একটি ঘোষণা।
শান্ত করে দিতে পারে গোটা দেশকে। নরেন্দ্র মোদী কিংবা অমিত শাহ যদি বলে দেন: ‘‘জাতীয় নাগরিক পঞ্জি (এনআরসি) হচ্ছে না।’’
কিন্তু বলছেন কই? আজ বণিকসভার মঞ্চে ছিলেন মোদী। দেশজুড়ে বিক্ষোভ, প্রাণ হারানো নিয়ে দু’কথা বলতেও পারতেন। কিন্তু মুখেও আনলেন না। অথচ ‘ব্যবসার সহজ পরিবেশ’ নিয়ে বলতে গিয়ে হঠাৎই টেলিপ্রম্পটারের লিপির বাইরে চলে গেলেন। বলে ফেললেন ‘মনের কথা’ (ব্যবসার সঙ্গে যার কোনও লেনাদেনা নেই): ‘‘দেশহিতের জন্য অনেক মানুষের ক্ষোভের মুখে পড়তে হয়। অনেকের রাগ সহ্য করতে হয়। নানান অভিযোগের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়।’’ আরও বললেন, ‘‘দুনিয়া তিনিই চালাতে পারেন, দেশ তিনিই এগিয়ে নিয়ে যেতে পারেন, যাঁর ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা বেশি।’’
নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল সংসদে সমর্থন করেও নবীন পট্টনায়ক বলছেন, এনআরসি মানবেন না। নীতীশ কুমারও বলছেন, বিহারে হবে না এনআরসি। বিল পাশের পরেও দেশে এত অসন্তোষ, এত বিভ্রান্তি নিয়ে আলোচনার দাবি তুলে
অমিতকে চিঠি লিখছেন শরিক নেতা চিরাগ পাসোয়ান। তবু কেন বিভ্রান্তি
দূর করছেন না মোদী-শাহ? বরং সরকারের ‘সূত্র’ কখনও বলছে, নাগরিকত্বের প্রমাণে আধার কার্ড, ভোটার কার্ড চলবে। খোদ অমিতই আবার খণ্ডন করছেন, ‘‘চলবে না।’’ তা হলে কী চলবে? কেউ বলছেন না। কেন বলছেন না?
‘‘সেটাই তো রাজনীতি। প্রধানমন্ত্রী যাঁকে ‘ঝুঁকি’ বলেন’’— বললেন দিল্লির এক বিজেপি নেতা, ‘‘ফেব্রুয়ারিতে দিল্লিতে ভোট। কেউ আর প্রশ্ন তুলছেন, পেঁয়াজের দাম কত? অরবিন্দ কেজরীবাল সস্তায় বিদ্যুৎ দিলেন কি না? মহিলাদের ফ্রি-বাস সফর? ইন্টারনেটই বন্ধ, কেজরীবালের ফ্রি-ওয়াইফাই নিয়ে কে আলোচনা করবেন?’’ তা হলে ‘হিন্দু-মুসলিম’, ‘হিন্দু-মুসলিম’ জপ করে কি মেরুকরণেরই ভরপুর ফায়দা তুলতে চাইছে বিজেপি?
মোদী-শাহের ঘোরতর বিরোধীরাও স্বীকার করেন, কোনও বিষয়ে গভীরে গিয়ে খুঁটিনাটি আত্মস্থ করাই দুই নেতার স্বভাব। আর নাগরিকত্ব বিল আর এনআরসি নিয়ে প্রকাশ্যে আলোচনা তো বহু বছর ধরে করে আসছেন তাঁরা। ফলে ‘ইচ্ছা’ করেই যে বিভ্রান্তি অনেকটা জিইয়ে রাখা, মানছেন বিজেপিরই অনেকে। কিন্তু পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে না? ‘‘এখনও নয়,’’ যুক্তি দিলেন এক নেতা। তাঁর মতে, আন্দোলনে শরিক তিন শিবির। মুসলিম,
বামপন্থী ছাত্রেরা আর বিরোধী রাজনৈতিক দল। মুসলিমরা যত পথে নামবে, বিজেপির হিন্দুত্বে লাভ। বিরোধীরা এককাট্টা নয়। কিন্তু যত বিরোধ করবে, তত বিজেপি তাদের ‘মুসলিম-দরদি’ দল বলে প্রচার করবে। সমস্যা শুধু ছাত্রদের স্বতস্ফূর্ততায়। সে কারণে সনিয়া গাঁধী-প্রিয়ঙ্কা গাঁধী বঢরারা ছাত্র-আন্দোলনের পাশে দাঁড়াচ্ছেন।
গত কাল দশ জনপথে বৈঠকের পর কংগ্রেসের এক নেতা বলেন, ‘‘মেরুকরণের ফাঁদ পাতছে বিজেপি। পা দিলেই বিপদ। আবার উপেক্ষা করারও জো নেই। প্রিয়ঙ্কা ছাত্রদের জমায়েতে সামিল হয়েছেন ইন্ডিয়া গেটে। রবিবার থেকে রাজ্যে রাজ্যে মিছিল বেরোবে।’’ সনিয়াও আজ এক ভিডিয়ো বার্তায় বলেছেন, ‘‘ছাত্রদের পাশে আছে কংগ্রেস। নাগরিকত্ব আইন বৈষম্য আনবে। প্রস্তাবিত এনআরসি গরিবদের আঘাত করবে। নোটবন্দির সময়ের মতোই লাইন দিয়ে পূর্বপুরুষদের নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে হবে। মানুষের আশঙ্কা বাস্তব ও যুক্তিসঙ্গত। কংগ্রেস সংবিধানের ভিত রক্ষা করবে।’’
কংগ্রেস নেতারা স্মরণ করাচ্ছেন, রাহুল গাঁধীর চাপে জমি অধিগ্রহণ আইন নিয়ে ঢোক গিলতে হয়েছিল মোদীকে। সম্প্রতি মহারাষ্ট্রে মাঝরাতের সরকার গড়েও পিছিয়ে আসতে হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর কুর্সি দখল করেও ছাড়তে হয়েছে। এখন যে ‘জুয়া’ খেলছেন মোদী-শাহ, চালাতে পারবেন তো? বিরোধী শিবিরেরও নজর এড়ায়নি, গোড়া থেকেই অমিতের থেকে একটু দূরত্ব রাখছেন মোদী। এ বিল পাশের সময় ভোটও দেননি প্রধানমন্ত্রী। দুনিয়ার সামনে বোঝানো হচ্ছে, এটি অমিত শাহের আইন। ফলে ‘দোষ’ শাহের। এনআরসি নিয়ে পিছিয়ে আসার বার্তা তো এখন থেকেই দেওয়া শুরু হয়েছে। আর যদি একেবারেই বাতিল করতে হয়? তখন নীতীশ-নবীনদের বিরোধিতা!
রবিবার দিল্লির রামলীলায় জনসভা মোদীর। আবারও ‘সূত্র’ জানাচ্ছে, হামলা হতে পারে মোদীর উপর। কে? কারা? পাকিস্তানের জঙ্গিরা।