E-Paper

যন্তর মন্তর

পড়াশোনার ধরন বদলাচ্ছে। ক্রমশ এআই-নির্ভর, ডিজিটাল লার্নিংয়ে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে বাচ্চারা

কোয়েনা দাশগুপ্ত

শেষ আপডেট: ১৩ জুন ২০২৬ ০৭:০৯

আছে ক্লাসরুম, আছে চক, আছে টিচারের বকবক... সে সব এক সময়ে পড়াশোনার একমাত্র উপায় ছিল। এখন সময় বদলেছে। স্মার্টফোন, গ্যাজেটসের সঙ্গে তাল মিলিয়ে স্মার্ট হচ্ছে শিক্ষাঙ্গনও। বদল এসেছে শিক্ষা পদ্ধতিতে। ব্ল্যাকবোর্ড সরিয়ে বসানো হচ্ছে স্মার্টবোর্ড, প্রাধান্য পাচ্ছে ডিজিটাল লাইব্রেরি। বাচ্চারা পড়াশোনা করছে ট্যাবলেটে। এ রাজ্যে সরকারি স্কুলগুলো এখনও অবধি এতটা স্মার্ট হয়নি। তবে পড়াশোনায় বাচ্চাদের আগ্রহ বাড়াতে সিবিএসসি, আইসিএসসি দুই বোর্ডই এমন নানা স্মার্ট পদ্ধতি নিতে শুরু করেছে। শামিল করেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকেও।

নতুন প্রজন্মের নতুন ভাষা

উচ্চমাধ্যমিকে অতিরিক্ত কোনও টিউশন নেয়নি সায়ম। পুরো পড়াশোনাটাই করেছে অ্যাপের মাধ্যমে। বোর্ডের পরীক্ষায় ৯০ শতাংশ নম্বরও পেয়েছে। ক্লাস ফোরের শ্রীজা যেমন ইন্টারনেট দেখে স্কুলের প্রজেক্ট নিজেই করে। বছর দুয়েকের সমুদ্র এর মধ্যেই একাধিক কবিতা শিখে ফেলেছে অ্যাপ দেখে— এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, ক্রমশ ডিজিটাল লার্নিংয়ের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। রামমোহন মিশন হাইস্কুলের প্রিন্সিপাল সুজয় বিশ্বাস বলছেন, “বইয়ের পাতা খুললে ছোটদের চোখে ঘুম নেমে আসে চিরকালই। বরং এখন অ্যানিমেটেড ভিডিয়ো, গেমস, রিলস ওদের আগ্রহ দীর্ঘক্ষণ ধরে রাখে। ওদের খেলাধুলো, আনন্দ সবটাই যখন মোবাইল ঘিরে, তখন সে মাধ্যমে পড়াশোনা করালে মনোযোগ বাড়বে আশা করেই এই পদ্ধতি নেওয়া।”

ডিজিটাল লার্নিং কী?

এক দশক আগেও রোজ স্কুলে বই নিয়ে যাওয়া, ব্ল্যাকবোর্ড দেখে লেখা, সন্ধেবেলা টিউশন যাওয়া... এগুলোই ছিল পড়ুয়াদের রুটিন। ডিজিটাল লার্নিংয়ের জমানায় সে সবের পাট উঠছে। শুধু অনলাইন ক্লাস নয়, এর মধ্যে রয়েছে ভিডিয়ো, ইন্টারঅ্যাকটিভ অ্যাপ, স্মার্টবোর্ড ইত্যাদি। প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে পড়াশোনাকে আরও আকর্ষক এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক করে তোলাই এর উদ্দেশ্য। যারা অন্তর্মুখী, যারা দূরত্বের কারণে ভাল কোর্সের প্রস্তুতি নিতে পারছে না, তাদের এ ক্ষেত্রে সুবিধা হচ্ছে। বই-খাতার ভারী ব্যাগ বইতে হচ্ছে না। স্মার্টবোর্ড কাজ সহজ করছে। ভার্চুয়াল ল্যাব জিজ্ঞাসা মেটাচ্ছে।

বিকল্প নয়, সহায়ক

তবে কি স্কুল বা শিক্ষকের বিকল্প এই ব্যবস্থা? ধরা যাক, বেশ রাত। একটা অঙ্ক হচ্ছে না। চ্যাটবটকে দিতেই ধাপে ধাপে সমাধান হাজির। স্কুল, কলেজের সব পাঠ্যের ব্যাপারে অগাধ জ্ঞান চ্যাটবটের। সুতরাং, বিকল্প নয়, এটা একটা সহায়ক ব্যবস্থা, যা আরও সুবিধেজনক। ভবনস গঙ্গাবক্স কানোরিয়া বিদ্যামন্দিরের ভাইস-প্রিন্সিপাল অবন্তিকা সেন বলছেন, “যন্ত্রের কোনও বিরক্তি নেই। তার বরাদ্দ নির্দিষ্ট কোনও সময়ও নেই। ক্লাসরুমে এক একটি বিষয় দু’-তিন বারের বেশি বোঝানোর সময় হয় না। সে ক্ষেত্রে অ্যাপ, চ্যাটবট কার্যকর।” অ্যাপে পুরো ক্লাসটাই রেকর্ড করা থাকে। প্রয়োজন মতো দেখে নেওয়া যায়। চ্যাটবট এক জিনিস অনেক ভাবে বোঝাতে পারে। প্রয়োজনে তৎক্ষণাৎ ভিডিয়ো, চার্ট ইত্যাদি বানিয়ে দিতে পারে। সঙ্গে রয়েছে প্রজেক্ট, ডিআইওয়াই, প্রেজ়েন্টেশন, পোস্টার তৈরির মতো বিষয়গুলোও। এআই মারফত বাচ্চারা সে সব স্কিলেও শান দিতে পারছে।

ডিজিটাল লার্নিংয়ের সুবিধা

এতে ছোট থেকেই স্বাবলম্বী, আত্মনির্ভর হচ্ছে বাচ্চারা। পড়াশোনা আরও আকর্ষক হচ্ছে, তা নিয়ে দ্বিমত নেই শিক্ষাবিদদের। অবন্তিকা বলছেন, “নেলসন ম্যান্ডেলা, বিবেকানন্দের বক্তৃতা, সৌরজগতের গতিপ্রকৃতি আমরা শুধু পড়তাম, ওরা সেটা চোখের সামনে দেখতে পায়, শোনে, যা ওদের পড়া সহজে মনে রাখার ক্ষমতা বাড়ায়।” সুবিধা হয় ওয়ার্কিং পেরেন্টদেরও। অ্যাপ ও এআই-এর মাধ্যমে সন্তান কতক্ষণ পড়াশোনা করছে, কোন বিষয়ে তার প্রস্তুতি কেমন তার আন্দাজ পান অভিভাবকেরা। স্কুলও অ্যাপ মারফত নিজেদের মতামত অভিভাবককে জানিয়ে দিতে পারে।

বিপদও আছে...

প্রশ্ন হল, শিক্ষাক্ষেত্রের এই পরিবর্তনে জ্ঞান কতটুকু সম্পূর্ণ হচ্ছে? ডিজিটাল মাধ্যমে পড়াশোনা করতে গেলে প্রয়োজন স্মার্টফোন, ল্যাপটপ, ইন্টারনেটের অবাধ ব্যবহার। অথচ সেখানেই রয়েছে আরও একশো প্রলোভন, আসক্তি। চাইল্ড লক, অভিভাবকের নজরদারির সুযোগ থাকলেও, তা যে সবসময় কার্যকর হবে এমন নয়। বিশেষত এখনকার প্রজন্মের পক্ষে এর ফাঁক খুঁজে বার করা কঠিন নয়। তা ছাড়া, অ্যাপ শুধু সেটুকুই শেখাবে, যতটুকু বাচ্চা নিজে জানতে চাইবে। কিন্তু একজন শিক্ষক তার বাইরের জগৎ সম্পর্কেও একটা ধারণা তৈরি করে দেবে। বাচ্চার বড় হতে প্রয়োজন ‘হিউম্যান টাচ’, সে কথা বলছেন সুজয়ও। “অণুপরিবার, কর্মরত বাবা-মা... ক্রমশ সেই আন্তরিক যোগাযোগের জায়গা কমছে। সে ক্ষেত্রে ডিজিটাল লার্নিংকে গুরুত্ব দিলে বাচ্চা আরও ঘরকুনো হয়ে যাবে। এতে সমানুভূতির শিক্ষায় ঘাটতি হবে,” বলছেন সুজয়।

তবে কি ক্ষতিকর?

