উত্তর কাশ্মীরের বান্দিপোরা জেলার ছোট্ট গ্রামটা পরিচিতি পেয়েছিল এক টুকরো ‘বাংলাদেশ’ নামে। শ্রীনগর থেকে প্রায় ৯০ কিলোমিটার দূরে উলার হ্রদের তীরে গ্রামটার আসল নাম জ়ুরিমানজ। কিন্তু লোকমুখে তার ডাকনাম ছিল ‘বাংলাদেশ’। মনোরম গ্রামটি কিছু দিন আগেও পর্যটকদের ভিড়ে গমগম করত। হ্রদের ধার ঘেঁষা সরু রাস্তায় সারি সারি গাড়ি, শিকারা চড়ার জন্য পর্যটকদের অধীর আগ্রহ। এ সবই ছিল চেনা ছবি। আজ সেই রাস্তার বেশির ভাগই উলারের ফুলে ফেঁপে ওঠা জলের নীচে ডুবে আছে। কাশ্মীরের নিজস্ব ‘বাংলাদেশ’কে বাঁচিয়ে রাখা এখন এক বড় চ্যালেঞ্জ।
গ্রামের নাম ‘বাংলাদেশ’ হল কী করে? স্থানীয় ভাবে জানা যায়, ১৯৭১-এর সেই মুক্তিযুদ্ধের সময়ে এই এলাকায় একটা বড় অগ্নিকাণ্ড ঘটেছিল। যুদ্ধের কারণে নয়, দুর্ঘটনাবশতই। আদি জ়ুরিমানজ গ্রামটা পুড়ে একেবারে ছাই হয়ে যায়। গ্রামবাসীরা তখন গ্রামের বাইরে হ্রদের ধারে এই খোলা জায়গায় নতুন করে বসতি স্থাপন করেন, নতুন করে গড়ে তোলেন গ্রামকে। এক দিকে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম, আর এক দিকে একটি গ্রামের পুনর্গঠন— মুহূর্তটাকে স্মরণীয় করে রাখতে নতুন গ্রামের নাম হয়ে যায় ‘বাংলাদেশ’। সেই ‘বাংলাদেশ’-ই এখন বিপন্নতার মুখে।
অনেক দিন অবধি গ্রামটা নজরের আড়ালে ছিল। কিন্তু বছর তিনেক আগে সমাজমাধ্যমে ছবি, ভিডিয়ো ভাইরাল হতেই বাড়তে থাকে বহু চিত্রগ্রাহক, ভ্লগার, কন্টেন্ট নির্মাতাদের আনাগোনা। এই পরিস্থিতিতে পর্যটন বিভাগ এবং উলার কনভার্সেশন ম্যানেজমেন্ট অথরিটি (ডব্লিউইউসিএমএ) হ্রদের ধারের কিছু অংশের সংস্কার করে, সেই সঙ্গে কয়েকটি ভিউ পয়েন্টও স্থাপন করা হয়। বাসিন্দারা জানান, এই পরিবর্তন তাৎক্ষণিক। নৌকাচালনার সঙ্গে যুক্ত মুশতাক আহমেদ লোন বলেন, “আগে লোকজন শুধু গ্রামের পাশ দিয়ে চলে যেত। তার পর হঠাৎ করে পর্যটকরা বাংলাদেশ গ্রামেই আসতে শুরু করে।’’ পর্যটনের এই জোয়ার পাহাড়ি জীবনযাত্রাতেও বড় পরিবর্তন আনে। গ্রামেরই বাসিন্দা দুই ভাই উলার হ্রদে প্রথম শিকারা ভ্রমণের প্রচলন করেন। তাঁরা পর্যটকদের হ্রদের শান্ত অংশ দিয়ে নিয়ে যেতেন। গ্রামবাসীদের বিনিয়োগের ফলে কয়েক মাসের মধ্যেই শিকারার সংখ্যা ২৫-এ দাঁড়ায়।
কিন্তু উলার হ্রদের যে জলরাশি পর্যটকদের আকর্ষণ করত, সেই জলই এখন গ্রামটিকে প্রায় বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে। বরফগলা জল ও বৃষ্টিপাতের ফলে উলার হ্রদের প্রবাহ বাড়লে তা বান্দিপোরা-সোপোর জাতীয় সড়কে ছড়িয়ে পড়ছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানাচ্ছেন, জলস্তর বৃদ্ধির ফলে যাতায়াতের পথ কার্যত বন্ধ। হাঁটু সমান জলের মধ্যে দিয়েই যাতায়াত করতে হচ্ছে। ভ্লগাররা নিয়মিত আসা বন্ধ করে দিয়েছেন। ছোট ছোট খাবার, চায়ের দোকানগুলিও সূর্যাস্তের আগেই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। মাত্র ৮-৯টি শিকারা চালু রয়েছে। তবে বান্দিপোরার এগ্জ়িকিউটিভ ইঞ্জিনিয়র শাহিদ সালিম জানিয়েছেন, ঝুঁকিপূর্ণ রাস্তাটিকে শক্তিশালী করার জন্য ইতিমধ্যে দরপত্র প্রকাশ করা হয়েছে। তাঁর কথায়, ‘এই প্রকল্পের জন্য ২.৫ কোটি টাকারও বেশি খরচ হতে পারে’।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)