সারা গরমকাল জুড়ে হাঁসফাঁস অবস্থা হলেও সাজগোজ তো আর জীবন থেকে উঠে যাবে না! তাই এই কলামের আগামী কয়েকটা পর্বে গরমের সাজপোশাক নিয়েই কিছু আলাপ এবং আলোচনা করব। গরম মানে প্রথমেই মনে পড়ে সুতির শাড়ির কথা। ছেলেবেলায় গরমের সঙ্গে জুড়ে থাকত কিউটিকিউরা পাউডারের গন্ধ আর ফুরফুরে ছাপা অথবা নরম তাঁতের শাড়ির আরাম। মা-কাকিমাদের দেখতাম বিকেল হলেই গা ধুয়ে, ঘাড়ে গলায় ট্যালকম পাউডার লাগিয়ে, পরিপাটি করে চুল বেঁধে সুতির শাড়িতে নিজেদের সাজিয়ে তুলতে। এই পুরো সাজ-বিন্যাসে একটা স্নিগ্ধ শীতল আরামের আশ্বাস ছিল। যিনি সেজেছেন এবং যাঁরা দেখছেন, উভয়েরই বড় শান্তি। আজ ভাল সুতির শাড়ি, খাঁটি হ্যান্ডলুমের কাপড় পাওয়া বেশ মুশকিল। তবে এই সব মিক্সড কাপড় আর পাওয়ারলুমের জগঝম্প উপস্থাপনার মাঝেও অনেকে কাজ করে যাচ্ছেন।
হাতে বোনা খাদি শাড়ির জমি গরমের জন্য আদর্শ। — নিজস্ব চিত্র
তনয় পাল তেমনই এক মানুষ। খেতে ভালবাসেন, রান্না করতে ভালবাসেন আর ভালবাসেন তাঁতের বুনন, হাতের কাজ। লখনউ তাঁর অন্যতম প্রিয় শহর। ওয়াজ়েদ আলি শাহের শহরের খাওয়াদাওয়া, গানবাজনা আর চিকনকারি কাজের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে আকৃষ্ট হয়ে বার বার যেতেন, ঘুরে দেখতেন এই শহরের আনাচকানাচ। সমানেই খাঁটি খাদি কিংবা সুতির কাপড়ে চিকনের জাল বিস্তারের ভাবনা মাথায় ঘুরত। “লখনউ চিকনকে তার চেনা পরিসরের সীমিত গণ্ডির বাইরে নিয়ে আসার জন্য আমাদের বেঙ্গল খাদি মানে ৮৪ কাউন্টের খাদির সঙ্গে এই চিকনের মেলবন্ধনের চেষ্টা করেছি”, বলেন তনয়। সাদা-লাল কম্বিনেশন আমাদের সকলের প্রিয়। সে কথা মাথায় রেখে চিকনকারি করানো হয়েছে খাদি শাড়ির ওপরে। তনয় বলেন, “বেনারসে পুরনো দিনের বাঙালিদের জন্য বোনা বেনারসির স্টাইলে এই শাড়ির ভাবনা। ছোট আঠেরো ইঞ্চি আঁচল, সরু দু’আড়াই ইঞ্চির বাঁধা পাড়, সারা জমিতে ছোট ছোট বুটি।”
যে কোনও অনুষ্ঠান বাড়িতে প্রচন্ড গরমেও আপনি হতে পারেন শো স্টপার। — নিজস্ব চিত্র
হাতে বোনা খাদি শাড়ির জমি আমাদের গরমের জন্য আদর্শ। সে নিজেও নিশ্চিন্তে নিশ্বাস নেয়, আমরাও তাকে জড়িয়ে প্রাণে বাঁচি। তনয়ের সব শাড়িই লখনউ থেকে কাজ করিয়ে আনা হয়। নীল শাড়িটি বানানো হয়েছে পার্সিদের বেনারসির আদলে। তাতে পাড় থাকত না, আঁচল থাকত আর বড় বড় কোনিয়া থাকত। তাই পেজলির ব্যবহার করা হয়েছে। “একটা সুতির শাড়িকে রয়্যাল লুক দেওয়ার চেষ্টা করেছি”, বললেন তনয়। সাদা পিয়োর কটন কোটা দরিয়া শাড়িকে জরি পাড় আর চিকন কাজে এমন ভাবে সাজিয়ে তোলা হয়েছে, যা পরলে যে কোনও অনুষ্ঠান বাড়িতে প্রচন্ড গরমেও আপনি হতে পারেন শো স্টপার। তবে শুধু শাড়ি হলেই তো হবে না, সঙ্গে ব্লাউজ় হতে হবে ড্রামাটিক। তবেই না ক্লাইম্যাক্স জমবে! তাই ব্লাউজ়েও দারুণ চিকনের ব্যবহার। এই সব ব্লাউজ় প্রকৃত অর্থে ভার্সাটাইল। নানা ধরনের শাড়ির সঙ্গে পরতে পারেন। কার সঙ্গে কাকে মেলাবেন, তার দায়িত্ব আপনার।
অতএব গরমের দোহাই দিয়ে কিছুই সাজবেন না, এমনটি করবেন না। আবার গরম তো কী হয়েছে, অনুষ্ঠানবাড়িতে আবার সুতির শাড়ি পরা যায় না কি, ভেবে কাঞ্জিভরম বা সিল্ক পরে ঘেমে নেয়ে একশা তো হবেনই ন।
(মডেল: রোহিণী, ছবি: সহেলি দাস মুখোপাধ্যায়)