Advertisement
E-Paper

ভারতীয় কৃষিপণ্যের জন্য থাকছে সুরক্ষাবলয়, জানাল আমেরিকা, বাণিজ্যসমঝোতা ঘিরে সংশয় দূর করতে সক্রিয় ট্রাম্প সরকার

মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার জানান, ট্রাম্প প্রশাসন সোমবার থেকে ভারতের সঙ্গে ঘোষিত বাণিজ্যসমঝোতাকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য কাজ শুরু করছে। তিনি বলেন, ‘‘ভারত তাদের কৃষিপণ্যের জন্য কিছু সুরক্ষাবলয় রাখছে।’’

আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক

শেষ আপডেট: ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ২৩:০৮

গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

ভারত-মার্কিন বাণিজ্যসমঝোতার ঘোষণা নিয়ে মঙ্গলবার দিনভর সরগরম রইল জাতীয় রাজনীতি। সেই সঙ্গে এল প্রতিক্রিয়াও। সংসদের বাজেট অধিবেশন-পর্বে কংগ্রেস-সহ বিরোধী দলগুলির তরফে এ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সরকারের উদ্দেশে নানা প্রশ্ন তোলা হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দাবির সত্যতা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সরকারও। তবে বাণিজ্যসমঝোতা চূড়ান্ত হলেও তার খসড়া যে এখনও প্রস্তুত হয়নি, সে কথা জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণ।

টানাপড়েনের এই আবহে মঙ্গলবার রাতে সিএনবিসিতে এক সাক্ষাৎকারে মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার জানান, ট্রাম্প প্রশাসন সোমবার থেকে ভারতের সঙ্গে ঘোষিত বাণিজ্যসমঝোতাকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য কাজ শুরু করছে। তিনি বলেন, ‘‘আমরা চুক্তির নথিপত্র তৈরির কাজ শেষ করছি। আমরা এর সুনির্দিষ্ট বিষয়গুলি জানি। বিস্তারিত ভাবে জানি। এর পরেই গ্রিয়ারের মন্তব্য, ‘‘ভারত তাদের কৃষিপণ্যের জন্য কিছু সুরক্ষাবলয় রাখছে।’’

প্রধানমন্ত্রী মোদীর সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলার পরে সোমবার রাতে (ভারতীয় সময়) মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যসমঝোতার কথা ঘোষণা করেন। ভারতীয় পণ্য শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৮ শতাংশ করা হবে বলে জানান তিনি। মোদী সোমবার রাতে সমাজমাধ্যমে এবং মঙ্গলবার সকালে এনডিএ বৈঠকে চুক্তির জন্য উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী মোদী। কিন্তু ট্রাম্পের ওই ঘোষণা বেশ কিছু প্রশ্ন তুলে দিয়েছে, যেগুলির উত্তর এখনও স্পষ্ট নয়। প্রথম ধোঁয়াশা ‘বাণিজ্যসমঝোতা’ ঘিরে। সোমবার রাতে ট্রাম্প ঘোষণা করেন, তাঁরা উভয়েই একটি ‘বাণিজ্যসমঝোতা’তে সম্মত হয়েছেন। এই বাণিজ্যসমঝোতা অবিলম্বে কার্যকর হবে বলে দাবি করেন তিনি। এখানেই প্রশ্ন, তিনি কি দু’দেশের মধ্যে বৃহত্তর বাণিজ্যসমঝোতা (মুক্ত বাণিজ্যসমঝোতা বা এফটিএ)-র কথা বোঝাতে চাইলেন? না কি এটি শুধুই শুল্ক কমানো সংক্রান্ত একটি বাণিজ্যিক চুক্তি? ট্রাম্পের পোস্টে এর কোনও ব্যাখ্যা নেই। প্রধানমন্ত্রীও ট্রাম্পকে ধন্যবাদজ্ঞাপনের সময়ে পোস্টে এ বিষয়ে কোনও আলোকপাত করেননি। ফলে এটি নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েই গিয়েছে।

