স্কুল-কলেজের পড়ুয়াদের মনে কী ধরনের প্রশ্ন ঘুরে বেড়ায়— শুধুই ফাস্ট ফুড, মোবাইল ফোন, সিনেমা নিয়ে জিজ্ঞাস্য? সমাজ, দেশ, মানবিকতা কি নেই তাদের ভাবনায়?
বিপরীত ছবিটাই কিন্তু দেখা গেল দু’দিনের যুবা শিবিরে। পড়ুয়াদের অনেকেই যে দুর্নীতি, অনিয়ম, হিংসা নিয়ে বিব্রত তা স্পষ্ট হল।
শিলচর রামকৃষ্ণ মিশন সেবাশ্রম গত শুক্র ও শনিবার এই শিবিরের আয়োজন করে। কাছাড়ের ৪৭টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে আটশো ছাত্রছাত্রী তাতে অংশ নেয়। প্রথম দিনে অষ্টম থেকে দশম শ্রেণি। গত কাল একাদশ, দ্বাদশ ও স্নাতক স্তরের ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে আলোচনা চলে। বৈদিক মন্ত্রোচ্চারণ ও ধ্যানের মাধ্যমে দু’দিনই শিবিরের উদ্বোধন হয়। বক্তৃতা করেন বিবেকানন্দ ইনস্টিটিউট অব হিউম্যান এক্সেলেন্স-এর অধিকর্তা স্বামী বোধাময়ানন্দ মহারাজ, কলকাতা বরানগর রামকৃষ্ণ মিশনের সচিব স্বামী ঋতানন্দ মহারাজ ও শিলচর রামকৃষ্ণ মিশন সেবাশ্রমের সচিব স্বামী সত্যস্থানন্দ মহারাজ। এরপরই প্রশ্নোত্তর পর্ব। সবার কাছ থেকে একসঙ্গে লিখিত প্রশ্ন সংগ্রহ করা হয়। স্কুলপড়ুয়াদের অনেকের আশঙ্কা, পড়ায় ঠিকমতো মনোযোগ দেওয়া যাচ্ছে না। তাই মন নিয়েই তারা বেশি প্রশ্ন করে। জানতে চায়, কী করে পড়ায় মনোযোগ বাড়ানো যায়? কেন পড়ায় মন বসাতে পারি না? মনকে কী করে স্থির করব? সমাজসেবার ভাবনাও ওই বয়সেই অনেকের মধ্যে কাজ করছে। এক ছাত্রের জিজ্ঞাসা, তারা এই সময়ে রোজগার করে না। নিজেরা কোনও ধরনের সিদ্ধান্ত নিতেও অক্ষম। তাহলে কী ভাবে সমাজসেবায় অংশ নিতে পারবে? মোবাইল ফোন কি খারাপ, সে কথাও জানতে চায় এক কিশোর। উচ্চমাধ্যমিক, বা স্নাতক পর্বের ছাত্রদের মনেও এই ধরনের অনেক প্রশ্ন। তাঁরা জানতে চান, মনের নেতিবাচক ভাবনাগুলিকে কী করে ইতিবাচকে পরিবর্তন করা যায়? চঞ্চল মনকে কি শান্ত করা যায় না? সমাজে এখন যে হিংসা-হানাহানি বেড়ে চলেছে, তা নিয়েও উদ্বেগে তাঁরা। জিজ্ঞাসা করে, চার দিকে এত হিংসা কেন? ঈশ্বর কি আছেন, স্বামী বিবেকানন্দের সেই প্রশ্ন আজকের কিশোর-যুবাদেরও ভাবিয়ে তোলে। তারা ভাবে, রাজসিক গুণের লোকেরা সন্ন্যাস নিয়ে নেন আর তামসিক গুণের সবাই শাসনব্যবস্থায় ঢুকে পড়েন, সে জন্যই আজকের সমাজে এত সঙ্কট।
বোধাময়ানন্দ মহারাজ, ঋতানন্দ মহারাজ ও শিলচর মিশনের স্বামী বৈকুণ্ঠানন্দ মহারাজ উত্তরে জানান— ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে শেখার ইচ্ছা তৈরি করতে হবে। না হলে পড়াশোনা করে লাভ হবে না। মা-বাবা সারাক্ষণ পড়ার টেবিলে বসিয়ে রাখলেও কাজে আসবে না। সে জন্য কত সময়ের মধ্যে কতটা কী করবে, তা স্থির করে পড়তে বসবে। সে সময় মন থেকে অন্য সব বিষয়কে সরিয়ে রাখতে হবে। মন তার বৈশিষ্ট্য অনুসারেই চঞ্চল। একে দমিয়ে রাখাটাই আমাদের কাজ। সে জন্য বারবার অনুশীলন প্রয়োজন বলে পরামর্শ মহারাজদের। তাঁরা ছাত্রছাত্রীদের মূল্যবোধ ও ব্যক্তিত্ব বিকাশের উপরও গুরুত্ব দেন। সকলেই বলেন, ‘‘ক্রোধ থেকেই সমাজে হিংসা বাড়ছে। তাই যখনই কোনও বিষয়ে ক্রোধের সঞ্চার হয়, সে সময় প্রার্থনা করতে হবে।’’ অভিভাবকদেরও চলনে-বলনে সংযমের প্রয়োজন রয়েছে বলে মন্তব্য করেন স্বামী বোধাময়ানন্দ মহারাজ। তাঁর পরামর্শ, ‘‘অন্যের নিন্দা-মন্দ না করে সদর্থক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করতে হবে।’’ দু’দিনের শিবিরে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে আলোচনায় অংশ নেয় মনোয়ার হোসেন লস্কর, জ্ঞানেন্দ্র দাস, মনীষা গোয়ালা, ফাহিল আহমেদ, প্রজ্ঞা অন্বেষা, নওয়াজ খান।