Advertisement
০৮ ডিসেম্বর ২০২২

দাদাগিরি ঘোচায় আঞ্চলিক দলগুলি খুশি, প্রশ্ন বিকল্প কী

যোজনা কমিশনের খবরদারি খর্ব হওয়ায় খুশি আঞ্চলিক দলগুলি ও তাদের সরকার। বিজেপির সঙ্গে সঙ্গে আঞ্চলিক দলগুলিও মনে করছে, যোজনা কমিশন বিলোপের ফলে যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো আরও মজবুত হবে, উন্নতি হবে কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কের। রাজ্যগুলি তার অর্থ আরও স্বাধীন ভাবে খরচ করার সুযোগ পাবে।

নিজস্ব সংবাদদাতা
নয়াদিল্লি শেষ আপডেট: ১৮ অগস্ট ২০১৪ ০৩:৪৫
Share: Save:

যোজনা কমিশনের খবরদারি খর্ব হওয়ায় খুশি আঞ্চলিক দলগুলি ও তাদের সরকার। বিজেপির সঙ্গে সঙ্গে আঞ্চলিক দলগুলিও মনে করছে, যোজনা কমিশন বিলোপের ফলে যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো আরও মজবুত হবে, উন্নতি হবে কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কের। রাজ্যগুলি তার অর্থ আরও স্বাধীন ভাবে খরচ করার সুযোগ পাবে। রাজ্যের হাতে বাড়তি ক্ষমতা তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্তকে তাই সামগ্রিক ভাবে স্বাগত জানিয়েছেন তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী তথা এডিএমকে নেত্রী জয়ললিতা বা জেডিইউ-এর নীতীশকুমার। ঘনিষ্ঠ মহলে ওই সিদ্ধান্তে সায় দিয়েছেন অখিলেশ সিংহ যাদবও। সকলেই মনে করছেন, মোদীর এই সিদ্ধান্তে যোজনা কমিশনের বাড়াবাড়ির দিন শেষ হল।

Advertisement

যদিও মোদীর সিদ্ধান্তকে প্রকাশ্যে সমর্থন করার ক্ষেত্রে সমস্যা রয়েছে কিছু দলের। তারা মোদীর খোলাখুলি প্রশংসা করতেও নারাজ। ঘরোয়া আলোচনায় যোজনা কমিশনের বিদায়কে ইতিবাচক পদক্ষেপ বলে মেনে নিয়েও তাই প্রকাশ্যে ঢোক গিলছে তারা। তৃণমূল, সিপিএম, আরজেডি বা জেডিইউয়ের মতো দলের নেতারা জানতে চান, যোজনা কমিশন তুলে দেওয়ার পরে বিকল্প ব্যবস্থার ধরন-ধারণ কী হবে?

রাজ্যের টাকা কোন উন্নয়ন প্রকল্পে কত খরচ হবে, এত দিন কার্যত সেটাই নিয়ন্ত্রণ করে আসত যোজনা কমিশন। তাদের এই অহেতুক হস্তক্ষেপকে কেন্দ্র করে বিগত দশকগুলিতে কম বিতর্ক হয়নি। রাজ্যের যোজনা বরাদ্দ ঠিক করে দেওয়ার ক্ষেত্রে কমিশনের ছড়ি ঘোরানোর বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে সরব হয়েছেন আঞ্চলিক দলের নেতারা। চতুর্থ অর্থ কমিশনের সদস্য হিসেবে অর্থনীতিবিদ ভবতোষ দত্ত সেই ষাটের দশকেই যোজনা কমিশনের ভূমিকার সমালোচনায় সরব হয়েছিলেন। ভবতোষবাবু ব্যক্তিগত ভাবে যোজনা কমিশনের হাতে বাড়তি ক্ষমতা থাকার বিরোধী ছিলেন। তাঁর মতে, সংবিধানের রূপকার হওয়া সত্ত্বেও বি আর অম্বেডকর যোজনা কমিশনের হাতে ওই বাড়তি ক্ষমতা মেনে নিতে পারেননি। অম্বেডকর মনে করতেন, বরাদ্দ বণ্টনের দায়িত্ব কেবলমাত্র অর্থ কমিশনের হাতে থাকা উচিত। এটি একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। কিন্তু যোজনা কমিশনের অকারণ হস্তক্ষেপে তা সম্ভব হচ্ছে না।

অর্থনীতিবিদদের একাংশ এখন মনে করছেন, যোজনা কমিশন বিলোপের পরে অর্থ কমিশন তার গুরুত্ব ফিরে পাবে। শুধু তাই নয়, এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাও আরও শক্তিশালী হবে বলে মনে করছে বিজেপি শিবির।

Advertisement

মুখ্যমন্ত্রী থাকার সময় বরাবর রাজ্যগুলিকে অধিক ক্ষমতা দেওয়ার পক্ষে সওয়াল করে এসেছেন মোদী। প্রধানমন্ত্রী হয়ে রাজ্যগুলির দীর্ঘদিনের দাবি তিনি পূরণ করলেন বলেই দাবি করছেন বিজেপি নেতারা। এই সিদ্ধান্তে কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কেও উন্নতি হবে বলে মনে করছেন তাঁরা।

যোজনা কমিশনের হস্তক্ষেপ নিয়ে সরব ছিলেন তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী তথা এডিএমকে নেত্রী জয়ললিতাও। ২০১২ সালে দিল্লিতে যোজনা কমিশনের কর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের পরে অসন্তুষ্ট জয়ললিতা মন্তব্য করেছিলেন, “আমাদের নিজেদের টাকা আমরা কী ভাবে খরচ করব তা বলে দেওয়াই যেন যোজনা কমিশনের কাজ!” তিনি মনে করেন, নতুন সিদ্ধান্তে রাজ্যগুলি নিজেদের মতো করে অর্থ খরচ করতে পারবে। আর জেডিইউ-এর রাজ্যসভা সদস্য তথা দলের মুখ্যপাত্র কে সি ত্যাগীর মতে, “এই সিদ্ধান্ত স্বাগত। দল দীর্ঘদিন ধরেই রাজ্যের হাতে বাড়তি ক্ষমতা দেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছিল।”

তবে রাজ্যগুলির দীর্ঘদিনের দাবিপূরণ হওয়া সত্ত্বেও মোদীকে পুরো নম্বর দিতে রাজি নন জেডিইউয়েরই নীতীশকুমার। বিহারের এই প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ঘনিষ্ঠ মহলে জানিয়েছেন, সরকার কী বিকল্প ব্যবস্থা আনছে, সেটা খতিয়ে দেখা দরকার। আসলে রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতায় মোদীর পাশে দাঁড়াতে পারছেন না অনেক নেতাই। যেমন লালুপ্রসাদ যাদব। মুখ্যমন্ত্রী থাকার সময় একাধিক বার যোজনা কমিশনের অতিরিক্ত হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে সওয়াল করেছেন এই যাদব নেতা। কিন্তু এখন কিছুটা সতর্ক ভাবেই তিনি বলছেন, ‘‘বিকল্প ব্যবস্থাটি কী, তা আগে জানা দরকার। কেননা, মোদী নিজেকেই তো যোজনা কমিশন বলে মনে করেন!”

কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কের প্রশ্নে সিপিএম নেতৃত্ব বরাবরই রাজ্যের হাতে বেশি ক্ষমতা দেওয়ার পক্ষে। রাজ্যকে বেশি কর আদায়ের ক্ষমতা, প্রয়োজনে বাজার থেকে বেশি ধার নেওয়ার সুবিধা, ঋণ মকুব করা, কেন্দ্র-রাজ্য যৌথ প্রকল্প রূপায়ণে বাড়তি কেন্দ্রীয় সাহায্যের দাবিতে বরাবরই সরব থেকেছেন সিপিএম নেতৃত্ব। কিন্তু মোদীর ওই সিদ্ধান্ত প্রসঙ্গে রাজ্যের প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী অসীম দাশগুপ্তের বক্তব্য, “আমরা যোজনা কমিশনের পক্ষে। ওখানে আলোচনা করলে অনেকগুলি মতামত পাওয়া যেত। তার মধ্য থেকে একটি পথ বেছে নেওয়া হতো। এর আগে নেতাজি যখন প্ল্যানিং কমিশনের পরিকল্পনা দেন, তখন পশ্চিম ভারতের শিল্পপতিরা এর বিরোধিতা করেন। এখনও সেটা দেখা যাচ্ছে।” অসীমবাবুও বলেছেন, “সরকার বিকল্প কী ব্যবস্থা আনছে, তা জানা গেলে তবেই গোটা বিষয়টি স্পষ্ট হবে। তার আগে মন্তব্য করা অর্থহীন।”

নীতিগত ভাবে রাজ্যের হাতে বাড়তি ক্ষমতার পক্ষ নিলেও সিপিএমের আশঙ্কা, ওই সিদ্ধান্তের জেরে ধীরে ধীরে জনকল্যাণমুখী প্রকল্পগুলি বন্ধ হয়ে যাবে। দলের পলিটব্যুরো সদস্য সীতারাম ইয়েচুরি মনে করছেন, এর ফলে সামাজিক প্রকল্পগুলির মাধ্যমে পিছিয়ে পড়া মানুষের জন্য যে কাজ বা উন্নয়নমুখী প্রকল্পগুলি চলছিল তা-ও বন্ধ হওয়ার উপক্রম হবে। ইয়েচুরির কথায়, “এই সিদ্ধান্তে শিশুদের জন্য আইসিডিএস বা ১০০ দিনের কাজের মতো সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পগুলির ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশয় তৈরি হল।”

দ্বিধায় তৃণমূলও। যোজনা কমিশনের বাড়তি হস্তক্ষেপ খর্ব হওয়ায় দল খুশি। কিন্তু কেন্দ্র একতরফা ভাবে যোজনা কমিশন তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার সংসদে এর বিরোধিতায় সরব হওয়ারও পরিকল্পনা নিয়েছেন তৃণমূল নেতৃত্ব। ফলে তৃণমূলের রাজ্যসভা সাংসদ ডেরেক ও’ব্রায়েন আজ বামেদের সঙ্গে একই সুরে বলেছেন, “নতুন প্রস্তাব আসার পর তা বিশ্লেষণ করলে তবেই তার ভাল-মন্দ বোঝা যাবে।” কিন্তু লোকসভায় তৃণমূলের দলনেতা সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় অপেক্ষায় থাকতে নারাজ। তিনি বলেছেন, “১৪ অগস্ট পর্যন্ত সংসদের অধিবেশন চলল। সেখানে যোজনা কমিশন তুলে দেওয়া নিয়ে আলোচনা হল না। কিছু জানানোই হল না। আচমকা ১৫ অগস্ট প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ থেকে এত বড় একটা সিদ্ধান্ত জানা গেল। তৃণমূল এই সিদ্ধান্ত সমর্থন করে না।” সুদীপবাবুর আরও বক্তব্য, “কেন্দ্র এবং রাজ্যগুলির মধ্যে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে যোজনা কমিশন সেতুর ভূমিকা পালন করে। কমিশনের সচিবদের সঙ্গে রাজ্য সরকারগুলির বৈঠকে কমিশনের তরফে সদর্থক বার্তা পাওয়া যায়। সেই কমিশন কী এমন ক্ষতি করল যে, তাকে বিলুপ্ত করে দিতে হল?”

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, Twitter এবং Instagram পেজ)
Follow us on: Save:
Advertisement
Advertisement

Share this article

CLOSE
Popup Close
Something isn't right! Please refresh.