অবন্তিকা বলছেন, “এই যুগে দাঁড়িয়ে বাচ্চাকে প্রযুক্তি থেকে দূরে রাখা সম্ভব নয়। বরং তারা যেন সম্পূর্ণ প্রযুক্তি-নির্ভর না হয়ে পড়ে, সেটা খেয়াল রাখতে হবে।” মা-বাবাকেও নিজেদের আপডেটেড রাখতে হবে। দিনকয়েক এআই বা অ্যাপ ঘাঁটলে তার উত্তর, লেখার প্যাটার্ন বোঝা যায়। তা থেকেই বাচ্চা সম্পূর্ণ এআই নির্ভর হয়ে পড়ছে নাকি নিজেকে সমৃদ্ধ করতে ব্যবহার করছে আন্দাজ পাওয়া যাবে। “অ্যাপ বা এআই থেকে পাওয়া জ্ঞান কার্যক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা কতটা ব্যবহার করছে, সেই মূল্যায়নও জরুরি। বাচ্চার যদি শুধুই এআই-এর সমাধান টুকে সাময়িক উতরে যাওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়, তবে রাশ টানতে হবে,” মনে করেন সুজয়।

কী কী করতে পারেন?

  • বাচ্চাকে ঠিক কনটেন্ট বেছে দিতে হবে। কোন অ্যাপ, কোন প্ল্যাটফর্ম ভাল, দেখে নিন। শিক্ষক এবং অভিভাবককে যৌথ ভাবে এ সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
  • আলোচনার জায়গা রাখুন। প্রথম থেকে ভাল-মন্দের পাঠ দিন। অনলাইন স্ক্যাম, ভুয়ো ওয়েবসাইট সম্পর্কে সচেতন করুন। পড়াশোনার নামে অন্য সাইট, সিনেমা দেখলেও বকাবকি নয়, সমাধান করুন অন্য ভাবে।
  • বাচ্চার আচরণগত কোনও সমস্যা হচ্ছে কি না, নজর রাখুন। পড়ার নামে অতিরিক্ত সময় মোবাইল, ল্যাপটপে কাটালে বা ক্রমশ জেদি, অবাধ্য হয়ে উঠলে সতর্ক হতে হবে।

তবে ডিজিটাল লার্নিং যতই আসুক, বইয়ের বিকল্প নেই, বলছেন শিক্ষাবিদরা। ডিজিটাল স্ক্রিনে দেখা ভিডিয়ো, রংবেরঙের চার্ট চিন্তাভাবনার পরিসর কমিয়ে আনে, মত তাঁদের। বইয়ের পাতায় দৃষ্টি প্রসারিত হয়। কল্পনা শক্তি বাড়ে। কালো অক্ষরগুলো পড়তে পড়তে মনের ভিতর একের পর এক দৃশ্যপট দ্রুত বদলে যায়। গল্পের এক একটা চরিত্র মন কল্পনা করে নেয়। সেই গল্পই যদি ভিডিয়ো মারফত দেখে, কল্পনাপ্রবণ মনটা হারিয়ে যাবে। ভবিষ্যৎ জীবনে এই বাচ্চারাই কেউ হয়তো লেখক, কেউ বিজ্ঞানী, শিক্ষক হবে। সকল ক্ষেত্রেই সাফল্য পেতে কিছু নিজস্বতা জরুরি। অতিরিক্ত যন্ত্রনির্ভরতায় ছোট থেকেই তাদের সেই মনটা হারিয়ে গেলে, এক সময়ে কর্মক্ষেত্রেও গতানুগতিক হয়ে যাবে। তবে তার জন্য প্রযুক্তিকে এড়িয়ে যাওয়ার দরকার নেই। প্রয়োজন শুধু একটু সচেতনতা ও দুই পদ্ধতির মেলবন্ধন।


মডেল: অভিরূপ সেন; ছবি: শুভদীপ সামন্ত; লোকেশন: ভর্দে ভিস্তা চকগড়িয়া

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Artificial Intelligence

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy