে যুদ্ধ হয়েছিল মণিপুরের রাজা ও ব্রহ্মদেশের রাজার মধ্যে। মণিপুরের রাজা তাঁর সহকারী সেনাপতি শিখণ্ডীবাহনকে সমরক্ষেত্রের পূর্ণ দায়িত্ব দেন। যুদ্ধের প্রথম দৃশ্যেই শিখণ্ডীবাহন ব্রহ্ম-সেনাপতিকে তলোয়ার যুদ্ধে পরাস্ত করে বন্দি করলেন। তাঁর বীরত্ব, পৌরুষ দেখে ব্রহ্মদেশের রাজকুমারী রোমাঞ্চিত হলেন। তাঁর হাতে গাঁথা মালা শিখণ্ডিবাহনের উদ্দেশে নিক্ষেপ করলেন। যুদ্ধের দামামা, হুঙ্কারের মধ্যেই সূচিত হল শান্ত স্নিগ্ধ প্রেমময় পরিবেশ। কন্যা রণকল্যাণীর মানসিক ভাবান্তর নজর এড়ায়নি ব্রহ্মদেশের রাজার। কিন্তু জন্ম-পরিচয়হীন অজ্ঞাত কুলশীল শিখণ্ডীবাহনের হাতে কাছাড়ের রাজদণ্ড প্রদানে ঘোরতর আপত্তি তাঁর।

এই নাটকে প্রেমই নিয়ে আসে শান্তির বার্তা। কিন্তু বাদ সাধে জন্ম-পরিচয়। সংঘাত এখানে ত্রিমুখী— যুদ্ধ, প্রেম ও রাজরক্ত। যুদ্ধ সন্ধিতে পরিণত হয়। প্রেম প্রতিষ্ঠা লাভ করে। কার্যত ব্রাহ্মণ্যবাদই জয়লাভ করে। ব্রহ্মরাজ জন্ম-পরিচয়হীন জারজের হাতে কন্যা সমর্পণ করতে রাজি হলেও কাছাড় রাজ্য অর্পণে আপত্তি জানান। কিন্তু বৈষ্ণব ধর্মে প্রভাবান্বিত মণিপুরের রাজা শিখণ্ডীবাহনের হাতেই কাছাড় রাজ্য অর্পণ করতে চাইলে ব্রহ্মরাজ কুণ্ঠিত হন। শেষদৃশ্যে যখন শিখণ্ডীবাহনের জন্মরহস্য উন্মোচন হল, তিনি আসলে মণিপুরের রাজারই ঔরসজাত সন্তান, তখন ব্রহ্মরাজ উল্লাসে তার জামাতা শিখণ্ডীবাহনকে কাছাড়ের রাজা বলে ঘোষণা করলেন।

সে দিন শোনা যায়, অতীতকে না জানলে শিকড়বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে হয়। অতীত ঐতিহ্যকে জানা, বর্তমানের আলোকে অতীতকে রোমন্থন করা। অতীত মানেই ঐতিহ্যময়। কিন্তু অনেক অতীত সামাজিক কলঙ্কের বার্তাও বহন করে। এই নাট্য প্রযোজনা যুদ্ধের বিভীষিকা নয়, বন্ধুত্বের বার্তা পৌঁছে দিলেও সঙ্গে ছড়িয়েছে এক নেতিবাচক বার্তা। শতগুণে গুণান্বিত হলেও রাজসিংহাসনের অধিকার রাজরক্তধারীরই। নাটকটি মঞ্চায়নে শিলচরে তিন-চার দশক থেকে সুনামের সঙ্গে অভিনয় করে আসা অভিনেতা-অভিনেত্রীরা অংশ নিয়েছেন। প্রযোজনার দিক থেকে নাটকটি অনেকাংশে সফল। আশিস ভৌমিক, চিত্রভানু ভৌমিক, বিভাস রায়, রণধীর চক্রবর্তী, সুব্রত রায়, বীরব্রত চক্রবর্তী, প্রদীপ দাস, জয়ন্ত দাস, সুব্রত ভট্টাচার্য, অনির্বাণ রায় পুরুষচরিত্রে অভিনয় করেছেন। মহিলা চরিত্রে ছিলেন, কল্যাণী চৌধুরী, রুমি রায়, ইন্দ্রাণী সেনগুপ্ত, উদ্দীপ্তা নাথ, রূপশ্রী রায়চৌধুরী, জয়ন্তী ধর দাস ও পারমিতা পাল। এমন অভিনেতা-অভিনেত্রীদের পেয়েও স্বল্প অনুশীলনের দরুন প্রযোজনার মান তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারেনি। মার্শাল আর্ট, রাস নৃত্য, খোলবাদন যে পেশাদারি দক্ষতায় উপস্থাপিত হয়েছে তা রীতিমত প্রশংসার দাবি রাখে। কিন্তু এই পেশাদারি দক্ষতা মূল নাটকের অন্যান্য দিকে খামতি তৈরি করেছে। মূল নাট্যক্রিয়ায় ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে। চমক সৃষ্টি করা গিয়েছে কিন্তু পুরোপুরি নাটকের অংশ হয়ে উঠতে পারেনি। তবু বলতে হয়, ব্রহ্মদেশের রাজকন্যার ভূমিকায় রূপশ্রী রায়চৌধুরীর অভিনয় দাগ কেটেছে। শিখণ্ডীবাহনের ভূমিকায় সুব্রত রায় ভাল অভিনয় করলেও তাঁর বাস্তব বয়সকে লুকোতে পারেননি। মনে হচ্ছিল, বটবৃক্ষের সঙ্গে তুলসীগাছের গাঁটছড়া। তাঁর রূপসজ্জায় আরেকটু যত্ন নিলে হয়তো বয়সভার কিছুটা কাটানো যেত।

আশিস ভৌমিক, সুব্রত ভট্টাচার্য, চিত্রভানু ভৌমিক, সুব্রত রায়, কল্যাণী চৌধুরী নিজেরা অনেক মঞ্চে সফল নাটকের পরিচালক। তাঁদের এক মঞ্চে নিয়ে এসে নাটক পরিচালনা নিঃসন্দেহে দুরূহ কাজ। শেখর দেবরায় কিন্তু এ ক্ষেত্রে সফলতার স্বাক্ষর রেখেছেন। রূপসজ্জায় বিশ্বজিৎ নাথ সমাজপতি ও অভীক সেনগুপ্ত মোটামুটি সফল। সাজসজ্জায় সমর লুওয়া ও কোনসাম করৌ প্রশংসার দাবি রাখেন। মার্শাল আর্টে এম চিন্ময়, এ সুরেশ, এম সদানন্দ এবং এ অমরজিত সহ কোচ এম বাবাসিংহের ভূমিকা যথেষ্ট দৃষ্টিনন্দন। সঙ্গীতে মনোরঞ্জন মালাকার, দেবপ্রিয় নাগ এবং তন্দ্রা রায় নিজেদের সুনাম বজায় রেখেছেন। আবহ কানাইলাল দাস ও গুরুপদ সিংহ ভালই তৈরি করেছেন। মঞ্চ তৈরি করেন নারায়ণ সরকার। রাসনৃত্যে কবিতা সিংহ, প্রমীলা সিংহ এবং মণিমালা সিংহ। পুংচলম নৃত্যে গুরু এইচ বসন্ত সিংহ, টি জীবন সিংহ এবং প্রসেনজিৎ সিংহ। ভাষ্যপাঠে ছিলেন সব্যসাচী পুরকায়স্থ।

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy