বিশ্ব জুড়ে ঘনিয়ে ওঠা এক সঙ্কট ছেয়ে রইল মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের সম্মেলন। অটিজ়ম নিয়ে টানা দু’দিন কথাবার্তা চালিয়ে গেলেন  ইন্ডিয়ান সাইকিয়াট্রিক সোসাইটি এবং রাজ্যের নানা প্রান্তের চিকিৎসকেরা। 

নদিয়ায় কল্যাণীর জওহরলাল নেহরু মেমোরিয়াল মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে (‌জেএনএম) শনি ও রবিবার মনোরোগ বিভাগের বার্ষিক সম্মেলনে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের চিকিৎসকেরা এই বৌদ্ধিক প্রতিবন্ধকতার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। নিজেদের মতামত জানান, মত বিনিময়ও হয়। চিকিৎসকেরা ছাড়াও অটিজ়ম নিয়ে কাজ করা সংগঠনের সক্রিয় সদস্যেরাও উপস্থিত ছিলেন।

চিকিৎসকেরা জানান, নানা কারণে গোটা বিশ্ব জুড়েই অটিস্টিক শিশুর সংখ্যা বেড়ে চলেছে। এর বিরুদ্ধে লড়তে এই ধরনের শিশুদের দ্রুত শনাক্ত করা সবচেয়ে জরুরি বলে মনে করছেন চিকিৎসকেরা। এই ধরনের মানুষেরা সামাজিক যোগাযোগ ঠিক মতো করতে পারে না। অর্থাৎ একটি শিশু যে ভাবে তার দিকে চেয়ে হাসলে হাসে বা ভয় দেখালে কেঁদে ফেলে, হাত নেড়ে টা-টা করতে শেখে, এদের বেশির ভাগই তা সহজাত ভাবে পারে না। এমনকি সোজাসুজি চোখের দিকে চেয়ে কথা শুনতে বা আঙুল তুলে কিছু দেখাতেও পারে না অনেকে। আশপাশের মানুষের কথা বোঝায়  সমস্যার কারণে অনেকেই কথা বলে দেরিতে, অনেকে সারা জীবন বলতেও পারে না। যে কারণে এদের অনেকের যথেষ্ট বুদ্ধিমত্তা বা নানা রকম প্রতিভা থাকলেও সমাজবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। 

চিকিৎসকদের মতে, নানা লক্ষণ দেখে প্রথমেই বিষয়টি চিহ্নিত করা গেলে মোকাবিলা করা অনেক সহজ হয়। রবিবার, সম্মলেনর দ্বিতীয় দিনের শুরুতেই দ্রুত শনাক্তকরণ নিয়ে বিশদ আলোচনা হয়। অটিজ়মের সম্ভাব্য কারণ নিয়েও অনেকটা সময় কথা বলেন আলোচকেরা। 

আধুনিক গবেষণার উল্লেখ করে জেএনএম-এর মনোরোগ বিশেষজ্ঞ কৌস্তভ চক্রবর্তী জানান, অটিজ়মের একটা অন্যতম কারণ হতে পারে প্রসূতির উপরে মানসিক চাপ। গর্ভবতী অবস্থায় পরিবারের বিরূপ আচরণ মনের উপরে যে চাপ তৈরি করে, ভ্রূণের মস্তিষ্কের উপরে তার বিরূপ প্রভাব পড়ে। তার জেরে শিশুর বৌদ্ধিক প্রতিবন্ধকতা তৈরি হতে পারে। আবার অনেকে জিনগত বলেও মনে করেন এই প্রতিবন্ধকতাকে। সে ক্ষেত্রে পারিবারিক ইতিহাসে তার সাক্ষ্য পাওয়া যেতে পারে। বাবা বা মায়ের তরফে জিনগত কোনও সমস্যা চিহ্নিত করা যেতে পারে, আবার না-ও করা যেতে পারে। এই সন্তান থেকেই পারিবারিক ধারায় জিনগত সমস্যা প্রথম তৈরি হল, এমনটা হওয়াও মোটে অসম্ভব নয়।

আরও একটি সম্ভাব্য বিষয় উল্লেখ করছেন বিশেষজ্ঞেরা। তাঁরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, পুরুষ-নারী উভয়েরই এখন বেশি বয়সে বিয়ে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। হয়তো আর্থিক সাচ্ছল্যের খোঁজ পেতে দেরি হওয়াও তার একটি কারণ। কিন্তু বয়স বাড়লে পুরুষ-নারী উভয়েরই জিনের গুণমান কমে যায়। ফলে বেশি বয়সে গর্ভধারণ বিপত্তি ডাকতে পারে। এ ছাড়াও খাদ্যের টক্সিন (বিষাক্ত অংশ) এবং পরিবেশ দূষণের ফলেও গর্ভস্থ ভ্রূণের নানা সমস্যা তৈরি হয়। অতএব প্রসূতিকে দূষণ বা টক্সিন-যুক্ত খাবার থেকে দূরে থাকতে হবে। 

ঘটনা হল, এখনও এমন কোনও প্রমাণ্য ওষুধের সন্ধান মেলেনি যা দিয়ে অটিজ়মের চিকিৎসা করা যেতে পারে। চিকিৎসকেরা বলছেন, কিছু ওষুধ অস্থিরতা কমাতে পারে ঠিকই, কিন্তু সার্বিক ভাবে এই প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে দিতে পারে না। ফলে এখনও পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের থেরাপিই প্রধান হাতিয়ার। এর মধ্যে স্পিচ থেরাপি থেকে অকুপেশনাল থেরাপি— সবই পড়ে। সমাজের রীতিনীতি মেনে ব্যবহার করার কৌশলও এদের একটু-একটু করে আয়ত্ত করানো যায়। তাতে এই শিশুরা সমাজের কাছে অনেকটাই গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠতে পারে, এমনকি মূলস্রোতে মিশেও যেতে পারে।