কংগ্রেসে আশঙ্কাটা ছিল একেবারে উল্টো। আগেভাগে প্রার্থী ঘোষণা করে দিলে পাছে বিক্ষুব্ধ রাজনীতি মাথাচাড়া দেয়! কে বলতে পারে, কংগ্রেসের টিকিট না পেয়ে বিক্ষুব্ধরা গিয়ে নাম লেখাতে পারেন বিরোধীদের খাতায়! কিন্তু তাতেও ঠেকানো গেল কি? লোকসভা ভোটের জন্য গত কাল কংগ্রেসের প্রথম তালিকা প্রকাশ করে ১৯৪ জন প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছিল দলীয় হাইকম্যান্ড। রাত পোহাতেই দেখা গেল, ভোটে লড়ার টিকিট পেয়েও আজ কংগ্রেস ছাড়লেন মধ্যপ্রদেশের ভিন্ডের প্রার্থী ভাগীরথ প্রসাদ। শুধু তা-ই নয়, বিজেপি-তে যোগ দিয়ে নরেন্দ্র মোদীর প্রশংসায় পঞ্চমুখ হলেন তিনি।
এর থেকে অস্বস্তি আর কী হতে পারে রাহুল গাঁধীর! গত কয়েক দিন ধরেই কংগ্রেস পরিবারে এ ধরনের অস্বস্তিকর পরিস্থিতি লাগাতার চলছে। সম্প্রতিই কংগ্রেস ছেড়ে বিজেপি-তে যোগ দিয়েছেন অন্ধ্রপ্রদেশের কংগ্রেস সাংসদ ও কেন্দ্রীয় মন্ত্রী দুগ্গাবতী পুরন্দেশ্বরী। প্রয়াত তেলুগু অভিনেতা ও প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী এন টি রামরাওয়ের এই কন্যার পরেই কংগ্রেস ছাড়ার কথা ঘোষণা করেন উত্তরপ্রদেশের কংগ্রেস সাংসদ জগদম্বিকা পাল। এ বার উইকেট পড়ল মধ্যপ্রদেশে।
যদিও এ নিয়ে অস্বস্তির মধ্যেও কংগ্রেস আজ সাহসী মুখই দেখানোর চেষ্টা করেছে। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী তথা রাহুল-ঘনিষ্ঠ কংগ্রেস নেতা জয়রাম রমেশ আজ বলেন, “একে সুবিধাবাদী রাজনীতি ছাড়া আর কিছুই বলা যায় না। তবে এক দিক থেকে ভালো যে, দলের বেনোজল বেরিয়ে যাচ্ছে।” অন্য দিকে কংগ্রেস সাধারণ সম্পাদক দিগ্বিজয় সিংহ বলেন, “ভাগীরথ যা করেছেন, তা সর্বোচ্চ স্তরের বিশ্বাসঘাতকতা। এই সব লোকেরা কোনও দলেরই হতে পারেন না।” বিজেপি প্রত্যাশিত ভাবেই কংগ্রেসের নেতানেত্রীদের মোদীর ছত্রছায়ায় চলে আসাকে নিজেদের জয়ের ইঙ্গিত বলেই ব্যাখ্যা করছে। এ নিয়ে দলের এক নেতার কটাক্ষ, “ডুবন্ত নৌকোয় কেউই থাকে না। কংগ্রেসের এখন সেই দশা।”
রাহুল কিন্তু চাইছিলেন লোকসভা ভোটের দিনখন ঘোষণার আগেই এ বার কংগ্রেসের প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত করে ফেলতে। যথারীতি সাবেক দলের সংস্কৃতি তা হতে দেয়নি। দ্বিতীয়ত, ভোট ঘোষণার আগে কিছু প্রার্থীর নাম চূড়ান্ত হয়ে গেলেও তা ঘোষণা করতে রাহুলকে নিষেধ করেন দলের শীর্ষ নেতারাই। তাঁদের পরামর্শ ছিল, এখন দল বদলের মরসুম চলছে। আগেভাগে প্রার্থী ঘোষণা করলে বিক্ষুব্ধরা বিরোধী দলে যোগ দিতে পারে। তাই প্রার্থী-তালিকা ঘোষণা করার ক্ষেত্রে কংগ্রেস কিছুটা দেরিই করে। বিজেপি দু’টি প্রার্থী-তালিকা ঘোষণার পর কংগ্রেস প্রথম তালিকাটি প্রকাশ করে কাল।
যাঁদের নিয়ে যাত্রা সব চেয়ে মসৃণ হবে বলে মনে করেছেন কংগ্রেস শীর্ষ নেতৃত্ব, মূলত তাঁদেরই রাখা হয়েছে এই তালিকায়। দলের বর্তমান সাংসদ ও কেন্দ্রীয় মন্ত্রীদের নামই বেশি রয়েছে তাতে। আর রয়েছে এমন কিছু কেন্দ্রের প্রার্থীর নাম, যেগুলি কংগ্রেসের দখলে ছিল না। এ সব আসনে আনা হয়েছে কিছু নতুন মুখকে। যেখানে একাধিক টিকিট-প্রত্যাশী রয়েছেন বা বিরোধের আশঙ্কা রয়েছে, এমন কেন্দ্রগুলিকে প্রথম তালিকায় রাখাই হয়নি। পুণে এবং চণ্ডীগড়ের মতো বিতর্কিত আসনেও এখনও প্রার্থী ঘোষণা করেনি কংগ্রেস। এত ভেবেচিন্তে প্রথম তালিকা প্রকাশের পরেও ভিন্ডের প্রার্থী মোদীতে মজায় চিন্তায় পড়েছেন দলের কেন্দ্রীয় নেতারা।
কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির এক সদস্যের মতে, এটা দলের রাজ্য নেতৃত্বের দুর্বলতা। বিধানসভা ভোটের সময়েও ঠিক একই কাণ্ড ঘটেছিল মধ্যপ্রদেশে। সেই অভিজ্ঞতা থেকে এ বার রাজ্য নেতাদের আগে থেকে সজাগ থাকা উচিত ছিল। তাঁর কথায়, “হতে পারে বিজেপি ষড়যন্ত্র করেই এই কাণ্ড ঘটাচ্ছে। যাতে কংগ্রেসকে জাতীয় স্তরে আরও খাটো করা যায়।”
কিন্তু মূল প্রশ্ন হল, এর পর কংগ্রেসের প্রার্থী-তালিকা প্রকাশ কি ক্রমেই পিছোতে থাকবে? জবাবে কংগ্রেসের ওই নেতা আজ জানান, আগামী বুধবার ফের কংগ্রেস কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠক বসবে। পরবর্তী তালিকা কবে ঘোষণা করা হবে বা তার কৌশল কী হবে, তা সে দিনই আলোচনা করে স্থির হবে।