E-Paper

দূরে থেকেও জুড়ে থাকুন

কর্মসূত্রে স্বামী-স্ত্রী দূরে থাকলেও তার প্রভাব যেন না পড়ে সন্তানের উপরে। দূরে থেকেও দায়িত্ব নিন

কোয়েনা দাশগুপ্ত

শেষ আপডেট: ২৭ জুন ২০২৬ ০৬:৪৯
দূরে থেকেও সন্তানের জীবনে সক্রিয় উপস্থিতি রাখা যায়।

দূরে থেকেও সন্তানের জীবনে সক্রিয় উপস্থিতি রাখা যায়।

সন্তানের বড় হওয়ার জন্য প্রয়োজন মা-বাবা দু’জনেরই সঙ্গ। কিন্তু কর্মসূত্রে আজকাল বহু স্বামী-স্ত্রীকেই আলাদা থাকতে হয়। সে ক্ষেত্রে মা কিংবা বাবা, কোনও একজনই দায়িত্ব নেন সন্তানের। অনেক শিশুই আবার দাদু-দিদা-ঠাকুমার কাছে বড় হয়। বাড়ন্ত বয়সে অনেক সময়েই এর প্রভাব পরে বাচ্চার মানসিক স্বাস্থ্যের উপরে। এক সময়ে দূরে থাকা অভিভাবকের সঙ্গে দূরত্ব বাড়ে তাদের।

ছোট পর্দার পরিচিত মুখ মনীষা মণ্ডল। চাকরির জন্য তাঁর মা দূরে থাকতেন। মনীষা বড় হয়েছেন দাদু-দিদার কাছে। অভিনেত্রী বলছিলেন, “ছোটবেলায় মা আমার পছন্দ-অপছন্দ জানেন না বলে অভিযোগ করেছি। শাসন করলে বলেছি, ‘তুমি কেন বলছ? তুমি তো থাকো না!’ তবে এখন ভাল বন্ডিং আমাদের।” জেনারেশন যত এগোচ্ছে, সন্তান ও কেরিয়ারের মধ্যে টানাপড়েনে ভুক্তভোগী অভিভাবকের সংখ্যাও বাড়ছে। পেরেন্টিং কনসালট্যান্ট পায়েল ঘোষ বলছেন, “লং-ডিসট্যান্স পেরেন্টিং কঠিন। অধিকাংশ সময়েই দূরে থাকা অভিভাবকেরা আদর এবং শাসনের ব্যালান্স করতে পারেন না। সন্তানের সঙ্গে তাঁদের বিশেষ কোনও বন্ডিংও তৈরি হয় না। কছে না থাকার ঘাটতি উপহার বা প্রশ্রয় দিয়ে মেটাতে গিয়ে সন্তানের ক্ষতি করে বসেন।”

সমস্যা কী?

খুব ছোট বাচ্চাদের সমস্যা হয় না। পরিস্থিতি জটিল হয় একটু বড় হলে। পায়েল বলছেন, “তিন-চার বছরের বাচ্চার মা-বাবা হঠাৎ আলাদা থাকতে শুরু করলে সন্তানের মধ্যে একটা শূন্যতা, নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়। তা থেকে অনেক সময়েই বাচ্চার শরীর খারাপ হয়, জ্বর আসে।” সম্প্রতি পায়েল দু’টি পরিবারের কথা বললেন, যেখানে একটি বাচ্চার বয়স সাত। বছর চারেক বাদে তার বাবা দেশে ফিরেছেন। ভিডিয়ো কলে আগে কথা হলেও এখন সামনাসামনি বাচ্চাটি বাবাকে গ্রহণ করতে পারছে না। বাবার কাছে ঘেঁষা তো দূর, একসঙ্গে থাকতেও চাইছে না। অন্যটি তেরো বছরের ছেলে, মায়ের সঙ্গে থাকে। বয়ঃসন্ধির নানা সমস্যা সে মায়ের সঙ্গে ভাগ করে নিতে চায় না। বাবা দূরে থাকেন, সময় দিতে পারেন না। ক্রমশ জেদি, অবাধ্য হয়ে উঠছিল ছেলেটি। পায়েল বলছেন, “ছেলে হোক বা মেয়ে বড় হওয়ার ক্ষেত্রে বাবা বা মায়ের আলাদা ভূমিকা থাকে। একজন অভিভাবক অনেক সময়েই দু’জনের ভূমিকা পালন করে উঠতে পারেন না। এর ফলে বাচ্চার মধ্যে একটা আক্রোশ, অভিযোগের জায়গা তৈরি হয়। ক্রমশ জেদি, একগুঁয়ে হয়ে যায়। সমবয়সি অন্যদের চেয়ে নিজেকে আলাদা মনে করে। একাকিত্বে ভুগতে থাকে।” দূরে থাকা অভিভাবক ভালবাসে না— এমন ধারণা তৈরি হয়। অনেক বাচ্চা সম্পর্কের উপরে বিশ্বাস হারাতেও শুরু করে। অল্প বয়সের এই ট্রমা থেকে পরবর্তীকালে সঙ্গীর প্রতি অতিরিক্ত অধিকারবোধ কিংবা অনাসক্তি দেখা দিতে পারে।

বোঝাপড়া ঠিক থাক

লং-ডিসট্যান্স পেরেন্টিংয়ে প্রথমেই স্বামী-স্ত্রীর বোঝাপড়া ঠিক হওয়া জরুরি। যিনি দূরে আছেন, তাকে নিয়ে অন্যজনের নেতিবাচক মন্তব্য বা অভিযোগ সন্তানের সামনে করা উচিত নয়। পায়েল বলছেন, “সন্তানের জীবনের ছোট-বড় সিদ্ধান্ত দু’জনে একসঙ্গে নিন। বাচ্চার পড়াশোনা, খেলাধুলো বা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করার সময়ে দূরে থাকা অভিভাবককেও যুক্ত রাখুন। এতে শিশু বুঝবে দু’জনেই তার জীবনের অংশ।” দু’জনেই নিজেদের সুবিধা-অসুবিধা সন্তানের সঙ্গে শেয়ার করুন। এতে তার মধ্যেও বাবা বা মায়ের জন্য সহানুভূতি তৈরি হবে।

দায়িত্বে থাকুক যৌথতা

মা বা বাবা কেন বাইরে থাকছেন? সে কথা প্রথম থেকেই বাচ্চাকে বুঝিয়ে দিন। একই সঙ্গে প্রয়োজন-অপ্রয়োজনে মা-বাবা দু’জনেই সব সময়ে রয়েছেন, বাচ্চার সেই ভরসার জায়গাটিকেও মজবুত করতে হবে। প্রযুক্তির কল্যাণে এখন কাজটা অনেকটাই সহজ। ভিডিয়ো কল, কো-পেরেন্টিং অ্যাপ মারফত বাচ্চার সঙ্গে জুড়ে থাকতে পারেন। আজকাল অনেক স্কুলই অ্যাপ, ওয়টস্যাপে পড়াশোনা, অ্যাক্টিভিটিজ় করায়। সেগুলোয় অংশ নিন। সন্তানের স্পোর্টস বা অনুষ্ঠানের দিনগুলোয় ভিডিয়ো কলে উপস্থিত থাকতে পারেন। বাইরে থাকলে অনেকেই বাচ্চার পড়াশোনা বা অন্যান্য গুরত্বপূর্ণ বিষয়ে মাথা ঘামাতে চান না। জুড়ে থাকতে বরং একটা-দুটো বিষয়ের দায়িত্ব নিন। “দিনে দু’টি আলাদা সময় ঠিক করুন, যার একটিতে পড়াশোনা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা করবেন, অন্যটিতে ব্যক্তিগত খোঁজখবর নিন,” পরামর্শ পায়েলের।

নিজেকে বোঝান

দূরে থাকা অভিভাবক অনেক সময়েই আত্মগ্লানিতে ভোগেন। মনে রাখবেন, সন্তানকে ভাল রাখতেই তাঁর বাইরে থাকা। তা ছাড়া, কেরিয়ারও জরুরি। খেয়াল রাখবেন, ‘পারফেক্ট পেরেন্ট’ হওয়া সম্ভব নয়। কোনও অভিভাবকই সব সময়ে সন্তানের পাশে থাকতে পারেন না। উপস্থিতির পরিমাণের চেয়ে সম্পর্কের গুণমান বেশি জরুরি। সন্তানের কাছে বারবার কৈফিয়ত দেওয়াও নিষ্প্রয়োজন। বরং অভিভাবককে দেখেই সন্তানও দায়িত্ববান হতে শিখবে।

সন্তানের জন্য

মা বা বাবা সময় দিতে না পারলেও, মাতৃসুলভ বা পিতৃসুলভ কারোর সংস্পর্শে বাচ্চা যেন থাকে, সে দিকে নজর রাখা দরকার। অনেক সময়েই কোনও টিচার, কোচ বা কাছের কোনও আত্মীয় সেই জায়গাটা নিতে পারেন। তিনি যেন বাচ্চাটিকে অতিরিক্ত নজর দেন, সে ব্যবস্থা করতে হবে। সন্তানের বাইরের অ্যাক্টিভিটি, যেখানে তারা অনেকের সঙ্গে মিশতে পারবে, এমন সুযোগ বাড়াতে হবে।

প্রতিটা বাড়ি, তার পরিস্থিতি আলাদা হয়। মা দূরে থাকলে যে অসুবিধা হয়, বাবা বাইরে থাকলে কিন্তু অন্য সমস্যা হয়। তবে সন্তান বড় করার কোনও ধরাবাঁধা নিয়ম হয় না। খেয়াল রাখবেন, দূরত্ব যতই হোক, সম্পর্কের সেতু যদি মজবুত থাকে, তা হলে কোনও সমস্যাই হবে না। সন্তান যেন অনুভব করে যে তার কথা শোনা হচ্ছে এবং তার অনুভূতির মূল্য দেওয়া হচ্ছে। প্রয়োজন হলে কাউন্সেলিং করান। শিশু মনোবিজ্ঞানীর পরামর্শও নিতে পারেন।


(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Working Parents

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy