Advertisement
E-Paper

সংসদ বসতেই ছুটিতে চললেন রাহুল

শুরু হল সংসদের বাজেট অধিবেশন। প্রথম দিনেই সংসদে নেই রাহুল গাঁধী! দিল্লিতে নেই। এমনকী দেশেই নেই তিনি! তাঁর নেতৃত্বে ভোটে লড়ে লোকসভায় ৪৪-এ নেমেছে দল। আর দিল্লি বিধানসভায় তো একেবারেই শূন্যে! এই অতল খাদ থেকে দলকে তুলে আনার ভার খুব শিগগিরই যাঁর হাতে তুলে দিতে চলেছে কংগ্রেস, সংসদের বাজেট অধিবেশন বসতেই তিনি কিনা বিদেশে চলে গেলেন! প্রশ্ন ওঠারই ছিল। এবং তা উঠেছেও। বিব্রত দল বলছে, ছুটিতে গিয়েছেন কংগ্রেস সহসভাপতি। মা সনিয়া গাঁধী বলছেন, “ওকে কয়েক সপ্তাহ দেওয়া হয়েছে। কিছুটা সময় দরকার ওর!”

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ ০৩:২৭

শুরু হল সংসদের বাজেট অধিবেশন। প্রথম দিনেই সংসদে নেই রাহুল গাঁধী! দিল্লিতে নেই। এমনকী দেশেই নেই তিনি! তাঁর নেতৃত্বে ভোটে লড়ে লোকসভায় ৪৪-এ নেমেছে দল। আর দিল্লি বিধানসভায় তো একেবারেই শূন্যে! এই অতল খাদ থেকে দলকে তুলে আনার ভার খুব শিগগিরই যাঁর হাতে তুলে দিতে চলেছে কংগ্রেস, সংসদের বাজেট অধিবেশন বসতেই তিনি কিনা বিদেশে চলে গেলেন!

প্রশ্ন ওঠারই ছিল। এবং তা উঠেছেও। বিব্রত দল বলছে, ছুটিতে গিয়েছেন কংগ্রেস সহসভাপতি। মা সনিয়া গাঁধী বলছেন, “ওকে কয়েক সপ্তাহ দেওয়া হয়েছে। কিছুটা সময় দরকার ওর!” কীসের জন্য? নিজে সরাসরি ছুটি শব্দটি এড়িয়ে গিয়ে কংগ্রেস সভানেত্রী বলেছেন, “দল এ নিয়ে যা বলার বলেছে?”

দলের ব্যাখ্যা কী? সাম্প্রতিক ঘটনাবলি ও কংগ্রেসের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবনাচিন্তা করতেই কয়েক সপ্তাহ ছুটি নিয়েছেন রাহুল। আর এই ব্যাখ্যাই উস্কে দিয়েছে নানা রকম জল্পনা আর রাহুলকে নিয়ে দলের ভিতরে-অন্দরে নানা রকম মস্করা। কংগ্রেসের এক-এক জন নেতা এমন সব মন্তব্য করছেন, যা সাফাই না ঠাট্টা, বোঝা দুষ্কর।

যেমন রাহুলের অনুগামী এক নেতা আজ বলে বসলেন, “কুম্ভকর্ণ তাঁর ঘুমের জন্য পরিচিত ছিল। কিন্তু তিনি বড় যোদ্ধাও ছিলেন, এবং জানতেন কখন ঘুম ভেঙে উঠতে হয়!” এটা বিদ্রুপ না রাহুলের প্রশংসা, সেটা তিনিই জানেন।

রাহুলের ঢাল হতে চেয়ে অভিষেক, জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়ারা আবার পাল্টা প্রশ্ন তুলেছেন, লোকসভা ভোটে হেরে অরবিন্দ কেজরীবাল কি বিপাসনার জন্য ছুটি নেননি? মায়াবতী, মুলায়ম সিংহরা ক’দিন সংসদে আসেন? সংসদের গত অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীই বা ক’দিন সংসদে উপস্থিত ছিলেন?