মুক্ত বাণিজ্যসমঝোতা নিয়ে গত এক বছর ধরে আলোচনা চলছে ভারত এবং আমেরিকার। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে মোদীর ওয়াশিংটন সফরের পর থেকে দু’দেশের বাণিজ্য প্রতিনিধিদলের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছিল। শুল্ক ঘিরে জটিলতার মাঝে তা থমকেও ছিল। পরে আবার তা শুরু হয়। এখনও পর্যন্ত বেশ কয়েক দফায় দু’দেশের মধ্যে তা নিয়ে বৈঠক হয়েছে। এরই মধ্যে আচমকা ট্রাম্প চুক্তির কথা ঘোষণা করায় প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। গত সপ্তাহেই ভারত-ইউরোপ মুক্ত বাণিজ্যসমঝোতার রূপরেখা প্রকাশিত হয়েছে। এ ক্ষেত্রে তেমন কিছুই হয়নি। ট্রাম্প দাবি করেছেন, এই চুক্তি কার্যকর হলে ভারত ৫০০০০ কোটি ডলারেরও (৪৫ লক্ষ কোটি টাকারও বেশি) বেশি মূল্যের জ্বালানি, প্রযুক্তি, কৃষি, কয়লা এবং অন্যান্য অনেক পণ্য কিনবে। কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণের দাবি, ভারতীয় পণ্যে মার্কিন শুল্ক কমে ১৮ শতাংশ হওয়ার ফলে রফতানির অঙ্ক অনেক বাড়বে বলে দাবি করেন তিনি। ভারতে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে আমেরিকার যে শুল্ক সংক্রান্ত এবং অন্য (বাণিজ্যিক) প্রতিবন্ধকতা রয়েছে, সেগুলিও কমিয়ে শূন্যে নামিয়ে আনতে উদ্যোগী হবে দিল্লি।

কোন কোন ক্ষেত্রে শুল্ক বা অন্য বাণিজ্যিক প্রতিবন্ধকতা ভারত শূন্যে নামিয়ে আনবে, তা ট্রাম্পের পোস্টে স্পষ্ট নয়। যেমনটা স্পষ্ট নয় মোদীর পোস্টেও। এর আগে জানা গিয়েছিল, দুগ্ধ এবং কিছু কৃষিজ ক্ষেত্রে আমেরিকার দাবি নিয়ে আপত্তি রয়েছে ভারতের। এখন সেগুলি নিয়ে ভারতের কী অবস্থান, সেই উত্তরও অজানা। কেন্দ্রীয় বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গয়াল বাণিজ্যসমঝোতাতে কৃষি ও দুগ্ধজাত পণ্যের বাজার সুরক্ষিত থাকার দাবি তুললেও দেশের প্রাক্তন বিদেশসচিব তথা রাজ্যসভার রাষ্ট্রপতি মনোনীত সাংসদ হর্ষ বর্ধন শ্রীংলা মঙ্গলবার রয়টার্সে প্রকাশিত এ সংক্রান্ত খবরের (মার্কিন কৃষিপণ্যের জন্য ভারতের বাজার খোলা হবে) সত্যতা স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘‘কিছু জিনিস আমেরিকা থেকে আসবে। কিন্তু সেগুলি আমাদের কৃষিক্ষেত্রের জন্য ক্ষতিকারক হবে না। এর মধ্যে কোনও স্ববিরোধিতা নেই। এর ফলে দেশের কৃষকেরা কোনও সমস্যায় পড়বেন না।”

রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনা কি বন্ধ?

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সোমবার রাতে দাবি, রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধ করতে রাজি হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী মোদী। পরিবর্তে আমেরিকা থেকে বেশি করে তেল কিনবে ভারত। এ ছাড়া আমেরিকা থেকে ৪৫ লক্ষ ২৫ হাজার ৬২২ কোটি টাকার পণ্যও ভারত কিনবে কথা বলে দিয়েছেন মোদী। শুল্ক কমানোর নেপথ্যে এগুলিই অন্যতম কারণ বলে ব্যাখ্যা করেছেন ট্রাম্প। নিজের সমাজমাধ্যমে একটি পোস্টে তিনি লেখেন, “তিনি (মোদী) রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধ করতে রাজি হয়েছেন। আমেরিকার কাছ থেকে আরও অনেক বেশি তেল কিনবে ভারত। সম্ভবত ভেনেজ়ুয়েলার কাছ থেকেও ভারত বেশি করে তেল কিনবে।”

ট্রাম্পের এই ঘোষণার পর পরই সমাজমাধ্যমে পোস্ট করেন প্রধানমন্ত্রী মোদীও। শুল্ক কমানোর জন্য ১৪০ কোটি ভারতবাসীর পক্ষ থেকে ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানান তিনি। তবে রাশিয়া থেকে ভারত তেল কেনা বন্ধ করে ‌দিচ্ছে কি না, সে বিষয়ে কোনও মন্তব্য করেননি মোদী। যেমন মন্তব্য করেননি ট্রাম্পের দাবি মতো আমেরিকা থেকে বেশি করে তেল কেনা নিয়েও। কিন্তু চুপ থাকেনি মস্কো। মঙ্গলবার ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেশকভ বলেন, ‘‘রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধ করার বিষয়ে ভারতের তরফ থেকে কোনও বার্তা আসেনি। নয়াদিল্লির সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারি গড়ে তোলার বিষয়ে বরাবরই আগ্রহী মস্কো।’’ কার্যত ট্রাম্পের দাবির সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ‘‘রাশিয়া বরাবরই ভারতের সঙ্গে তার সম্পর্ককে মূল্যবান বলে মনে করে এবং দ্বিপাক্ষিক কৌশলগত অংশীদারি এগিয়ে নিয়ে যেতে চায়।’’

প্রসঙ্গত, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে তেল কিনে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে রাশিয়াকে মদত দেওয়ার অভিযোগ তুলে গত অগস্টের গোড়ায় ভারতীয় পণ্যে জরিমানা-সহ ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপের কথা জানিয়েছিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সরকার। তার পরেও রাশিয়া থেকে ধারাবাহিক ভাবে তেল কিনেছে ভারত। ট্রাম্প সরকারের অভিযোগ, ভারতের তেল কেনার জন্যই ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার অর্থ পাচ্ছে রাশিয়া। যদিও বিভিন্ন পরিসংখ্যান জানাচ্ছে, রাশিয়ার তেল কেনা নিয়ে ভারতের সমালোচনাকারী দেশগুলি নিজেরাই রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যে লিপ্ত হচ্ছে! পরিসংখ্যান তুলে ধরে বিদেশ মন্ত্রক জানিয়েছে, শুধু ২০২৪ সালেই ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং রাশিয়ার মধ্যে ৬৭৫০০ কোটি ইউরোর (প্রায় ১৮ লক্ষ ৩২ হাজার কোটি টাকা) দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য হয়েছে। সেই হিসাবে দেখতে গেলে ভারত-রাশিয়ার মোট বাণিজ্যের চেয়ে অনেক বেশি। শুধু তা-ই নয়, ২০২৪ সালে ইউরোপের প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানির পরিমাণও ১৬৫ লক্ষ টনে গিয়ে পৌঁছেছে, যা ২০২২ সালের রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে গিয়েছে।

কৃষি ও দুগ্ধজাত দেশীয় পণ্যের সুরক্ষা নিয়ে প্রশ্ন

কেন্দ্রীয় বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ মঙ্গলবার বলেছেন, ‘‘কৃষি ও দুগ্ধজাত পণ্যের স্বার্থের সঙ্গে কোনও সমঝোতা না করেই আমরা এই চুক্তি করেছি। আমাদের প্রতিযোগীদের তুলনায় যা অনেকটাই ভাল।’’ যদিও সংবাদসংস্থা রয়টার্স মঙ্গলবার জানিয়েছে, বাণিজ্যসমঝোতার শর্ত হিসাবে এ বার ভারতের কৃষিক্ষেত্রের দরজাও ‘আংশিক’ ভাবে খুলে দিতে চলেছে মোদী সরকার। যা নিয়ে ইতিমধ্যেই প্রশ্ন তুলেছে বিরোধীরা। এই আবহে পীযূষের অভিযোগ, কংগ্রেস-সহ বিরোধী দলগুলি বাণিজ্যসমঝোতা নিয়ে দেশবাসীকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা চালাচ্ছে। লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীকে নিশানা করে তাঁর মন্তব্য, ‘‘তাঁর (রাহুল) একটি নেতিবাচক মানসিকতা রয়েছে এবং তিনি ভারতের অগ্রগতির বিরোধী।’’

যদিও ভারত-মার্কিন বাণিজ্যসমঝোতার খসড়া সম্পর্কে কোনও তথ্য দেননি মোদী সরকারের বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ। তিনি বাণিজ্যসমঝোতাতে কৃষি ও দুগ্ধজাত পণ্যের বাজার সুরক্ষিত থাকার দাবি তুললেও দেশের প্রাক্তন বিদেশসচিব তথা রাজ্যসভার রাষ্ট্রপতি মনোনীত সাংসদ হর্ষ বর্ধন শ্রীংলা মঙ্গলবার কার্যত রয়টার্সে প্রকাশিত খবরের সত্যতা স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘‘কিছু জিনিস আমেরিকা থেকে আসবে। কিন্তু সেগুলি আমাদের কৃষিক্ষেত্রের জন্য ক্ষতিকারক হবে না। এর মধ্যে কোনও স্ববিরোধিতা নেই। এর ফলে দেশের কৃষকেরা কোনও সমস্যায় পড়বেন না।” সূত্রের খবর, সংশ্লিষ্ট বাণিজ্যসমঝোতাতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা আপেল, ব্লুবেরি ও ব্ল্যাকবেরির মতো বাদাম জাতীয় ফল এবং নির্বাচিত প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যের (যার মধ্যে দুগ্ধজাত পণ্য রয়েছে) শুল্ক কমাতে রাজি হয়েছে ভারত।

যুদ্ধবিরতির মতোই একতরফা ঘোষণা কেন

কেন ভারত সরকার বা প্রধানমন্ত্রী মোদী নন? ভারত-আমেরিকা বাণিজ্যসমঝোতা কেন আগে একতরফা ভাবে ঘোষণা করলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প? প্রশ্ন তুলল কংগ্রেস-সহ কয়েকটি বিরোধী দল। একই সঙ্গে এই চুক্তির বিস্তারিত বিবরণ প্রকাশের দাবিও জানানো হয়েছে। এই চুক্তি কী ভাবে ভারতীয় কৃষক, ব্যবসায়ী এবং শিল্পকে প্রভাবিত করবে, তার সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা দেওয়ারও দাবি তোলা হয়েছে বিরোধীদের তরফে।

ঘটনাচক্রে, গত বছরের মে মাসে অপারেশন সিঁদুর-পরবর্তী ভারত-পাক সংঘাতের সময় ট্রাম্পই প্রথমে সংঘর্ষবিরতির ঘোষণা করেছিলেন। তার পর ইসলামাবাদ এবং নয়াদিল্লির তরফে সংঘর্ষবিরতি ঘোষণা হয়। এ ক্ষেত্রে সেই নজিরও তুলেছে বিরোধীরা। কংগ্রেস বলেছে, ‘‘সংঘর্ষবিরতির মতো, বাণিজ্যসমঝোতার ঘোষণা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প করলেন।’’ সেই সঙ্গে রাহুল গান্ধী-মল্লিকার্জুন খড়্গের দলের আশঙ্কা, শুল্ক, অশুল্ক বাধা ‘শূন্যে’ নিয়ে আসতে পারে ভারত। মোদী সরকার মার্কিন পণ্যের জন্য ভারতের বাজার উন্মুক্ত করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তার ফলে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা ক্ষতির মুখে পড়বেন।

সোমবার রাতে ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ ট্রাম্প দাবি করেন, ভারতের উপরে ‘পারস্পরিক শুল্ক’ (রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ) ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৮ শতাংশ করা হচ্ছে। কিন্তু রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যের জন্য ‘জরিমানা’ বাবদ ভারতের উপরে আরও ২৫ শতাংশ শুল্ক চাপানো ছিল। সেটির কী হবে, তা প্রাথমিক ভাবে ট্রাম্পের পোস্টে স্পষ্ট ছিল না। যা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল বিরোধীরা। পরে হোয়াইট হাউসের সূত্র উদ্ধৃত করে সংবাদ সংস্থা রয়টার্স জানায়, জরিমানা বাবদ ওই শুল্কটিও প্রত্যাহার করছে আমেরিকা। ফলে এখন আমেরিকার বাজারে ভারতীয় পণ্যের উপর ৫০ শতাংশের পরিবর্তে ১৮ শতাংশ শুল্ক ধার্য হবে।

সত্যি কতটা সুবিধা হবে ভারতের

আমেরিকায় পণ্য রফতানিতে কি এ বার আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের চেয়ে বেশি সুবিধা পাবে ভারত? নতুন করে শুল্ক সমঝোতার পরে সেই প্রশ্নই উঁকি মারতে শুরু করেছে। ভারতের উপর শুল্ক ১৮ শতাংশে নামিয়ে আনার ঘোষণা করেছেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যা এশিয়ার অন্য অনেক দেশের উপর চাপানো শুল্কের তুলনায় কম। কম পড়শি দেশগুলির তুলনাতেও।

বর্তমানে আমেরিকার বাজারে বাংলাদেশ এবং ভিয়েতনাম উভয় দেশের পণ্যের উপরেই ২০ শতাংশ করে শুল্ক চাপানো রয়েছে। এই দুই দেশই বস্ত্র রফতানিতে ভারতের অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী। এত দিন ভারতীয় পণ্যে আমেরিকা ৫০ শতাংশ শুল্ক চাপিয়ে রাখার ফলে দুই দেশই কিছুটা সুবিধা পেয়েছে মার্কিন বাজারে। তবে এ বার নতুন শুল্ক ব্যবস্থায় ফের আমেরিকায় পুরানো বাজার ফিরে পেতে পারে ভারতীয় বস্ত্র। তবে আগামী ৯ ফেব্রুয়ারি আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্যসমঝোতা হতে পারে বাংলাদেশের। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশের উপর মার্কিন শুল্ক শেষ পর্যন্ত কত হয়, তার উপরেও পরিস্থিতি অনেকটা নির্ভর করতে পারে।

এ ছাড়া বস্ত্র রফতানির বাজারে চিনও ভারতের অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী। চিনের উপরে বর্তমানে ৩৭ শতাংশ শুল্ক চাপিয়ে রেখেছে আমেরিকা। তার চেয়ে ভারতের জন্য শুল্ক অনেকটাই কম। ফলে সেই জায়গা থেকেও লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে ভারতীয় বস্ত্র শিল্পের। পাশাপাশি পাকিস্তান-সহ এশিয়ার আরও কিছু দেশ যেমন মালয়েশিয়া, কম্বোডিয়া এবং তাইল্যান্ডের উপরেও মার্কিন শুল্ক রয়েছে ১৯ শতাংশ। ট্রাম্পের নতুন ঘোষণায় আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে আপাতত কিছুটা সুবিধাজনক জায়গায় থাকছে ভারত।

ভারতের উপর নতুন মার্কিন শুল্কের হার প্রতিবেশী দেশগুলি এবং এশিয়ার বিভিন্ন প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের তুলনায় কম। কিন্তু তাতে আদৌ কতটা সুবিধা হবে তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বণিকমহলের একাংশ। কারণ, ভারতের সকল প্রতিবেশী দেশ এবং এশিয়ায় কিছু প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ আমেরিকা পণ্য রফতানিতে বিশেষ ‘ছাড়’ পায়। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নিয়ম অনুসারে, উন্নত দেশগুলি উন্নয়নশীল বা স্বল্পোন্নত দেশগুলির কিছু পণ্য আমদানির উপর শুল্কে ছাড় দেয়। এটিকে বলা হয় ‘জেনারালাইজ় সিস্টেম অফ প্রেফারেন্স’ (জিএসপি)। আমেরিকার বাজারে ভারতের প্রতিবেশী এবং এশিয়ার কিছু প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ এই ‘জিএসপি’-র আওতায় এমনিতেই প্রায় পাঁচ শতাংশ ছাড় পায়। অতীতে ভারতও এই ছাড় পেত। কিন্তু ২০১৯ সালের জুনে ট্রাম্প সরকারের প্রথম মেয়াদে ভারতের উপর থেকে এই সুবিধা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়‌েছিল। তা ফিরিয়ে দেওয়ার কোনও ইঙ্গিত দেয়নি হোয়াইট হাউস।

চুক্তির ‘চাবিকাঠি’ কি ভেনেজ়ুয়েলাতেই?

ভারত-আমেরিকা বাণিজ্যসমঝোতা ‘চূড়ান্ত’ ঘোষণা হওয়ার দিন কয়েক আগেই ভেনেজ়ুয়েলার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ডেলসি রডরিগেসের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। সেই কূটনৈতিক কথাবার্তাই কি অনুঘটকের কাজ করল এই চুক্তিতে? তার জেরেই কি ভারতীয় পণ্যের উপরে শুল্ক ৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৮ শতাংশ করা হয়? সেই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে। গত ১২ মাসে টানাপড়েনের মধ্যে দিয়ে গিয়েছে ভারত এবং আমেরিকার সম্পর্ক। তার অন্যতম কারণ, শুল্কের খাঁড়া। সেই নিয়ে দুই দেশের মধ্যে বার বার আলোচনা হয়েছে। কিন্তু সুরাহা হয়নি। কারণ, আমেরিকার আপত্তির জায়গা ছিল, ইউক্রনের সঙ্গে যুদ্ধের মধ্যেও রাশিয়া থেকে ভারতের তেল কেনা। তিনি জানিয়েছিলেন, রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধ করলে ভারতীয় পণ্যে চাপানো জরিমানা-সহ ৫০ শতাংশ শুল্ক কমানো হবে। আমেরিকা এবং ভেনেজ়ুয়েলা থেকে আরও বেশি করে তেল কেনার কথাও বলেছিলেন তিনি।

এই আবহেই গত ৩০ জানুয়ারি ভেনেজ়ুয়েলার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্টকে ফোন করেন প্রধানমন্ত্রী মোদী। সে কথা নিজেই জানান সমাজমাধ্যমে। তিনি লেখেন, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে সম্মত হয়েছে দুই দেশ। তার পরেই শুরু হয়েছিল জল্পনা। তবে কি ট্রাম্পের শর্তেই রাজি হচ্ছে ভারত। কারণ, ট্রাম্প গত কয়েক দিন ধরে দাবি করছিলেন, ভারত রাশিয়া থেকে আর তেল কিনবে না। যে দিন ভেনেজ়ুয়েলার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্টের সঙ্গে মোদীর কথা হয়, তার পরের দিন, ৩১ জানুয়ারি ওয়াশিংটন ডিসি থেকে ফ্লরিডা যাওয়ার সময় এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ট্রাম্প দাবি করেন, ইরান নয়, ভারত এ বার তেল কিনবে ভেনেজ়ুয়েলার থেকে। প্রসঙ্গত, রাশিয়ার মতো ইরানের থেকেও অপরিশোধিত তেল কেনে ভারত। ট্রাম্প আরও বলেন, ‘‘আমরা ইতিমধ্যেই চুক্তির বিষয়ে একটা ধারণা করে ফেলেছি।’’ মার্কিন প্রেসিডেন্টের সেই মন্তব্যের পরেই শুরু হয়ে গিয়েছিল জল্পনা।

যদিও ট্রাম্পের দাবি সম্পর্কে নয়াদিল্লি এখনও পর্যন্ত কোনও মন্তব্য করেনি। প্রধানমন্ত্রী মোদী মঙ্গলবার বাণিজ্যসমঝোতা সম্পর্কে বলেন, ধৈর্যের ফল মিলেছে! তাঁর কথায়, ‘‘এই চুক্তি একটি অনুকূল অর্থনৈতিক পরিবেশ তৈরি করেছে। বিশ্বব্যাপী বাণিজ্য আলোচনায় সরকারের অবিচল দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন ঘটছে।’’ সেই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘‘মানুষ শুল্কের সমালোচনা করেছিলেন। কিন্তু আমরা ধৈর্য ধরে ছিলাম। তার ফলাফলই এখন দৃশ্যমান।’’ তাঁর মতে, বিশ্বের অবস্থানের পরিবর্তন ঘটছে। তার গতিপথ ক্রমশ ভারতে দিকে ঝুঁকছে বলে দাবি করেন মোদী। তাঁর কথায়, ‘‘বিশ্ব জুড়ে যে বাণিজ্য-উত্তেজনা চলছে, তার মধ্যেও ভারত লাভজনক জায়গায় পৌঁছোচ্ছে।’’ মোদীর মতে, ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক লাভের সুযোগ রয়েছে। বাণিজ্যসমঝোতার ফলে এখন দেশীয় এবং উচ্চমানের উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে, যা ভারতে শিল্পকে অনেকাংশে এগিয়ে দেবে। আমেরিকা এবং ভারতের বাণিজ্যসমঝোতাকে ‘ঐতিহাসিক’ বলেও বর্ণনা করেন মোদী।

US Tariff War India US Tariff War Trade Deal India-US Trade Deal
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy