Advertisement
E-Paper

শিশুর বিকৃতি রুখতে সচেতন হোন মা-বাবা

একটি টেবিলে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ভাবে রয়েছে ওই শ্রেণিরই দু’টি ছেলেমেয়ে। প্রাথমিক ধাক্কা কাটিয়ে তিনি জানতে চান, এ সব কী হচ্ছে? সারল্যের সঙ্গে ১০ বছরের ছাত্রটি উত্তর দেয়, ‘‘ম্যাম খেলা দেখাচ্ছি।’’

মৌমিতা করগুপ্ত

শেষ আপডেট: ২৬ নভেম্বর ২০১৭ ০২:০০

সে দিন টিফিন পিরিয়ড শেষের পরে কমন রুম থেকে ক্লাসে ঢুকতে মিনিট দশেক দেরি হয়ে গিয়েছিল শিক্ষিকার। তড়িঘড়ি করে পঞ্চম শ্রেণির ক্লাসে ঢুকতেই দেখেন সব ছেলেমেয়ে একটি টেবিলকে ঘিরে কী যেন দেখছে। ভিড়ে প্রথমে ঠাহর করতে না পারলেও কয়েক পা এগোতেই স্তম্ভিত হয়ে যান ওই শিক্ষিকা।
একটি টেবিলে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ভাবে রয়েছে ওই শ্রেণিরই দু’টি ছেলেমেয়ে। প্রাথমিক ধাক্কা কাটিয়ে তিনি জানতে চান, এ সব কী হচ্ছে? সারল্যের সঙ্গে ১০ বছরের ছাত্রটি উত্তর দেয়, ‘‘ম্যাম খেলা দেখাচ্ছি।’’ পরে সেই ছাত্রের সঙ্গে আলাদা ভাবে কথা বলে স্কুল কর্তৃপক্ষ জানতে পারেন, মা-বাবাকে কোনও সময়ে ঘনিষ্ঠ মুহূর্তে দেখে ফেলেছিল সে। পরে নিজের মতো করে সে ব্যাখ্যা করে নিয়েছে, এটা বড়দের খেলা। আর সেই খেলাই বাকি বন্ধুদের ওই দিন ‘শেখাচ্ছিল’ ওই পড়ুয়া।

সম্প্রতি গুরুগ্রামের রায়ান ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে প্রদ্যুম্ন ঠাকুর হত্যাকাণ্ডে সিবিআইয়ের হাতে ধরা পড়েছে ওই স্কুলেরই একাদশ শ্রেণির এক ছাত্র। অতি সম্প্রতি আবার সেই দিল্লিরই দ্বারকায় ৪ বছরের এক ছাত্র অভিযুক্ত হয়েছে ধারালো পেনসিল এবং আঙুল দিয়ে তারই সহপাঠিনীকে যৌন অত্যাচার করার ঘটনায়।

পরপর ঘটনাগুলো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে শিশুরা এমন আচরণ করছে যা স্বাভাবিক ভাবে তাদের বয়সোপযোগী নয়। সাধারণ ভাবে শিশুরা অনুকরণপ্রিয়। তারা বাড়িতে বা চারপাশে যা দেখে, তা থেকেই নিজেদের মতো করে শেখে। প্রশ্ন উঠছে, তবে কি বাবা-মা অথবা চারপাশের মানুষজনের আচরণের কোনও বিচ্যুতিই শিশুদের বাধ্য করছে এমন নেতিবাচক আচরণ করতে। বাবা-মায়েরা শিশুদের সামনে কেমন আচরণ করলে শিশুর মধ্যে ‘সুস্থ শৈশব’ প্রস্ফুটিত হবে?

মনোবিদদের একাংশের মতে, শিশুদের বিকৃত আচরণের ক্ষেত্রে একটা বড় কারণ কিন্তু মা-বাবার দায়িত্বের গাফিলতি। বহু বাবা মা ছেলেমেয়ের সঙ্গে এক বিছানায় ঘুমোন। সে ক্ষেত্রে বাবা মায়ের সম্পর্কের মধ্যে যৌনতা স্বাভাবিক বিষয় হলেও তা কখনই সন্তানের সামনে প্রকাশ পাওয়া উচিত নয়। সঙ্গে তাঁদের সাবধান বার্তা, তার মানে এই নয় যে মা-বাবা সন্তানের সামনে একে অপরকে স্পর্শ করবেন না। বরং বাবা কখনও মাকে ভালবেসে আলতো জড়িয়ে ধরলে সন্তানও নিরাপদ বোধ করে। এক সঙ্গে সোফায় সিনেমা দেখার সময়ে যদি মা বাবা পরস্পরের গা ঘেঁষে বসেন তা-ও সন্তানের কাছে ‘কুশিক্ষা’ হতে পারে না। তাকেও ছোট থেকে বোঝাতে হবে যে বাবা আর মা পরস্পরের বিশেষ বন্ধু। যে বন্ধুত্বটা আর পাঁচটা বন্ধুত্বের থেকে একেবারে আলাদা।

মনোরোগ চিকিৎসক নীলাঞ্জনা স্যান্যাল জানান, শিশুদের মধ্যে প্রাথমিক ভাবে ‘যৌন সম্পর্ক’ বিষয়ক ধারণা থাকে না। মোটামুটি ভাবে তিন বছর বয়স থেকে ছেলে বা মেয়ে এই লিঙ্গভেদের তারতম্যটা বুঝতে শেখে। বেশির ভাগ পরিবারেই আজকাল একটি করে ছেলেমেয়ে। তাকে নিয়ে মা-বাবার আদরেরও সীমা নেই। তাই অনেক বাড়িতেই সন্তানের প্রায় ১৪-১৫ বছর বয়স হয়ে যাওয়ার পরেও বাবা মায়ের সঙ্গে ‘কো স্লিপিং’-এ অভ্যস্ত থেকে যায়। এ ভাবে বাবা মায়ের গা ঘেঁষে ঘুমোনোর অভ্যেস থেকে মা-বাবার হাতের স্পর্শ, গায়ের গন্ধের প্রতি তার একটা আকর্ষণ তৈরি হয়ে যায়। সেটা সব সময় ভাল না। বরং ছোট সন্তান যদি দেখে মায়ের কোলে মাথা দিয়ে শুয়ে রয়েছেন বাবা, আর মা তাঁর মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন তাতে সে বুঝবে এই নৈকট্যও এক রকম ভালবাসার প্রকাশ। মা অফিস বেরোনোর সময়ে বাবা এগিয়ে এসে তাঁর কপালে বা হাতে আলতো ঠোঁট ছোঁয়ালে সন্তানও একই ভাবে ভালবাসতে শিখবে। বরং বাবা মা যদি অতিরিক্ত আড়াল আবডাল করেন তা থেকেই ‘নিষিদ্ধ’ বোধটা তৈরি হয়। শিশুকে বোঝাতে হবে সবটা নিষিদ্ধ না। বাচ্চা যদি ধীরে ধীরে বোঝে মা বাবার মধ্যে একটা সহজ সম্পর্ক আছে। সেটা তাকেও স্বস্তি দেবে। তবে পুরো বিষয়টায় বাবা মাকে সচেতন থাকতে হবে সাবলীলতা, শোভনীয়তা, সামাজিকতা বোধ সম্পর্কে।

পেরেন্টিং কনসালট্যান্ট পায়েল ঘোষের মতে, ‘‘তিন বছর বয়স থেকেই প্রতিটি শিশুকে যৌন শিক্ষা (সেক্স এডুকেশন) দেওয়া উচিত। যৌনতা বিষয়টিকে বিজ্ঞানসম্মত এবং ছোটদের কাছে গ্রহণযোগ্য ভাবে যদি অভিভাবকেরা ব্যাখ্যা করতে পারেন তা হলে প্রথম থেকেই শিশুর মনের মধ্যে অহেতুক কৌতুহলের উদ্রেক হয় না।
পাশাপাশি বাচ্চাটি নিজের এবং অন্যের শরীর সম্পর্কে সচেতন হলে অন্যকে কোনও ভাবে শারীরিক ভাবে আঘাতও করবে না।’’

শিক্ষাবিদ পবিত্র সরকারের কথায়, ‘‘একটি শিশুর মানসিকতা গঠনের ক্ষেত্রে স্কুলের থেকেও বেশি অবদান থাকে তার বাবা-মায়ের। তাঁদের কাছেই শিশু প্রথম ভাল-মন্দের পার্থক্য চিনতে শেখে। তাই ভবিষ্যতে সুনাগরিক তৈরির জন্য অভিভাবকদেরই সজাগ থাকতে হবে।’’

মনোবিদেরা জানাচ্ছেন, বাবা মায়ের চোখে শিশুর আচরণে সামান্যতম বিচ্যুতি ধরা পড়লে বকাবকি বা মারধর না করে তাকে কাছে ডেকে বোঝাতে হবে। তাতেও কাজ হচ্ছে না মনে হলে অবশ্যই বিশেষজ্ঞদের সাহায্য নিতে হবে। সন্তানকে ভালবাসতে গিয়ে নিয়ন্ত্রণের সীমানা ছোট করে ফেললে জীবন-বিকাশ কি সুস্থতার পথে চলতে পারে? বড়রা নিজেদের আচরিত ধর্মে সংযমের প্রয়োজনীয়তা দেখাতে না পারলে, ছোটরা কিন্তু মানবে না। আমাদেরই দায়িত্ব ওদের বোঝার ও বোঝানোর।

Child Care
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy