প্রথম ছ’মাসেই বাচ্চার মুখে আধো বুলি ফোটার কথা। তাই যখন ইরা এক বছরে পা দেওয়ার পরেও ‘মা’ বলতে শিখল না, তার মা চিন্তিত হয়েছিলেন। তবে সকলেই বলেছিল, অনেকেই বেশ বড় বয়সেই কথা বলতে শেখে। পরে অবশ্য কথা বলতে শিখেছিল সে।

আবার রঙিনের বুলি ফুটতে সময় লেগেছিল তিন বছর! কিন্তু সকল বাচ্চাই ইরা বা রঙিন নয়। তাই বাচ্চার কথা না বলতে পারার সমস্যাও সকলের ক্ষেত্রে এক নয়। মনোবিদ ডা. আবির মুখোপাধ্যায় বলছেন, শিশুরা আপনা-আপনিই কথা বলতে শেখে। জন্মের পরে কান্না এবং প্রথম তিন মাস জুড়ে ধীরে ধীরে আশপাশের শব্দের সঙ্গে পরিচিত হতে থাকে তারা। ছ’মাসের পর থেকে স্বরবর্ণের সঙ্গে সঙ্গে ব্যঞ্জনবর্ণ মিলিয়ে কথা বলতে শেখে। যেমন মা, বাবা, দাদা ইত্যাদি। এই সময়টাতেই নিজের নাম ধরে কেউ ডাকলে সাড়া দেওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়। প্রায় দেড় বছরের মধ্যে নিজেদের হাবভাব বোঝাতে পারে তারা। এর পর থেকেই আধো আধো বুলি পরিণত হয় অনর্গল কথায়। বাচ্চার কথা বলতে না পারার সমস্যাকে যদি গোড়া থেকে গুরুত্ব দেওয়া হয়, তা হলে ভবিষ্যতে অনেক কিছুর মোকাবিলা করা যায়।

শিশুর কথা বলতে না পারা বা স্পষ্ট কথা বলার সমস্যাকে সাধারণত ছ’ভাগে ভাগ করা যায়। শুরুতেই বলে নেওয়া দরকার, প্রত্যেকের সমস্যা আলাদা ও বিশেষ কিছু লক্ষণের মাধ্যমে সকলের সমস্যা বিচার করে ফেলা যায় না।

চাইল্ডহুড অ্যাপ্রেক্সিয়া অব স্পিচ (ক্যাস): কথা বলতে গেলে কোনও মেসেজ প্রথমে মুখ থেকে মস্তিষ্কে পৌঁছনো দরকার। মস্তিষ্ক থেকেই বার্তা আসে যে, মুখের মাসল কখন নাড়াচাড়া করতে হবে ও কী ভাবে কথা বলতে হবে। ক্যাস সমস্যাজনিত শিশুরা হতেই পারে, সবটা বুঝতে পারছে এবং কথা বলতেও চাইছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে বলে উঠতে পারছে না!

কোন বয়সে কতখানি?

  • তিন মাস— মুখে আওয়াজ
  • পাঁচ মাস— খিলখিলিয়ে হাসি ও আরও নানা ধ্বনির প্রকাশ
  • ছ’মাস— সহজ শব্দ যেমন মা, বা, দা বলতে পারা
  • এক বছর— বাবা, কাকা, যাব, খাব, নাও জাতীয় শব্দের প্রকাশ
  •  তিন বছর— মোটামুটি ব্যঞ্জনবর্ণ ও যুক্তাক্ষর বলতে পারার 

আপনার তিন বছরের কমবয়সি খুদে যদি বিশেষ করে মাত্র কয়েকটি শব্দই উচ্চারণ করে, দু’টি উচ্চারণের মাঝে বিরতি নেয়, দেরিতে প্রথম কথা বলে, তা হলে সে ক্যাস সমস্যায় পড়তে পারে। আবার তিন বছরের উপরের শিশুদেরও হতে পারে ক্যাস। তখন হয়তো সে একই শব্দ বারবার নানা ভাবে উচ্চারণ করে। বেশি নার্ভাস হয়ে পড়ে। বা কোনও কথা বলার জন্য ঠোঁট, চোয়াল, জিভ বারবার ব্যবহার করে (গ্রোপিং) উচ্চারণ করে।

দিল্লি দখলের লড়াইলোকসভা নির্বাচন ২০১৯ 

ক্যাস সমস্যার মধ্যে পড়লে আঁকা, লেখা জাতীয় ছোট ছোট কাজ বুঝতে, শিখতে দেরি হয়। অনেক দেরিতে ভাষা শেখে। এর জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ দরকার। এমআরআই, সিটি স্ক্যান করানো হতে পারে। আবার সে ভাল করে শুনতে পাচ্ছে কি না, সেটাও যাচাই করা প্রয়োজন।

ডিসারথ্রিয়া: কথা বলার জন্য মুখ, ঠোঁট, জিভ, গলার নানা মাসল ব্যবহৃত হয়। কোনও মাসল দুর্বল থাকলেও কথা বলার সমস্যা হয়। মস্তিষ্ক ক্ষতিগ্রস্ত হলে  পেশিও দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। জন্মের সময়ে কোনও অসুস্থতা বা আঘাত থেকেও হতে পারে এই সমস্যা। ডিসারথ্রিয়ার সমস্যায় শিশু মাম্বল করে। হয় ভীষণ ধীরে কথা বলে, না হয় তার কথা বলার গতি অত্যন্ত দ্রুত হয়। চোয়াল, ঠোঁট, জিভও স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে নাড়াতে পারে না।

চিকিৎসকেরা শিশুর সমস্যা বিচার করে ধীরে এবং স্পষ্ট ভাবে কথা বলতে চেষ্টা করার পরামর্শ দেন। কথা বলার সময়ে অনেক বেশি করে শ্বাস নিলে, জিভ ও ঠোঁট বেশি ব্যবহার করলে ধীরে ধীরে সমস্যা কেটে যেতে পারে।

ওরোফেসিয়াল মায়োফাংশনাল ডিজ়র্ডার: মুখের পেশি ও হাড়ের বেড়ে ওঠায় ব্যাঘাত ঘটলে তা নানা সমস্যার সৃষ্টি করে। সেটাই ওরোফেসিয়াল মায়োফাংশনাল ডিজ়র্ডার বা ওএমডি। অনেক শিশু নাকের পরিবর্তে মুখ দিয়েই শ্বাস-প্রশ্বাসের কাজ চালায়। ‘শ’, ‘স’ বা ‘জ’, ‘জ়’ ঠিক মতো বলতে অসুবিধে হয়। খেতেও সমস্যা থাকে। ঢোঁক গেলার সময়ে ঠোঁট বন্ধ করতেও সমস্যা দেখা দেয়। এগুলি ওএমডি-র লক্ষণ।

শিশু ছ’মাসেরও বেশি সময় ধরে স্টাটার করলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

টনসিলের সাইজ় বা অ্যালার্জি, ন্যাজ়াল প্যাসেজে সমস্যা কিংবা সাকিং ও চিউয়িংয়ের বাজে অভ্যেস থেকে ওএমডি হতে পারে।

স্পিচ সাউন্ড ডিজ়র্ডার: অনেক সময়ে শিশুরা কিছু অক্ষর ভুল শেখে। যেমন ‘পি’, ‘এম’, ‘ডব্লিউ’, ‘জ়েড’, ‘ভি’, ‘থ’ জাতীয় অক্ষর। সাধারণত চার বছরের মধ্যেই শিশুদের সমস্ত অক্ষর স্পষ্ট ভাবে শিখে নেওয়াই স্বাভাবিক। তা না হলে ধরে নেওয়া হয় তার ‘আর্টিকুলেশন ডিজ়র্ডার’ বা ‘ফোনোলজিক্যাল ডিজ়র্ডার’ রয়েছে। আবার অনেক সময়ে শিশুরা অর্ধেক উচ্চারণ করে। যেমন ‘বানানা’ উচ্চারণ করতে গিয়ে শুধু ‘নানা’ বলে বা ‘র‌্যাবিট’ হয়ে যায় ‘ওয়্যাবিট’। তাই কিন্ডারগার্টেন থেকে অন্তত তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত শিশুর কমিউনিকেশন স্কিলের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। এক বার ভুল উচ্চারণ শিখে ফেললে, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তা না শোধরালে ভুলটাই জীবনের অঙ্গ হয়ে যাবে। 

স্টাটারিং: এই সমস্যার কথা অনেকেই জানি। কথা বলার সময়ে তা বাধাপ্রাপ্ত হলে তাকে স্টাটারিং বলে। এখানে তিন রকমের বাধা স্পষ্ট। একটি বাক্য দিয়েই তা বোঝানো যাক।

ব্লক— আমি একটা..... আম চাই।

প্রোলংগেশন— আমি একটা আআআআআআআম চাই।

রিপিটেশন— আমি একটা আ-আ-আ-আ-আম চাই।

আপনার শিশু ছ’মাসেরও বেশি সময় ধরে স্টাটার করলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। চিকিৎসকেরা প্রথমে পরিবারের ইতিহাস জানতে চান। শিশুর মনস্তত্ত্ব খুঁটিয়ে পরীক্ষা করাও দরকারি হয়ে পড়ে। সমীক্ষা বলছে, মেয়েদের চেয়ে ছেলেরাই এই সমস্যায় বেশি পড়ে।

এ ছাড়াও ভয়েস ডিজ়র্ডার, প্রি-স্কুল ল্যাঙ্গোয়েজ ডিজ়র্ডার, লার্নিং ডিজ়েবিলিটি, সিলেক্টিভ মিউটিজ়ম... অনেক ধরনের সমস্যা জড়িয়ে থাকতে পারে। কথা না বলতে পারা, জড়িয়ে যাওয়া, তোতলানো বা গুটিয়ে যাওয়া... সব লক্ষণই পরবর্তী কালে অন্য রোগের ইঙ্গিত বহন করতে পারে। এতে প্রথম থেকেই গুরুত্ব দেওয়া উচিত। প্রয়োজনে শিশু চিকিৎসক, মনোবিদ, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, দন্ত চিকিৎসক, অর্থোডন্টিস, এসএলপি অর্থাৎ স্পিচ ল্যাঙ্গোয়েজ প্যাথোলজিস্টকে দেখানো দরকার। সমস্যা নির্মূল করা সম্ভব কি না, তা হয়তো শুরুতেই বলা যায় না। কিন্তু যত তাড়াতাড়ি চিকিৎসা শুরু করা যায়, শিশুর জন্য তা ততই ভাল। আরও জানিয়ে রাখা দরকার, শুধুই চিকিৎসা নয়, শিশুটিকে বোঝার চেষ্টা করা দরকার। তাকে নকল করে কিংবা দূরে সরিয়ে দিলে সমস্যা বাড়বেই। তা অমানবিকও। চিকিৎসা, কিছু অভ্যেস, নিরন্তর বোঝার চেষ্টা, স্নেহ, মমতা ও ভালবাসাই হয়ে উঠুক শিশুর জড়তা কাটানোর চাবিকাঠি।

মডেল: হিয়া, রোমিত 

ছবি: অমিত দাস

মেকআপ:  সৈকত নন্দী 

হেয়ার: স্বরূপ দাস 

পোশাক (হিয়া): ওয়েস্টসাইড, ক্যামাক স্ট্রিট লোকেশন: লাহা বাড়ি