Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

২৪ জানুয়ারি ২০২২ ই-পেপার

টেন-টুয়েলভের না হওয়া পরীক্ষার নম্বর কী ভাবে দেওয়া হচ্ছে

শুভময় মৈত্র
০৬ জুলাই ২০২০ ১৬:৫৫
কী ভাবে নম্বর, এখনও পরিষ্কার নয় অনেকের কাছেই। —ফাইল চিত্র।

কী ভাবে নম্বর, এখনও পরিষ্কার নয় অনেকের কাছেই। —ফাইল চিত্র।

আজকের দিনে পড়ুয়াদের আলোচনার একটা বড় বিষয় পরীক্ষার ফলাফল। ভারতে এই মুহূর্তে অন্তত কোটিখানেক মেধাবী পড়ুয়া আছে যারা মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক স্তরে বিভিন্ন বোর্ডের পরীক্ষা দিচ্ছে। শুধু পাশ করা এদের উদ্দেশ্য নয়, বরং আশি শতাংশ নম্বরও এদের কাছে অকৃতকার্য হওয়ার সামিল। বহু ছাত্রছাত্রী আছে যারা বিশেষ সংশয় ছাড়াই পঁচানব্বই শতাংশ নম্বর পায়। এই সংখ্যাটা মোট পরীক্ষার্থীর প্রায় দশ শতাংশ। অর্থাৎ ভারত জুড়ে এই মুহূর্তে ক্লাস টেন এবং টুয়েলভে মোটের উপর দশ লক্ষ পড়ুয়া আছে যারা ঠিকঠাক পরীক্ষা হলে পঁচানব্বই শতাংশের ওপর নম্বর পেত।

গত শতক থেকে আজ পর্যন্ত আমাদের দেশে ধীরে ধীরে নম্বর বাড়ার বিষয়টি সকলেরই জানা। ষাট কিংবা সত্তরের দশকে বোর্ডের পরীক্ষায় প্রথম স্থানাধিকারী হয়ত আশি শতাংশ নম্বর পেত। আশির দশকেই তা নব্বই-এর ঘরে ঢুকে যায়। আগের সহস্রাব্দে একশো না ছুঁলেও, গত দুই দশকে তা প্রায় পুরো নম্বরেই পৌঁছে গিয়েছে। মোট পাঁচশো নম্বরের পরীক্ষায় যে প্রথম হয়, তার হয়ত বড় জোর এক বা দুই নম্বর কাটা যায়। শতাংশের হিসেবে নিরানব্বই দশমিক আট কিংবা ছয়। আর নিরানব্বই শতাংশের উপরে পাওয়া কিশোর কিশোরী এই কলকাতা শহরেই খুঁজে পাবেন কয়েক শো। কম নম্বর কি কেউ পান না? খুব অল্প সংখ্যক পড়ুয়া অকৃতকার্য হন আজকাল। অর্থাৎ নম্বরের সঙ্গে শতাংশের যে বিন্যাস তাতে বেশি নম্বর পাওয়ার দিকে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা বেশি থাকে, আর তিরিশের নীচে একেবারেই কম। দেশের মধ্যবিত্ত বা স্বচ্ছল বাড়ির ছেলেমেয়েদের মধ্যে এটাই বাস্তব চিত্র।

ঠিক এই বিন্যাসটাকেই ধরার চেষ্টা করা হয় আনুমানিক ফল নির্ধারণের সময়। তবে একটা বিধিসম্মত সতর্কীকরণ লিখে ফেলা যাক যে— আমাদের দেশে নিম্নবিত্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় আশি কোটি। তাঁদের ছেলেমেয়েদের মধ্যে অনেকেই মেধাবী। কিন্তু সুযোগের অভাবে অনেকেই পরীক্ষার ফলে তার প্রমাণ দিতে পারে না। এই আলোচনায় তাদের কথা বলা হচ্ছে না, বরং মোটের উপর আলোচনা হচ্ছে সমাজের সুবিধাভোগী অংশের পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে।

Advertisement



কত রকম ভাবে আনুমানিক নম্বর স্থির করা যায়? অঙ্কের তাত্ত্বিক হিসেবে অসংখ্য। —ফাইল চিত্র।

কোভিড অতিমারির প্রেক্ষিতে মার্চের শেষে এবং এপ্রিলের শুরুতে ঝট্ করে সব পরীক্ষা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। আজকের পরিস্থিতিতে পিছন ফিরে তাকালে মনে হতেই পারে যে, সে সময় তো প্রকোপ ছিল অনেক কম, হয়ত পরীক্ষাগুলো করিয়ে নিলেই ভাল হত। মনে রাখার মত বিষয় হল পশ্চিমবঙ্গের প্রযুক্তিবিদ্যার প্রবেশিকা পরীক্ষা এ বার এগিয়ে আনা হয়েছিল জানুয়ারি মাসে। সাধারণত তা এপ্রিলে হয়। সেই নিয়ে সমালোচনাও হয়েছিল অনেক। কিন্তু এখন বোঝা যাচ্ছে যে, সেটা তো পরীক্ষার ভিত্তিতে একটা মূল্যায়ন, যা প্রতিযোগিতামূলক প্রবেশিকার ক্ষেত্রে যথেষ্ট কাজের। সেখানে আসনের সংখ্যা সীমিত, তাই আনুমানিক ফলের ভিত্তিতে কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রায় অসম্ভব। অন্য দিকে বোর্ডের পরীক্ষায় আসনের সীমাবদ্ধতা নেই, নম্বরটাই মুখ্য। তবে পরোক্ষ ভাবে দেখলে উচ্চমাধ্যমিক স্তরে সেই নম্বরের ভিত্তিতে ভাল কলেজে ভর্তি হওয়ার ক্ষেত্রে তীব্র প্রতিযোগিতার প্রশ্ন আসবেই। অর্থাৎ সব সমস্যার সমাধান হওয়া অসম্ভব। যে ভাবেই বাতিল হয়ে যাওয়া পরীক্ষায় নম্বর দেওয়া হোক না কেন, তার পক্ষে এবং বিপক্ষে যুক্তি থাকবে। আর কত রকম ভাবে এই আনুমানিক নম্বর স্থির করা যায়? তা অঙ্কের তাত্ত্বিক হিসেবে অসংখ্য। এর মধ্যে আপনি ভাবলেই অন্তত হাজার খানেক সূত্র খুঁজে বার করতে পারবেন।

আরও পড়ুন: কোভিড যে বিপজ্জনক, তা বোঝার জন্য পরিসংখ্যানের যুক্তিজাল বোনা অদরকারি

আনুমানিক মূল্যায়নের বিষয়টি রাশিবিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা। তবে এখানে একটা বড় মুশকিল আছে। তা হল খেলার যে নিয়ম, তা ঠিক করা হচ্ছে পরে। অর্থাৎ পরীক্ষা শুরু হওয়ার আগে বিষয়টি জানা ছিল না। এ ক্ষেত্রে সেটা মেনে নিতেই হবে, কারণ কোভিডের গোলমালটা যে এই পর্যায়ে পৌঁছবে তা ছ-মাস আগে কেউই ভাবেননি। অন্য দিকটা হল আনুমানিক মান স্থির করার ক্ষেত্রে সূত্রের জটিলতা। সূত্র যদি জটিল হয় তা হলে পরীক্ষার্থী সেটা বুঝতেই পারবে না। রাশিবিজ্ঞানী তাঁর সারা জীবনের জ্ঞান নিষ্কাশন করে অসাধারণ কোনও ফর্মুলা বানালেও তা কয়েক জন পড়ুয়ার পছন্দ নাই হতে পারে। সে ক্ষেত্রে কেউ যদি ন্যায়ালয়ে বিচার চাইতে যায়, তখনই হবে বিরাট মুশকিল। জটিল বীজগাণিতিক সূত্র নিয়ে সমাজজীবনে আলোড়ন সৃষ্টি হবে। খবরের কাগজের পাতায় সেটা বুঝতে এবং বোঝাতে প্রতিবেদক থেকে পাঠক সকলেই হিমশিম খাবেন। আবার বিশেষজ্ঞরা নিজেরাই জানেন যে, সব থেকে ভাল ফর্মুলা বলে কিছু হয় না। তাই সঠিক বিচার পাওয়া অসম্ভব। আর একটা গোলমাল হল সহজ সূত্রকে জটিল ভাবে পেশ করা। গবেষণার ক্ষেত্রে অনেক সময় বিজ্ঞানীরা এইরকম ভাষায় লিখে থাকেন, যাতে অন্যেরা ভাবেন বিষয়টা বেশ জটিল এবং নতুন। সেখানকার সমস্যা তাই অন্য স্তরের। সৌভাগ্যের কথা হল অপ্রয়োজনীয় এবং জটিল গবেষণা আমজনতাকে বিদ্ধ করে না। তবে কিশোর-কিশোরীদের নম্বরের ক্ষেত্রে ভাবনা গুলিয়ে দেওয়ার থেকে অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য সেই সূত্র সহজ করে লেখা। এ বারের একটি বোর্ডের আনুমানিক নম্বর নির্ধারণের ক্ষেত্রে এই সমস্যা সামান্য হলেও আছে। সেই আলোচনাতেও আসব আমরা। আর এগুলো বুঝতে গেলে অষ্টম শ্রেণির বীজগণিত এবং শতকরার অঙ্ক আসবেই। সেটুকু যন্ত্রণা পাঠক-পাঠিকাদের সহ্য করতেই হবে।



মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক স্তরে ভারতে সবথেকে জনপ্রিয় সিবিএসই বোর্ড। তাদের ক্ষেত্রে বেশির ভাগ পরীক্ষার্থীর তিনটি বা তার থেকে বেশি পরীক্ষা হয়ে গিয়েছে। খুব ঝামেলা শুধু দিল্লির ছেলেমেয়েদের। কোভিড হানা দেওয়ার আগে ট্রাম্প-সফরের সময় ব্যাপক দাঙ্গার কারণে বন্ধ রাখতে হয়েছিল পরীক্ষা। ফলে অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নের মাধ্যমে সেখানে আনুমানিক নম্বর স্থির করা হবে। সে আলোচনায় ঢুকে আর জটিলতা বাড়াচ্ছি না। যাদের তিনটি পরীক্ষা হয়েছে, তার মধ্যে সব থেকে ভাল দুটির নম্বর নিয়ে বাকি পরীক্ষার মান হিসেবে ধরে নেওয়া হবে। ধরা যাক বিষয়গুলি হল ‘ক’, ‘খ’, ‘গ’, ‘ঘ’, ‘ঙ’ আর ‘চ’। এ বার পরীক্ষা দিয়ে ১০০-র মধ্যে একজন পেয়েছে ‘ক’, ‘খ’ আর ‘গ’ -এ যথাক্রমে ৯০, ৯২, আর ৯৩। তখন ৯২ আর ৯৩ এর গড় নিয়ে পাব ৯২.৫। সেটাই হবে ‘ঘ’, ‘ঙ’ আর ‘চ’ এর নম্বর। কেউ যদি চারটি বা তার বেশি পরীক্ষা দিয়ে থাকে তা হলে নেওয়া হবে সেরা তিনটি নম্বরের গড়। ১০০-র মধ্যে ‘ক’, ‘খ’, ‘গ’ আর ‘ঘ’ -এর প্রাপ্ত নম্বর যদি ৯০, ৯২, ৯৩ আর ৯১ হয়, তা হলে ৯১, ৯২ আর ৯৩ এর গড় নিয়ে পাওয়া যাবে ৯২। সেটাই হবে বাকি বিষয়গুলির আনুমানিক মান।

অনুমানের এই পদ্ধতি বেশ ভালই এবং বোধগম্য। সাধারণ ভাবে মাধ্যমিক স্তরের নম্বরে কলেজে ভর্তি হওয়ার ব্যাপার নেই। সেখানে বেশির ভাগ বিষয়ের পরীক্ষা হয়েই গিয়েছিল। অনেকের তো সবকটাই মিটে গিয়েছে। উচ্চমাধ্যমিক স্তরে জটিলতা একটু বেশি। মোটের উপর হয়ত খুব মুশকিল হবে না। তবে আবার যে কথা মনে করিয়ে দিতে হবে, তা হল কোটিখানেক পরীক্ষার্থীর মধ্যে হেসেখেলে কয়েক লক্ষ পড়ুয়া থাকবে যারা এই নম্বর দেওয়ার সূত্রে খুশি হবে না। এটা সমাজবিজ্ঞানের কারণে যত না, তার থেকে অনেক বেশি বিজ্ঞানের অনিশ্চয়তা তত্ত্বের অসহায়তায়। ভবিষ্যৎকে অনেক ক্ষেত্রেই সঠিক ভাবে অনুমান করা অসম্ভব। সে আপনি যত সূত্রই বানান না কেন। আর তার ফল ব্যক্তিকেই ভোগ করতে হয়। এই নিয়মে সব থেকে খুশি হবে কে? যার এমন এক বা একাধিক পরীক্ষা বাকি ছিল যাতে সে ভীষণ দুর্বল। সে ক্ষেত্রে পরীক্ষা না দিয়েই জুটে গেল আশাতীত নম্বর। অত্যন্ত মেধাবীদের ক্ষেত্রে কিন্তু ততটা বেশি লাভের সম্ভাবনা নেই। বরং এই বেশি নম্বরগুলোর গড় সাধারণ ভাবে মোট নম্বরটাকে আরও উপরের দিকে তুলে নিয়ে যাবে। ফলে কিছুটা পরীক্ষা দিয়ে পাওয়া আর কিছুটা আনুমানিক মূল্যায়নের ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতার তীক্ষ্ণতা বাড়বে। ভারতে এমনিতেই উচ্চশিক্ষায় আসনের সংখ্যা কম। তার উপর এ বার কোভিড পরিস্থিতিতে সব কিছু ওলটপালট হয়ে গিয়েছে। সুতরাং ইস্কুল থেকে কলেজে পৌঁছনো পড়ুয়াদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা থাকলই।



এ বার আসা যাক আইসিএসই-র কথায়। শুরুতেই বলে নেওয়া যাক এঁদের ভাবা সূত্র বেশ যুক্তিযুক্ত। অসমর্থিত সূত্রের খবর যে দেশের বেশ নামকরা দু-একটি শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান থেকে আমন্ত্রিত রাশিবিজ্ঞানের বিশেষজ্ঞরা এই নিয়ে কাজ করেছেন। আকাশপাতায় বিশদে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে এই অনুমানের সূত্র। বেশির ভাগ পড়ুয়া এতে খুশিই হবে। তবে তা কতগুলো পূর্বনির্ধারিত ধারণার ভিত্তিতে। সেগুলো যাদের ক্ষেত্রে মিলবে না, কিছুটা মুশকিল হবে তাদেরই। আর এই বোর্ডের যে ফর্মুলা দেওয়া হয়েছে, একে লেখা যেত অনেকটা সহজ ভাষায়। প্রথমে সেই কথাতেই আসা যাক, একটি উদাহরণ সহকারে।

আইসিএসই-তে দশম শ্রেণির স্তরে একটি ঐচ্ছিক-সহ মোট বিষয় দশটি। নম্বরের ভিত্তিতে তাদের গুরুত্ব আবার সমান নয়। অর্থাৎ অঙ্কের গুরুত্ব একশো, কিন্তু ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি আর বায়োলজি মিলিয়ে তার ওজনও একশো। যদিও প্রত্যেকটিতেই নম্বর দেওয়া হয় একশোর মধ্যে। পরে আবার বিভিন্ন যোগ আর ভাগের খেলা, অর্থাৎ গড়। আপাতত জটিলতা কমাতে সেটা ভুলে গিয়েই বাকি অঙ্কটা বোঝা যাক। সাধারণ পড়ুয়াদের ক্ষেত্রে মূল যে বিষয়গুলির পরীক্ষা হয়েছে তা হল ইংরিজি (দুটি পত্র), ইতিহাস, পদার্থবিদ্যা, রসায়ন এবং অঙ্ক— অর্থাৎ ছটা। বাকি রয়ে গিয়েছে ভূগোল, জীববিদ্যা আর ঐচ্ছিক বিষয়। দ্বিতীয় ভাষার ক্ষেত্রে বাংলা পরীক্ষা হয়ে গিয়েছে, কিন্তু হিন্দি হয়নি। শুরুতেই বুঝতে পারছেন যে বাংলায় অন্যান্য বিষয়ের থেকে কিছুটা কম নম্বর ওঠে। ফলে এখানে যদি পরীক্ষা না হত, তা হলে ইংলিশ মিডিয়ামের ছেলেমেয়েরা একটু বেশি সুবিধে পেত। সে সুযোগটা ফসকেছে। এ বার ফরমুলা বা সূত্রে আসা যাক। এ প্রসঙ্গে আপাতত ঐচ্ছিক বিষয়ের মধ্যে ঢুকছি না, কারণ তার ক্ষেত্রে নিয়ম আলাদা। সেটা ছাড়া এক একটি বিষয়ে ৮০ নম্বরের পরীক্ষা হয়, আর ২০ নম্বর দিয়ে পাঠান ইস্কুলের মাস্টারমশাই বা দিদিমণিরা, যাকে বলে অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ন বা ইন্টারনাল অ্যাসেসমেন্ট। নিয়ম কী বলছে? যে তিনটি বিষয়ে সেরা নম্বর পাওয়া গিয়েছে তার গড় প্রথমে নিতে হবে, এবং লিখতে হবে শতাংশে। ধরা যাক সেটাকে বলছি ‘প’। অর্থাৎ সেরা তিনটি বিষয়ে ৮০-র মধ্যে পরীক্ষা দিয়ে যদি জোটে ৭২, ৭৫ আর ৭৮, সেক্ষেত্রে গড় হবে আশিতে ৭৫। অর্থাৎ শতাংশ দাঁড়াবে ৯৩.৭৫। একে গুণ করতে হবে ০.৭ দিয়ে। আর ইস্কুলের থেকে নম্বর এসেছে ধরা যাক ২০ তে ১৯। তার শতাংশ দাঁড়াবে ৯৫, একে বলুন ‘ফ’। তাকে গুণ করতে হবে ০.৩ দিয়ে। এই যোগফলটা, অর্থাৎ (০.৭×প + ০.৩×ফ) হবে পরীক্ষা না হওয়া বিষয়ের আনুমানিক নম্বরের শতাংশ। এই উদাহরণের অঙ্ক কষলে তার মান একশোয় ৯৪.১২৫। এ বার এটাকে ৮০-র মধ্যে আনতে হবে, কারণ আদতে পরীক্ষাটা আশিতে। দশমিকের গুণ করে সেটা হচ্ছে ০.৮×৯৪.১২৫ = ৭৫.৩। এ বার সেই বিষয়ের সর্বশেষ ফলাফল দাঁড়াবে পরীক্ষার খাতার আনুমানিক মান ৭৫.৩ যোগ অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নের ১৯, যা কিনা ৯৪.৩।

অঙ্কটাকে একটু ভাল ভাবে লক্ষ্য করলেই বুঝবেন যে অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নের কথা এসেছে দু’বার। অর্থাৎ সূত্র হিসেবে লিখতে গেলে এই মান হচ্ছে ০.৮×(০.৭×প + ০.৩×ফ) + ০.২×ফ = (০.৫৬×প + ০.৪৪×ফ)। এটা একবারে বলে দিলেই বখেড়া কম হত। এটা পরিষ্কার ভাবে না বলার দুটো কারণ থাকতে পারে। এক হল কী ভাবে এই সূত্রে উপনীত হয়েছেন বিশেষজ্ঞরা সেটা আর একটু বুঝিয়ে বলা। সেখানে সম্ভবত বিশ্লেষিত হয়েছে অন্যান্য বছর থেকে পাওয়া তথ্য। তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে গিয়ে তাঁরা পৌঁছেছেন এই সমস্ত সংখ্যায়, যেখান থেকে এসেছে ০.৭ কিংবা ০.৩ এর মত ধ্রুবক। এর যৌক্তিকতা নিয়ে আবার একগাদা বিতর্ক হতে পারে, তবে সাদা চোখে এই হিসেব পড়ুয়াদের স্বার্থরক্ষা করবে বলেই মনে হয়। অন্য দিকটা হল কোনও সূত্র জটিল উপায়ে লেখার যে প্রচ্ছন্ন ভাবনা আমাদের মনে থাকে তার প্রভাব হয়ত পড়েছে এই বর্ণনায়। তবে অঙ্কটুকু কষে ফেলার পর এটা বোঝাই যাচ্ছে যে সব থেকে ভাল তিনটে পরীক্ষার গড় যতটা ক্ষমতাশালী, প্রায় তার কাছাকাছিই পৌঁছে যাবে ইস্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের দেওয়া নম্বর। আগে যে অনুপাত ছিল আশি বনাম কুড়ি, এখন তা দাঁড়ালো আনুমানিক পদ্ধতিতে ছাপ্পান্ন আর ইন্টারনাল অ্যাসেসমেন্টের চুয়াল্লিশ।

সাধারণ ভাবে ইস্কুল থেকে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ভাল নম্বর পাঠানো হয়। সেই হিসেবে পড়ুয়াদের ক্ষতি না হওয়ার সম্ভাবনাই প্রবল। তবে কোন ছাত্রছাত্রী যদি স্কুল কর্তৃপক্ষকে চটিয়ে রাখে তা হলে সামান্য বিপদের সম্ভাবনা আছে। এই জায়গায় ইস্কুলের প্রভাব বাদ দেওয়ার জন্যে একটা সহজ সমাধান করতেই পারতেন বোর্ডের নীতি নির্ধারকেরা। সে ক্ষেত্রে সূত্র খুব শক্ত হত না। ‘ফ’ যদি ‘প’ এর থেকে কম হয় তখনই একমাত্র স্কুলের কারণে ভুগছে সেই পড়ুয়া। সেই বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ‘ফ’ এর জায়গায় ‘প’ এর মান বসিয়ে দিলেই তারা সুরক্ষিত থাকত। অর্থাৎ এটা এড়াতেই পারে যে কোনও বোর্ড। পশ্চিমবঙ্গের মাধ্যমিক কিংবা উচ্চমাধ্যমিকের ক্ষেত্রেও স্কুলের পাঠানো নম্বরের একটা ভাগ থাকে। সে ক্ষেত্রে ইন্টারনাল অ্যাসেসমেন্টে কম পাওয়ায় যাতে পরীক্ষার্থীদের ভুগতে না হয় সে কথা মাথায় রাখতে পারেন রাজ্যের বিশেষজ্ঞরা। অর্থাৎ ইস্কুল থেকে যে সব সময় ভাল নম্বর আসবে এই ধরণের পূর্বনির্ধারিত ধারণা কোনও সূত্র বানানোর সময় পুরোপুরি মেনে না নেওয়াই ভাল। তবে ওই যে বলছিলাম, নতুন যে নিয়ম করা হবে তাতেও থেকে যাবে অনেক ছিদ্র। সুতরাং কোনও একটা জায়গায় পরিস্থিতির দিকে নজর রেখে মোটামুটি একটা যুক্তিযুক্ত সমাধান মেনে নেওয়াটাই বাস্তবতা। সেই নিরিখে সিবিএসই এবং আইসিএসই-র বানানো নিয়ম সাধারণ ভাবে পড়ুয়াদের মার্কশিটকে ঝকঝকেই বানাবে। তিন মাসের অনিশ্চয়তা এবং কোর্ট কাছারি পেরিয়ে একটা সমাধানে যে পৌঁছনো গিয়েছে সেটাই স্বস্তি। শুভেচ্ছা রইল সকল পরীক্ষার্থীর জন্যে। প্রকাশিত হোক সবার মনের মত ফলাফল।

(লেখক ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক, মতামত ব্যক্তিগত)

গ্রাফিক: শৌভিক দেবনাথ।

আরও পড়ুন

Advertisement