২০০৪-এ সনিয়া গাঁধীর আয়োজিত ইফতার। সবেমাত্র লোকসভা ভোটের ফল প্রকাশ হয়েছে। কংগ্রেসের নেতৃত্বেই যে কেন্দ্রে সরকার গঠন হতে চলেছে, তা স্পষ্ট। সিপিএমের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক, প্রয়াত হরকিষেণ সিংহ সুরজিৎ নিজে ইফতারে গিয়েছিলেন। অমর সিংহের নিমন্ত্রণ না থাকা সত্ত্বেও তাঁকে সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিলেন।
আজ দিল্লির অশোক হোটেলে সেই সনিয়া গাঁধীর ইফতার। নীতীশ কুমার, শরদ পওয়ার ছাড়া আসেননি বিরোধী দলগুলির উল্লেখযোগ্য শীর্ষস্থানীয় কোনও নেতা। একেবারে অনুপস্থিত ছিলেন সিপিএম নেতৃত্ব। সনিয়া সিপিএমের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরিকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। ভাবা হয়েছিল, দলের পলিটব্যুরো সদস্য মহম্মদ সেলিম সনিয়ার ইফতারে যাবেন। সেলিম আজ দিল্লিতে ছিলেন। কিন্তু সোমবার সন্ধ্যায় ইফতার যখন চলছে, তখনই তিনি দিল্লি বিমানবন্দরের উদ্দেশে রওনা হন।
কেন সনিয়ার ইফতারে সিপিএমের কেউ গেলেন না? বিমান ছাড়ার আগে মহম্মদ সেলিম আনন্দবাজারকে বলেন, ‘‘সামাজিক অনুষ্ঠানের সঙ্গে রাজনীতি মিশিয়ে ফেলা হলে সেটা আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।’’ সিপিএম সূত্রের খবর, সীতারাম এখন লন্ডনে। তবে সনিয়ার ইফতারে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত আজই নেওয়া হয়েছে।
সিপিএমের সূত্রের ব্যাখ্যা, সনিয়ার ইফতার পার্টিকে কার্যত বাদল অধিবেশনের আগে ধর্মনিরপেক্ষ বিরোধী দলের রণকৌশল তৈরির মঞ্চ হিসেবে তুলে ধরেছিলেন কংগ্রেস নেতারা। এর মধ্য দিয়ে সনিয়া-রাহুলের শক্তি প্রদর্শনে উৎসাহী ছিলেন তাঁরা। কংগ্রেসের এই পরিকল্পনাতেই মদত দিতে চাননি সিপিএম নেতারা।
আজ সনিয়ার ইফতারে মূলত ইউপিএ শরিকদের ডাকা হয়েছিল। বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমার, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও নিমন্ত্রিত ছিলেন। নীতীশ এলেও মমতা সনিয়ার ইফতারে যোগ দিতে দিল্লি আসেননি। তিনি তৃণমূলের রাজ্যসভার নেতা ডেরেক ও’ব্রায়েনকে পাঠিয়েছিলেন। তাতেও সমস্যা বাড়ে সিপিএমের। কংগ্রেস সভানেত্রীর ইফতারের অনুষ্ঠানে সিপিএম ও তৃণমূল একই সঙ্গে হাজির—সংবাদমাধ্যমে এমন কোনও ‘হেডলাইন’ হোক, এমনটাও চাননি সিপিএম নেতারা। সে ক্ষেত্রে দলের মধ্যে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হতো।
সিপিএমের কেন্দ্রীয় সম্পাদকমণ্ডলীর এক নেতা বলেন, ‘‘পার্টি কংগ্রেসে ঠিক হয়েছে, কংগ্রেসের সঙ্গে কোনও সমঝোতা নয়। তার পরেও পশ্চিমবঙ্গে গৌতম দেবের মন্তব্যে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। নতুন সাধারণ সম্পাদক ইয়েচুরিকে সেই বিতর্ক ধামাচাপা দিয়ে স্পষ্ট করে বলতে হয়েছে, সংসদে কোনও বিষয়ে একসঙ্গে বিরোধিতা হলেও কংগ্রেসের সঙ্গে কোনও রাজনৈতিক সমঝোতা হবে না। এ বার ইয়েচুরি বা পলিটব্যুরোর কেউ সনিয়ার ইফতারে গেলে ফের প্রশ্ন উঠত। বিশেষ করে যেখানে আবার তৃণমূল উপস্থিত!’’ ঘটনা হল, কিছু দিন আগেই সংসদে বিজেপির বিরোধিতা করতে গিয়ে তৃণমূলের সঙ্গে সিপিএমের সংসদীয় নেতারা একসঙ্গে বিক্ষোভ দেখাতে রাজি হয়ে গিয়েছিলেন। শেষ মুহূর্তে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হয়। আজ ইফতারে সনিয়ার পাশে ডেরেক ও সেলিমকে একসঙ্গে দেখা গেলে ফের সেই অস্বস্তিকর মুহূর্ত তৈরি হতো।
সিপিএম যেমন নিজের রাজনৈতিক কারণে অনুপস্থিত থেকেছে, তেমনই তৃণমূল কংগ্রেসও নিজের উদ্দেশ্যেই ইফতারে হাজির হয়েছে। তৃণমূল নেতৃত্ব ইফতারে হাজির হয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন, কংগ্রেসের জন্যও দরজা খুলে রাখছেন তাঁরা। পাশাপাশি, বিজেপিকেও বোঝানো হয়েছে, তৃণমূল রাজনৈতিক ভাবে ব্রাত্য নয়। তৃণমূলের এক জন শীর্ষস্থানীয় নেতার মতে, সনিয়ার সঙ্গে ব্যক্তিগত রসায়নকেই গুরুত্ব দিয়েছেন মমতা। আজ সনিয়াও জানতে চান মমতা কেমন আছেন।
ইফতারে একপাশে ডেরেক, অন্য পাশে নীতীশকে নিয়ে বসেছিলেন সনিয়া। রাজনীতির পাশাপাশি এ দিন কিছু ব্যক্তিগত কথাবার্তাও হয়। রাজীব গাঁধী যে তাঁর হাতে তৈরি ফিরনি খেতে ভালবাসতেন, সেই গল্পও শুনিয়েছেন সনিয়া। রাহুল বসেছিলেন আরেকটি টেবিলে ওমর আবদুল্লা ও কানিমোঝিকে সঙ্গে নিয়ে। সনিয়ার ইফতারে হাজির হননি লালুপ্রসাদ। আরজেডির যুক্তি, লালুর পটনার বাড়িতেই আজ ইফতার রয়েছে। তাই তিনি প্রতিনিধি পাঠিয়েছেন। আবার লালুপ্রসাদের ইফতারে না গিয়ে নীতীশ কেন সনিয়ার ইফতারে এলেন, তা নিয়েও জল্পনা চলছে। নীতীশ এসেছেন ঠিকই, তবে কংগ্রেস সভানেত্রীর ইফতারের রাজনৈতিক জৌলুস যে অনেকটাই ফিকে হয়ে গিয়েছে, সন্দেহ নেই। অনেকেই মনে করছেন, নরেন্দ্র মোদীর দাপট কিছুটা কমলেও লোকসভা নির্বাচনের চার বছর বাকি। সেই হিসেবে সনিয়ার রাজনৈতিক গুরুত্ব আগের মতো নয়। ইফতারে তার প্রতিফলন দেখা গিয়েছে।