অযোধ্যার রামমন্দিরে ভক্তদের দানের নগদ ও মূল্যবান সামগ্রী (অলঙ্কার ও রত্ন) চুরির ঘটনায় গ্রেফতার আট জন অভিযুক্তের বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে হিসাব-বহির্ভূত ৮০ লক্ষ টাকা উদ্ধার করল উত্তরপ্রদেশ পুলিশ। শুক্রবার থেকে শুরু হওয়া ওই তল্লাশি অভিযান এখনও সে রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে চলছে বলে পুলিশ সূত্রের খবর।
গত দু’বছরে ভক্তদের দেওয়া প্রণামীর কয়েক কোটি টাকা লুট হয়েছে বলে প্রাথমিক তদন্তে জানতে পেরেছে পুলিশ। রামমন্দিরের কর্মচারী (সেবাদার), এমনকি মন্দির পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত ‘শ্রীরাম জন্মভূমি তীর্থক্ষেত্র ট্রাস্ট’-এর সদস্য ও পদাধিকারীদের একাংশও এতে জড়িত থাকতে পারেন বলে পুলিশের ‘বিশেষ তদন্তকারী দল’ (সিট)-এর ধারণা। বৃহস্পতিবার আট অভিযুক্তের গ্রেফতারির পরেই ‘শ্রীরাম জন্মভূমি তীর্থক্ষেত্র ট্রাস্ট’-এর সাধারণ সম্পাদক পদ থেকে ইস্তফা দেন চম্পত রাই। সেই সঙ্গে তীর্থক্ষেত্র ট্রাস্টের সদস্য (ট্রাস্টি) পদ থেকে ইস্তফা দেন অনিল মিশ্র।
ঘটনাচক্রে, ধৃতদের একাংশের সঙ্গে দু’জনেরই ‘যোগাযোগ’ সম্পর্কিত তথ্য মিলেছে। লবকুশ এবং অনুকল্প মন্দিরে দান হিসেবে পাওয়া নগদ অর্থ ও মূল্যবান সামগ্রী গণনা ও নথিভুক্তির কাজে যুক্ত ছিলেন। তাঁরা দু’জনেই ট্রাস্টি অনিলের আত্মীয়। অন্য দিকে, রামশঙ্কর আগে ট্রাস্টের সাধারণ সম্পাদক চম্পতের গাড়িচালক ছিলেন এবং ২০২২ সাল থেকে মন্দির নির্মাণ ও পরবর্তী ব্যবস্থাপনার কাজে যুক্ত করা হয় তাঁকে। এ ছাড়া অবিনাশ শুক্ল, মণীশকুমার যাদব, করুণেশ পাণ্ডে, রামশঙ্কর মিশ্র এবং সুভাষ শ্রীবাস্তব নামে পাঁচ অভিযুক্তও রয়েছেন ধৃতদের তালিকায়। ধৃতদের বিরুদ্ধে চুরি, অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গ, চুরি হওয়া সম্পত্তি গোপন রাখা, অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র এবং অভিন্ন উদ্দেশ্যে যৌথ ভাবে অপরাধ-সহ ভারতীয় ন্যায় সংহিতা এবং দুর্নীতি দমন আইনের একাধিক ধারায় মামলা রুজু করা হয়েছে।
সূত্রের খবর, ২০২৪ সালের ২২ জানুয়ারি মন্দির উদ্বোধনের পরে প্রথম কয়েক মাস দৈনিক ৬-৭ লক্ষ টাকা প্রণামী জমা পড়ত। ধীরে ধীরে তা কমতে শুরু করে। গত কয়েক মাসে দৈনিক প্রণামী সংগ্রহের অঙ্ক হাজারের অঙ্কে নেমে এসেছিল। প্রণামী গোনা এবং বাছাই করার দায়িত্বপ্রাপ্ত সেবাদারদের একাংশ সিসিটিভি নজরদারি আড়াল করে দীর্ঘ দিন ধরে নগদ ও সোনাদানা চুরি করেছেন বলে অভিযোগ। সেই টাকার বড় অংশ রিসর্ট, শপিং মল-সহ বিভিন্ন ব্যবসায় বিনিয়োগ করা হয়েছে বলে প্রাথমিক তদন্তে জানা গিয়েছে। তবে ইতিমধ্যেই কংগ্রেস, সমাজবাদী পার্টি-সহ বিরোধী দলগুলি অভিযোগ তুলেছে, প্রণামীর টাকা গোনার দায়িত্বে সেবাদার অথবা গাড়ি চালকদের ফাঁসিয়ে দিয়ে আসল অপরাধীদের বাঁচানোর চেষ্টা হচ্ছে। বিরোধীদের প্রশ্ন, রাঘব বোয়ালদের যোগ না থাকলে যাঁরা প্রণামী গোনেন, তাঁদের পক্ষে কোটি কোটি টাকা সরানো কি সম্ভব?
আরও পড়ুন:
তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের আন্তর্জাতিক শাখার প্রধান অলোক কুমার প্রশ্ন তুলেছেন চম্পতের ভূমিকা নিয়ে। রামমন্দির নির্মাণ কমিটির চেয়ারম্যান নৃপেন্দ্র মিশ্র তহবিলে নজরদারির উদ্দেশ্যে সর্বক্ষণের জন্য এক জন সিইও নিয়োগের সুপারিশ করেছেন। সূত্রের খবর, ‘সিট’-এর প্রাথমিক রিপোর্টে ১৭ জন ব্যক্তিকে ‘দোষী’ চিহ্নিত করা হয়েছে। এ ছাড়াও রামমন্দিরের সঙ্গে যুক্ত প্রায় দেড়শো সেবাদারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। রিপোর্টে বলা হয়েছে, রামমন্দির প্রতিষ্ঠা হওয়ার পরে এঁদের অনেকেরই সম্পদ কয়েক গুণ বেড়েছে। সম্পত্তি বৃদ্ধির তালিকায় নাম উঠে এসেছে ফুলকান্ত মিশ্র নামে মন্দিরের সঙ্গে যুক্ত এক ব্যক্তির। যিনি ‘রাম জন্মভূমি তীর্থ ক্ষেত্র’-এর সাধারণ সম্পাদক তথা ভিএইচপি-র সহ-সভাপতি চম্পতের ‘ঘনিষ্ঠ’ বলে পরিচিত। উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ শুক্রবার প্রণামী চুরি প্রসঙ্গে বলেন, ‘‘ভক্তদের বিশ্বাস নিয়ে ছিনিমিনি খেলা বরদাস্ত করা হবে না। সনাতন ধর্মের মূল্যবোধে আঘাত হানার বিরুদ্ধে শূন্য-সহনশীলতা (জ়িরো টলার্যান্স) নীতি অনুসরণে আমরা বদ্ধপরিকর।’’