শুধু ফোটো তোলানোর জন্য এসেছেন? প্রশ্নটা শুনেই মেজাজ হারালেন রাহুল গাঁধী।
তত ক্ষণে হরিয়ানার ফরিদাবাদের শোনপেড় গ্রামে দুই দলিত শিশু খুনে প্রধানমন্ত্রীকে দুষেছেন তিনি। অন্য দিকে জাতীয় সংখ্যালঘু কমিশনের রিপোর্টে বলা হয়েছে, দাদরির ঘটনা নিছক দুর্ঘটনা নয়। পরিকল্পিত ভাবেই হামলা হয়েছে সংখ্যালঘুর উপর।
দাদরি থেকে মুম্বই, কাশ্মীর থেকে পঞ্জাব— গোটা দেশ জুড়ে একের পর এক অসহিষ্ণুতার ঘটনার আঁচ এখন আছড়ে পড়ছে সরকারের উপরে।
আর তার ফসল ঘরে তুলতে এখন রাহুল গাঁধীও আসরে নেমে পড়েছেন। কাল রাতে তাঁকে দেখা গিয়েছিল রামলীলা ময়দানে আলু চাট, পাও ভাজি খেতে। আর আজ সকালেই দিল্লির উপকণ্ঠে ফরিদাবাদে ছুটে যান তিনি। যেখানে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে একটি দলিত পরিবারের ঘর। তাতে মারা গিয়েছে দুই শিশু। সেই দুই শিশুর দেহ এখনও দাহ করতে দেননি গ্রামবাসীরা। দাবি, দোষীদের ‘ফাঁসি না-হওয়া পর্যন্ত’ এই প্রতিবাদ চলবে। সন্ধ্যা গড়াতে গড়াতে পরিবারের লোক জন দাবি করেছেন— স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়ার ফলেই এই ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু রাজনীতি তাতে থামছে না। হরিয়ানা সরকার অবশ্য আজ সিবিআই তদন্তের সুপারিশ করেছে। পরিবারটির এক জনকে চাকরি দেওয়ার ঘোষণা করেছেন কেন্দ্রীয় সমাজকল্যাণ মন্ত্রী। শেষ মুহূর্তে ফরিদাবাদ সফর বাতিল করেছেন মুখ্যমন্ত্রী মনোহরলাল খাট্টার। দোষীদের শাস্তি চেয়ে বুধবার সকালে দিল্লি-আগ্রা সড়কের একটি বাইপাস অবরোধ করেছিল জনতা। পুলিশ লাঠি চালিয়ে রাস্তা অবরোধমুক্ত করে।
সকালে ঘটনাস্থলে গিয়ে রাহুল বলেন, ‘‘গরিব হলেই তাঁর উপর অত্যাচার কর— এটাই চান প্রধানমন্ত্রী মোদী। হরিয়ানার মুখ্যমন্ত্রীও চান। বিজেপি ও আরএসএস-এরও এমনই পরিকল্পনা। গরিবদের এরা কিছুতেই বাঁচতে দেবে না!’’ কিন্তু বিজেপি বলছে— এটি জাতিগত হিংসা না অপরাধের ঘটনা, তা এখনও স্পষ্ট নয়। শুধুমাত্র ফোটো তোলানোর জন্য রাহুল গাঁধীরা ভিড় করছেন ওখানে।
এই প্রশ্নটিই রাহুল গাঁধীকে করা হয়েছিল। আর তাতেই মেজাজ হারালেন তিনি। বলেন, ‘‘এটা অপমানজনক। শুধু আমার নয়, গরিব মানুষের অপমান! রোজ সাধারণ মানুষ মারা যাচ্ছেন। তাঁদের কাছে আমি বার বার আসব। এর সঙ্গে ফোটো তোলার কী সম্পর্ক আছে?’’
কিন্তু বিজেপি নেতৃত্ব মানছেন, একের পর এক অসহিষ্ণুতার ঘটনা জনমানসে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি করছে। দলের এক শীর্ষ নেতার কথায়, ‘‘মোদী সরকার ক্ষমতায় আসার পর যে পাহাড় প্রমাণ প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, সেগুলি বাস্তবায়িত করতে এখনও অনেক সময় লাগবে। তাতে তো মানুষ একটু আশাহত রয়েছেই। তার উপর আধুনিকমনস্ক ভোটাররা প্রত্যাশা করেননি যে এ ভাবে দেশজুড়ে অসহিষ্ণুতার বার্তা পৌঁছে যাবে। যেখানেই এ ধরনের ঘটনা ঘটছে, সরাসরি মোদী সরকারকে দায়ী করে প্রচার চালানো হচ্ছে।’’ তাঁর মতে বিহার নির্বাচনের মধ্যে এই বার্তা তীব্রতর হলে বিজেপির পক্ষে সেটি সুখকর না-ও হতে পারে। তাই গত কাল অরুণ জেটলিকেও এই ঘটনার নিন্দা করতে হয়েছে।
বিজেপি যে দাবিই করুক, বিরোধীদের হাত শক্ত করে আজ দাদরি কাণ্ডের রিপোর্ট প্রকাশ করেছে জাতীয় সংখ্যালঘু কমিশন। ছ’পাতার এই রিপোর্টটি কমিশন নিজেদের ওয়েবসাইটেও প্রকাশ করেছে। সেখানে স্পষ্ট ভাষায় কমিশন বলেছে, যে ভাবে মোদী সরকারের মন্ত্রী মহেশ শর্মা বিষয়টিকে নিছক ‘দুর্ঘটনা’ বলে দাবি করেছিলেন, বাস্তবে ঘটনাটি তা নয়। কমিশন জেলা প্রশাসন, পুলিশ ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ও তার আশপাশের লোক জনদের সঙ্গে সবিস্তার কথা বলেছেন। তার ভিত্তিতে কমিশনের বক্তব্য, এটি নিছক দুর্ঘটনা নয়, সুপরিকল্পিত ভাবেই হত্যা করা হয়েছে। মন্দিরের লাউড স্পিকারে ঘোষণা করে আক্রমণ করা হয়েছে। ঘটনা ঘটার পর পুলিশ কিছুটা সক্রিয় হলেও তদন্তে ঢিলেমি করা হচ্ছে। সব রাজনৈতিক দল ও তাদের কর্মীদেরও দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্য থেকে বিরত থাকার সুপারিশ করেছে কমিশন।