Advertisement
E-Paper

পোশাকই বর্ম, পোশাকই খাঁচা! ফ্যাশনপুরের অচিন পাখি কি রূপের চেয়ে আড়ালেই আস্থা রাখছে বেশি?

খাঁচাবন্দি পাখি আপাতদৃষ্টিতে কোনও ইতিবাচক বার্তা দেয় না। বরং তা পরাধীনতার ভাবনাকেই মনে করায় বেশি করে। কিন্তু শিল্পকে কেবল একটি দৃষ্টিভঙ্গী থেকে দেখলে চলে না।

আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক

শেষ আপডেট: ৩০ জানুয়ারি ২০২৬ ১৮:৩৩
আড়াল চাইছে ফ্যাশন দুনিয়া!

আড়াল চাইছে ফ্যাশন দুনিয়া! চিত্রাঙ্কন: শৌভিক দেবনাথ।

ঝকঝকে র‌্যাম্প। সেখান দিয়ে যে মডেল দৃপ্ত ভঙ্গিতে হেঁটে আসছেন, তাঁর পরনের পোশাকটি আদ্যোপান্ত পাখির খাঁচার মতো। পোশাকের গুণে (বা দোষে) তাঁকে দেখতে লাগছে খাঁচাবন্দি পাখির মতোই।

র‌্যাম্পের দু’ধারে অতিথিদের বসার জায়গা। আসনে যাঁরা রয়েছেন, তাঁদের কেউ সমাজের নামজাদা। কারও খ্যাতি ফ্যাশন এবং গ্ল্যামার জগতে। এঁরা প্রত্যেকেই দেখতে এসেছেন, ২০২৬ সালে নজর কাড়তে চলেছে কেমন সাজগোজ। কিংবা সাজের মাধ্যমে সামাজকে কোনও বিশেষ বার্তা দেওয়া হচ্ছে কি না।

‘সাজগোজের সামাজিক বার্তা’ পড়ে যাঁরা থমকালেন, তাঁরা হয়তো সত্তরের দশকে ব্ল্যাক ফ্যাশনের আন্দোলনের ইতিহাস জানেন না। জানেন না, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে মহিলাদের অন্তর্বাস বর্জনের গল্প। প্রত্যেকটি ঘটনারই সামাজিক তাৎপর্য ছিল। বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে ফ্যাশনকে হাতিয়ার বানিয়েছিলেন আমেরিকার কৃষ্ণাঙ্গেরা। সেখান থেকেই শুরু ব্ল্যাক ফ্যাশন আন্দোলন। আবার বিশ শতকের শুরুর দিকে মহিলারা বর্জন করেছিলেন সে যুগের অন্তর্বাস ‘করসেট’। সে কালে ধাতব কাঠামো দিয়ে মহিলাদের শরীরের উপরি ভাগ আষ্টেপৃষ্টে বাঁধতে হত শুধু দেখতে সুন্দর লাগবে বলে। মহিলারা সেই অন্তর্বাস বর্জন করে বুঝিয়েছিলেন, তাঁরা সমাজের চোখে সুন্দর দেখানোর বাধ্যবাধকতা থেকে স্বাধীন হতে চান। শুধু বিদেশের উদাহরণই বা দেওয়া কেন! ইংরেজদের বিরুদ্ধে স্বদেশী আন্দোলনে ভারতীয়রাও কি চরকায় বোনা সুতো থ্রক্র তৈরি কাপড় পরেননি? ফ্যাশনকে হাতিয়ার বানিয়ে বহু সামাজিক এবং রাজনৈতিক বার্তা দেওয়া হয়েছে বহু বার। তাই প্যারিসে ২০২৬ সালের প্রথম বড় ফ্যাশনের আসরে যখন এক মডেল খাঁচার মতো দেখতে পোশাক পরে র‌্যাম্পে হাজির হলেন, তখন সচেতন দর্শকেরা স্বাভাবিক ভাবেই খানিক অবাক হলেন।

খাঁচাবন্দি পাখি আপাতদৃষ্টিতে কোনও ইতিবাচক বার্তা দেয় না। বরং তা পরাধীনতার ভাবনাকেই মনে করায় বেশি করে। কিন্তু শিল্পকে কেবল একটি দৃষ্টিভঙ্গী থেকে দেখলে চলে না। নজর বদলালে খাঁচাবন্দি পাখি বাইরের অনিশ্চয়তার থেকে নিরাপত্তার কথাও বলতে পারে। দুনিয়া জোড়া ফ্যাশন ট্রেন্ড বলছে, আপাতত বাহারি শৌখিনতার চেয়ে সেই ‘নিরাপত্তা’কেই আঁকড়ে ধরছে এ কালের ফ্যাশন।

শুরু হয়ে গিয়েছিল ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময় থেকেই। হঠাৎই ফ্যাশন দুনিয়ায় সব রংকে পিছনে ফেলে উঠে আসতে শুরু করেছিল বাদামি বা খয়েরি। মাটির রং। মনোবিদেরা বলেছিলেন, ‘"এটি ভরসার রংও। পায়ের নীচের জমিই তো সবচেয়ে বড় ভরসা।"

কিন্তু হঠাৎ ফ্যাশনে ভরসা খোঁজার দরকার পড়বে কেন? তারও জবাব মিলেছিল, সেই সময়েই। মনস্তত্ত্ববিদ কেন্ড্রা চেরি বলেছিলেন, ‘‘আসলে চার পাশে এত অনিশ্চয়তা যে, রংয়েও ভরসা খুঁজছেন মানুষ।’’ আর খয়েরি রঙের সেই ভরসা জোগানোর ক্ষমতা আছে। কারণ, খয়েরি রং মাটির প্রতীক। খয়েরি রঙে এক অদ্ভূত নিশ্চয়তা আর আরাম জোগানোর ক্ষমতা রয়েছে। ফ্যাশন দুনিয়া বলেছিল, বিশ্ব জুড়ে নানা টালমাটালের জন্যই সম্ভবত খয়েরি রঙে আরাম আর কিছুটা হলেও নিরাপত্তা খুঁজে পাচ্ছেন মানুষ।

সেই ট্রেন্ডের পরে নিরাপত্তার প্রতীক হিসাবে উঠে এল খাঁচাও। শুধু তা-ই নয়, সাম্প্রতিক ফ্যাশনে আর্মার বা আঘাত থেকে বাঁচার বর্ম জাতীয় পোশাকের আধিক্যও দেখা গিয়েছে মার্জার সরণিতে।

ইদানীং কালের পোশাকে তাই শৌখিন ফুল ছাপ কাপড়, ফ্রিল, লেসের ব্যবহার দেখা যাচ্ছে কম। মানুষ বেছে নিচ্ছেন সেই সব পোশাক, যা তৈরি হচ্ছে এমন দামি কাপড় দিয়ে, যা দেখতে ততটা বাহারি নয়, কিন্তু মজবুত। কারণ, বাহারি শৌখিন জিনিসের নিশ্চয়তা কম বলেই সাধারণের ধারণা।

ফ্যাশনে বাবল ড্রেস, কাফতান স্টাইল, হুড দেওয়া পোশাক, উঁচু কলার দেওয়া জ্যাকেট, ওভারসাইজ়ড লেদার জ্যাকেটও ফিরছে। হলিউডের নায়িকারা পরছেন অতীব ঢলঢলে ব্যারেল জিন্‌স। কোনওটিই শরীরের আদল চট করে বুঝতে দেয় না। এক সময়ে শরীরের আদল স্পষ্ট করা যে সিল্যুয়েট পোশাক, টেলরড বা স্কিনি পোশাক পরার চল বেড়েছিল, তা ক্রমে হারিয়ে যাচ্ছে। শরীরকে এখন অতিরিক্ত কাপড়ের নিরাপত্তায় সাজাতেই স্বস্তি বোধ করছেন মানুষ।

কে বলতে পারে, ওই বাড়তি পোশাকের মধ্যেই মানুষ হয়তো অনিশ্চয়তা থেকে বজায় রাখছেন নিরাপদ দূরত্ব।

Fashion trend 2026 Fashion Tips
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy