মুনমুন সেন ৪ বছর বয়স থেকে ছবি আঁকেন। ছবির জগতে হাতেখড়ি যামিনী রায়ের কাছে। সেই থেকে শিল্পচর্চা তো চলছেই। ছবি আঁকা এখনও থামেনি। তিনি বলেন, ‘‘মা কাজ থেকে বাড়ি ফেরার আগে ঘরে আলপনা দিয়ে রাখতাম। দেখে মা খুশি হতেন। পরিচিতদের জন্যও কখনও ছবি এঁকেছি। যেমন শংকরের একটা বইয়ের প্রচ্ছদও করেছি। এই হল আমার আঁকাআঁকির কথা!’’ বেশি লোকে তাঁর আঁকা দেখার সুযোগ পাননি। কারণ, তিনি চিত্রশিল্পীদের মতো নিয়মিত নিজের কাজ দেখান না। অত নিয়মিত আঁকেনও না। এ বার দেখা যাবে তাঁর কাজ, একটি প্রদর্শনীতে।
এই মুনমুন সেন কি সেই-ই মুনমুন সেন? নিশ্চয়ই এ প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে মনে? ইনি কিন্তু তিনিই। অর্থাৎ, যিনি অভিনয় করেন, তিনি ছবিও আঁকেন। মুনমুন যেমন জানান, যখন ইচ্ছা, যেমন ইচ্ছা একটু ‘আঁকিবুকি’ কাটলে মনটা ভাল থাকে তাঁর। অনেক সময়ে কেউ স্বাক্ষর চাইতে এলেও একটু ছবি এঁকে দেন তাঁর জন্য। সে সব আঁকা কিন্তু যেমন-তেমন নয়। তাতে যত্ন কত দেখতে চাইলে পৌঁছে যেতে হবে সিমা গ্যালারিতে। সেখানে শুরু হয়েছে প্রদর্শনী ‘আউটসাইডার আর্ট’।
যাঁরা পেশাগত ভাবে অন্য ধরনের কাজের সঙ্গে যুক্ত, কিন্তু ভালবেসে নিয়ম করে শিল্পকাজ করেন, তাঁদেরই সৃষ্টি নিয়ে হচ্ছে এই প্রদর্শনী। চিকিৎসক থেকে পোশাকশিল্পী, অভিনেতা থেকে পরিচালক, রাজা থেকে নবাববাড়ির কন্যা— কে নেই সেই তালিকায়! গ্যালারির অধিকর্তা রাখী সরকার জানান, যাঁরা কাজের জন্য নয়, মূলত ভালবাসা থেকে শিল্পচর্চা করছেন, এ প্রদর্শনী তাঁদেরই সম্মান জানাতে আয়োজিত।
অমলা শঙ্করের আঁকা ছবি (বাঁ দিক) এবং অপর্ণা সেনের তোলা ছবি (ডান দিক)। — নিজস্ব চিত্র
গ্যালারির বাঁকে বাঁকে বিস্ময়। তালিকায় আছে যে আরও কত জনের কাজ। মুনমুনের সঙ্গে যেমন আছে তাঁর ছোট কন্যা রিয়া সেনের আঁকা ছবি। আছে পরিচালক অপর্ণা সেনের তোলা ছবি। এমনকি, সিমা গ্যালারির এই প্রদর্শনীতে গিয়ে দেখা যাবে প্রয়াত অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের আঁকাও। অভিনেতার কন্যা পৌলমী বসু আনন্দবাজার ডট কমকে জানান, বরাবরই রং-তুলিতে মন ছিল তাঁর। সব সময়ে হয়তো সুযোগ হত না, কিন্তু কাজের ফাঁকে একটু অন্য রকম অনুভূতি দিত তাঁর শিল্পচর্চা। একই বক্তব্য চিকিৎসক সঞ্জয় ঘোষের। কলকাতা শহরে তিনি পরিচিত চর্মরোগ চিকিৎসক বলেই। তাঁরই যে আবার এত প্রদর্শনী হয়েছে। ছোটবেলা থেকে এত শিল্পচর্চায় শখ, সে কথা কত জনই বা জানেন? এ বারের প্রদর্শনীতে নিজের ডিজিটাল গ্রাফিক্স দিয়েছেন চিকিৎসক-শিল্পী। তবে জলরং, মিক্স মিডিয়া— সব ধরনের কাজই তাঁর পছন্দের বলে জানান সঞ্জয়।
শিল্প সংগ্রাহক হিসাবে শহরে পরিচিত নাম প্রদীপ বোথরা। তবে এ বারের প্রদর্শনীতে তিনিই শিল্পী। তিনি বলেন, ‘‘যে সময়ের কলকাতায় আমরা বেড়ে উঠেছি, সেখানে ঘরে ঘরে শিল্পচর্চা ছিল স্বাভাবিক। নাচ-গান-নাটক-আঁকা শেখা খুব আলাদা কোনও বিষয় ছিল না। তাই সকলের মতো আমিও আঁকতে শিখেছি। সে কাজ এত দিন ধরেই করে যাচ্ছি।’’
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আঁকা ছবি। — নিজস্ব চিত্র
এত কথার মাঝে নিশ্চয়ই আরও একটি নাম মনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে? এত জনের শিল্পকাজ নিয়ে কথা হল, আর উচ্চারণ হল না বাংলার ‘নিজের মেয়ে’-র নাম? এমন একটি আয়োজন হবে শহর কলকাতায়, আর রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথা উঠবে না, তা কি হয়? তিনি রাজনীতিবিদ হিসাবে পরিচিত বটে, তবে তাঁর শিল্পকাজ নিয়ে তো আর কম কথা হয় না। এ প্রদর্শনীতে অন্যতম আকর্ষণ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর আঁকা ছবি। যে কোনও দিন বেলা ১১টার পরে সিমা গ্যালারির দরজা ঠেলে ঢুকলেই প্রথম যে নীল-সাদা-ধূসরে আঁকা ছবিটি চোখে পড়বে, সেটি তাঁর-ই।
প্রদর্শনী চলবে মে মাসের ২ তারিখ পর্যন্ত। সোম থেকে শনি, যে কোনও দিন গিয়ে ঘুরে এলেই হল।