গন্ধের নেশা? নাকি জীবনকে ফুরিয়ে ফেলার আনন্দ? কোন টানে মরেছিল অনামিকা সাহা? অনামিকার কথায় মনে ভিড় জমাল শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের পদ্য। লিখছেন স্রবন্তী বন্দ্যোপাধ্যায়

চন্দনের ধূপ আমি কবে পুড়িয়েছি মনে নেই। মন আর স্মৃতিগুলি ধরে না আদরে। আমি একা, বড়ো একা, চন্দনের গন্ধে উতরোল।

‘নেশার টানে ভালবাসা, শরীর, সংসার, মন সব খুইয়েছি আমি। আলো ছিল, আলো আছে আমার জীবনে, তবু যেন সেই আলোতে ভরে আছে অন্ধকার।’ কান্না চাপা চোখ নিয়ে আমার ব্যস্ত শহরের মাঝসন্ধ্যায়, তার রক্তস্মৃতির চাবির গোছা আমার মনে ধরিয়ে দিল অনামিকা সাহা ওরফে অ্যালকহলিক অ্যানোনিমাসের সক্রিয় কর্মী।

‘ভাবুন তো এক বার! ছেলের বিয়ের দিন তার মাকে যদি ছাদের চিলেকোঠায় মদের বোতল হাতে পড়ে থাকতে দেখা যায়? কেমন সিনেমার মতো মনে হচ্ছে না?’ কেঁপে উঠল অনামিকার কারুকার্যের উজ্জ্বল মুখ। অসম্ভব সুন্দরী সে, সম্ভ্রান্ত বনেদি বাড়ির বিলাসিতা তার শরীরের ছত্রে ছত্রে। প্রতিষ্ঠিত ছেলে, রুচিশীল স্বামী, কিন্তু কী হয়েছিল তাঁর? হঠাৎ সৌন্দর্যের জ্বর এল কেমন করে? আজও তো দেখছি মাধুর্যের মন খারাপ!

‘মদ খাওয়ার চল আমার বাবার বাড়ি বা শ্বশুরবাড়ি— কোথাওই ছিল না। তবে বন্ধুবান্ধব রাত আড্ডায় যে মদের ধূম ছিল না এমনটা নয়। আমি আর আমার স্বামী বরাবরই অরেঞ্জ জুসে মন ভেজাতাম। সহজ কঠিন ছন্দে জীবন চলে যাচ্ছিল। কিন্তু এক দিন আমারই বান্ধবী প্রায় জোর করেই রঙিন পানীয়ে আমার ঠোঁট ভিজিয়েছিল। খুব অস্বস্তি ছিল সে দিন, কিন্তু নিজের মন ছুঁয়ে বুঝতে পারলাম কেবল অস্বস্তিই নয় এক ধরনের আলতো, আলগা তৃপ্তির স্বাদ আমার শরীর ভরিয়ে দিচ্ছিল। তারপর থেকেই আমার সেই অচেনা তৃপ্তির ছোঁয়া নিজের শরীরে ঢেলে দিতে মন ছটফট করত। নিজের সঙ্গে অনেক লড়াই করে এক দিন আমাদের বন্ধুদের জন্য তৈরি করা বাড়ির বার কাউন্টার থেকে তরল সুরার স্বাদ নিতে শুরু করলাম আমি।

সেখান থেকেই শুরু। এই শুরুতে কেবল মনে হত, নিজের সঙ্গে নিজেকে মিলিয়ে দেখার এই আনন্দ আর কোথাও কি পেতাম? কিশোর বয়সের প্রেমিকের স্পর্শের চেয়েও এই তরল বিলাস আমার দিনরাত্রির অপ্রাপ্তিকে কানায় কানায় ভরিয়ে দিল। বাড়িতে, বাড়ির বাইরে বেড়ে উঠল বন্ধু, আড্ডা, পুরুষ সঙ্গও। কোথাও নেশার ছন্দে শাড়ির আঁচল মাটিতে লুটল, কোথাও এক দিনে ঠিক কটা বোতল শেষ করতে পারি সেই খেলায় ভুলতে বসলাম আমার স্বামী অর্পণের কথা, ছেলে শৌর্যর কথা।

আমার স্বামী পুরোটাই সহ্য করে নিচ্ছিল। তবে সকাল থেকে রাত বোতল, নেশাতুর পুরুষ ঘেরা স্ত্রীকে সে নানা ভাবে বদলাতে চেষ্টা করত। বন্ধু, আত্মীয়— কারও কথাতেই আমার হুঁশ ফিরত না। আমি কেবল ভাবতাম কটা বোতল? এক দিনে কটা?

অর্পণ আটকাতে চাইলে ওর বন্ধুর সঙ্গে প্রেমের খেলা খেললাম। কারণ সেখানে বোতল শেষের খেলায় কোনও বাধা ছিল না। যে যেমন খুশি আমায় ডেকে বা আমার বাড়িতে অর্পণ বা শৌর্যের অনুপস্থিতিতে আমায় তরল নেশায় আকণ্ঠ ডুবিয়ে আমার শরীর নিয়ে খেলে বেরিয়েছে। তখন !আমি তা হতে দিয়েছি’। থামলেন অনামিকা। আমার মুখ পড়তে চাইলেন।আর আমি পড়লাম সুবোধ সরকার ‘কাজল ও কান্নার মাঝখানে তোমার মুখে এক চামচ জল।’

‘শেষে দিন ঘনিয়ে এল। ছেলের বিয়ের দিন নিজেকে অনেক করে বুঝিয়েও পারলাম না। ডেকরেটরের অচেনা লোককে পয়াস দিয়ে বাজার থেকে মদ আনিয়ে চিলেকোঠার ঘরে আমি নিজের জীবনের প্রায় ইতি টানতেই বসেছিলাম...আমাকে সারা বাড়ি খুঁজে যখন ওরা পেয়েছিল তখন আমি তো আর শৌর্যের মা ছিলাম না!

আমাকে রিহ্যাব-এ পাঠানো হল। অর্পণ মরিয়া হয়ে গিয়েছিল। আজন্ম যাকে এক গ্লাস জল নিজে থেকে খেতে হয়নি সেই আমি রিহ্যাবে অন্য রোগীদের নোংরা বিছানাও পরিষ্কার করতে বাধ্য হয়েছিলাম। শীতের রাতে কাঠের গদিহীন বিছানা, শুকনো রুটি আর মোটা চালের ভাত...উফ...মা গো!! আর কেবলই যন্ত্রণা...

রিহ্যাব থেকেই আমি জ্ঞান ফিরে পাই। নরক থেকে পৃথিবীতে ফেরার জ্ঞান, স্বাদ, বর্ণ, গন্ধে নিজেকে নতুন করে তৈরি করতে থাকি। এখন ‘অ্যালকোহলিক অ্যানোনিমাস’-এর সঙ্গে আমি যুক্ত। আসলে জীবন থেকে যা ছিনিয়ে নিয়েছিলাম, তার কিছুই তো আর ফিরিয়ে দিতে পারব না। কিন্তু নিজের জীবনের কথা অন্যকে শেয়ার করে যদি তাদের ফুরিয়ে ফেলা জীবনে এগিয়ে চলার সুর ভরে দিতে পারি? জানব আমার বেঁচে থাকার তা-ও একটা অধিকার থাকবে।’

আজও অনেক কথা বলে অনামিকা। সহজ সুরে ঝড় পেরিয়ে। জীবনের কথা!

সব কথা হেরে গেলে/তাই এক দীর্ঘশ্বাস বয়,/বুঝি ভুলে কেঁপে ওঠে/একবার নির্লিপ্ত সময়।/তারপর জীবনের ফাটলে-ফাটলে/কুয়াশা জড়ায়/কুয়াশার মতো কথা হৃদয়ের দিগন্তে ছড়ায়।