কিন্তু এতেই সব প্রশ্ন চাপা দেওয়া যাচ্ছে না। দিল্লি ভোটে ভরাডুবি হয়েছে বিজেপিরও। বাজেট অধিবেশনের গোড়া থেকেই রাজ্যসভায় গরিষ্ঠতা না থাকা নিয়ে বেশ চাপে রয়েছে তারা। সরকারকে কোণঠাসা করতে বিরোধীদের মুখ হয়ে ওঠার এটাই তো সময়! এ সময় রাহুলের এই চিন্তনযাত্রা নিয়ে দলেরই এক নেতার খেদ, জাতীয় রাজনীতিতে নিজেদের যারা এখনও নিজেদের প্রধান বিরোধী শক্তি বলে জাহির করে, তার কাণ্ডারিই অনুপস্থিত অধিবেশনের প্রথম দিনে!

কেউ কেউ এই জল্পনাও উস্কে দিলেন, রাহুল কি তবে রাজনীতিই ছেড়ে দিচ্ছেন! কংগ্রেসের এক ঝাঁক তরুণ নেতানেত্রীর আবার আশা সহসভাপতির এই ‘ছুটি’ আসলে কৌশলগত ‘বনবাস’ (পড়ুন বিদেশবাস)! ফিরে এসেই সম্ভবত আনুষ্ঠানিক ভাবে দলের সভাপতি পদের দায়িত্ব নেবেন রাহুল। কংগ্রেসের সামগ্রিক নিয়ন্ত্রণ তুলে নেবেন নিজের হাতে! তাড়াবেন কায়েমি স্বার্থে পদ আঁকড়ে থাকা বেশ কিছু প্রবীণ নেতাকে।

রাহুলের অনুপস্থিতি নিয়ে দলীয় তরফে মুখপাত্র অভিষেক মনু সিঙ্ঘভি যে মন্তব্য করেছেন তাতেও যেমন সেই ইঙ্গিত। সিঙ্ঘভি বলেছেন, “সাম্প্রতিক সব নির্বাচন ও রাজনৈতিক পরিবর্তন নিয়ে আত্মসমীক্ষার জন্য রাহুল কয়েক সপ্তাহ ছুটি চেয়েছিলেন। কংগ্রেস সভানেত্রী তাঁর আবেদন মঞ্জুর করেছেন। মার্চ মাসের শেষে বা এপ্রিলে কংগ্রেসের মহাঅধিবেশন হবে। ওই অধিবেশনে কংগ্রেসকে ভবিষ্যতের পথ দেখাবেন রাহুল।”

এই ব্যাখ্যায় অবশ্য রাহুলের যোগ্যতা নিয়ে কাঁটাছেড়া বেড়েছে বৈ কমেনি। ২০০৪-এ মহাসমারোহে রাজনীতিতে যোগ দিয়েছিলেন রাহুল। সে বছরই হন অমেঠীর সাংসদ। তার পর ১১ বছর কেটে গিয়েছে। এর মাঝে ২০১৩ সালের জানুয়ারি মাসে কংগ্রেসের সহসভাপতি পদে তাঁর অভিষেক হয়েছে। কিন্তু দলের প্রবীণ-নবীন অনেক নেতাই আখছাড় আক্ষেপ করেন, রাহুল একেবারেই সিরিয়াস নন। রাজনীতির নাড়ি বোঝেন না। মওকা পেয়ে বিজেপি নেতারা যেমন আজ রাহুলের ‘ছেলেমানুষি’ নিয়ে কটাক্ষ করেছেন, তেমনই কংগ্রেসের অশীতিপর কিছু নেতা অবাক হয়ে বলেছেন, “ভাবনাচিন্তার জন্য কাউকে ছুটি নিতে হয়!” তাঁদের খেদ, গাঁধী পরিবারের উত্তরসূরি হয়েও রাহুল বুঝলেন না, রাজনীতিটা ‘টোয়েন্টি ফোর সেভেন’ করতে হয়। এখানে অন-অফ চলে না।” এই সূত্রে ১৯৭৭ সালে কংগ্রেসের ভরাডুবির পর ইন্দিরা গাঁধীর ভূমিকার কথাও মনে করান তাঁরা।

দশ জনপথের ঘনিষ্ঠরা ও দলের নবীন প্রজন্মের বহু নেতাই অবশ্য কোনও ভুলই দেখছেন না এতে! বরং প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী তথা মধ্যপ্রদেশের এক তরুণ নেতার কথায়, “দুম করে যদি আমাকে বলা হয়, শিগগিরই কংগ্রেসের সভাপতি পদের দায়িত্ব নিতে হবে, তা হলে ভাবার জন্য আমিও দশ দিন ছুটি নেব।” তাঁর মতে, সংসদে প্রথম দিন উপস্থিত থাকাটা প্রতীকী হতো ঠিকই। কিন্তু তার থেকে এখন ঢের বেশি জরুরি কংগ্রেসকে ভবিষ্যতের পথ দেখানো। রাহুলকে সমর্থন করেও অবশ্য কংগ্রেসের এক সাধারণ সম্পাদক আজ বলেন, ছুটি নেওয়ার অধিকার সবারই আছে। কিন্তু দু’টি বিষয় রাহুলের মনে রাখা উচিত ছিল। এক, সময় নির্বাচন। বাজেট অধিবেশনের প্রথম দিনটায় তিনি সংসদে এলে এই বিতর্ক হতো না। পরশু যন্তর-মন্তরে জমি আইন সংশোধনের প্রতিবাদে কংগ্রেস ধর্নায় বসবে। সেখানেও তাঁর থাকা উচিত ছিল। বিশেষ করে ভাট্টা পারসল থেকে শুরু করে ওড়িশার নিয়মগিরিতে গিয়ে তিনি যখন অতীতে জমি আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। দুই, কথায় কথায় বিদেশে ছুটি কাটাতে যাওয়া মোটেই সুবার্তা দিচ্ছে না। কংগ্রেস সূত্রে খবর, রাহুল সম্ভবত এ বার ছুটি কাটাতে বাহামাস গিয়েছেন। কিন্তু কংগ্রেসের এই সাধারণ সম্পাদকের মতে, রাহুল দেশের মধ্যে কোথাও বিপাসনায় গেলে ভাল হতো। কারণ, এমনিতেই সনিয়া বিরুদ্ধে বিদেশিনি বলে একটা প্রচার তলে তলে রয়েছে। ভবিষ্যতে এটাকেও অস্ত্র করতে পারে বিজেপি।

রাহুলকে কেন্দ্র করে প্রকাশ্যে এই সাত-পাঁচ চর্চার মধ্যেই আরও একটা প্রশ্ন উঠে আসছে? এ বার কংগ্রেসের বর্ষীয়ান নেতাদের ভবিষ্যৎ কী হবে? রাহুল সভাপতি পদের দায়িত্ব নিলে আহমেদ পটেল, জনার্দন দ্বিবেদী, সি পি জোশী, মোহন প্রকাশদের কোনও ভূমিকা কি আদৌ থাকবে সংগঠনে? দলের নবীন নেতাদের মতে, আদতে এই নেতারাই গত কয়েক বছর ধরে ক্রমাগত বিভ্রান্ত করেছেন রাহুলকে। দলের আমূল সংস্কার চান রাহুল। নিজেদের গদি বাঁচাতে এই নেতারা তাতে বারবার বাধা তৈরি করেছেন। অনেকের আশা, এ বার হয়তো তা কাটিয়ে উঠতে পারবেন রাহুল। বর্ষীয়ানদের একেবারে ছেঁটে না ফেললেও কংগ্রেসে দায়বদ্ধতা ও শৃঙ্খলা কায়েম করার চেষ্টা করবেন।

রাহুলের সমস্যা ব্যাখ্যা করতে দলের এক মুখ্যমন্ত্রীর পুত্র এ-ও বলেন, “কেজরীবাল ঠিক যে ধরনের রাজনৈতিক সংস্কৃতির কথা বলছেন, রাহুলের মত ও পথ তেমনই। কেজরীবালের সুবিধা, তিনি যাঁদের নিয়ে দল চালান তাঁরা সকলেই তাঁর অনুগামী। আর কংগ্রেসে হাজারো নেতা। এবং তাঁদের এক-এক জনের মতলব এক-এক রকম! ভাল হোক বা মন্দ, রাহুল দলের পুরো নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে তুলে নিলে অন্তত কংগ্রেস একটা সুস্থির দিশা পাবে।

সে ক্ষেত্রে সনিয়া গাঁধীর ভূমিকা কী হবে? দলের গঠনতন্ত্র পাল্টে কোনও পদ তৈরি করা হতে পারে। যদিও দলের এক সাধারণ সম্পাদকের কথায়, পদটা অপ্রাসঙ্গিক। কংগ্রেসে সনিয়া গাঁধী নামটাই শেষ কথা।

budget session rahul gandhi absent aicc
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy