মা দুর্গার যে মর্তে আসার সময় হয়েছে, পরিবেশের বিভিন্ন চিহ্ন আমাদের সে কথা মনে করিয়ে দেয়। তুলোর মতো মেঘ, ঝলমলে রোদ, কাশফুল। এক কবি-দাদার অমোঘ উক্তি, পুজো আসার আর একটি মোক্ষম চিহ্ন রয়েছে। তা হল, ঘরে ঘরে জ্বর, পেটখারাপ, অসুখবিসুখ। দাদা বলেন, আগমনি জ্বর। পঞ্চমীর দিন যখন পাড়ায় আলো জ্বলবে, তখন হয়তো দেখবেন প্রতিবেশী কাকু আঁধার মুখে ওষুধ হাতে চলেছেন। বলবেন, মেয়েটার পেটের রোগ, কিছু খেতেই পারছে না। বা পুজোর শপিংয়ে বেরোলে বন্ধুদের গ্রুপে ঠিক কেউ না কেউ আইসক্রিম বাদ দেবে, সদ্য জ্বর থেকে উঠেছে। পুজোর আগে রোগের সিজ়ন কেন আসে, তার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মা-ঠাকুমারা বলেন, ‘‘বিশ্বকর্মা পুজোয় হুটোপুটি, পুজোর আগে ত্বকে জেল্লা ফেরাতে এটা-ওটা লেপে বসে থাকা, কেনাকাটি করতে গিয়ে অখাদ্য-কুখাদ্য খাওয়া— তাই শরীর বিগড়োয়।’’ চিকিৎসকেরা অবশ্য দুষছেন এই ঋতুকে। সেপ্টেম্বর-অক্টোবরের মরসুমি রোগ কেন হয় আর কী ভাবে শারদোৎসবে সুস্থ থাকবেন, জানালেন তাঁরা।
জলবাহিত রোগের বাড়বাড়ন্ত কেন?
মেডিসিনের চিকিৎসক অরুণাংশু তালুকদার বললেন, ‘‘কোভিড তো আমাদের সঙ্গে আছেই। তা ছাড়াও প্রতি বছর এই সময়ে (অগস্ট-অক্টোবর) এ রাজ্যে ইনফ্লুয়েঞ্জা, ভাইরাল ইনফেকশন প্রকট হয়। আসলে, এই সময়ের তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা জল ও বাতাসে ভাইরাসের বংশবৃদ্ধির পক্ষে আদর্শ। তাই জলবাহিত ও বায়ুবাহিত নানা রোগের প্রকোপ বাড়ে। আর দোকান-বাজারে ভিড়ভাট্টা এখনই সবচেয়ে বেশি থাকে। ফলে, আপনার ঘাড়ের কাছে কেউ হাঁচলে ভাইরাস চোখ-মুখের ছিদ্রপথে আপনার শরীরে প্রবেশ করবে। এই রোগগুলো তো হাঁচি-কাশির মাধ্যমে ভীষণ তাড়াতাড়ি ছড়ায়। শিশুরা, বয়স্করা, মধুমেহ ও কিডনির সমস্যার রোগীরা, যাঁদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভাল নয়— তাঁরা বেশি ভোগেন। যাঁরা সদ্য কোভিডে ভুগে উঠেছেন, তাঁদেরও এ সব অসুখের সম্ভাবনা থাকে।’’
বর্ষায় নোংরা জল মিশে সংক্রমণের ভয় সবচেয়ে বেশি। তবে খুব গরম বা খুব শীতে জলবাহিত ব্যাকটিরিয়া বা ভাইরাসের বাড়বৃদ্ধি হয় না। এই সময়টাই তাদের পক্ষে উপযুক্ত। তাই এ সময়ে ভাইরাল ফিভার, ভাইরাসের কারণে পেটের সমস্যা, টাইফয়েড বা ডিসেন্ট্রি বেশি হয়। অপরিষ্কার পাত্রে জল বা খাবার খেলে, অপরিশোধিত জলে রান্না খাবার খেলে, আইসক্রিমে ব্যবহৃত জল দূষিত হলে বা কাটা ফল খেলে এমন সংক্রমণ হয়। ভাইরাসের কারণে পেটের অসুখ হলে লবণ-খনিজযুক্ত তরল খাওয়াতে হয়, ব্যাকটিরিয়াল ইনফেকশন হলে অ্যান্টিবায়োটিক চলবে।
সংক্রমণ থেকে বাঁচতে
‘‘বর্ষা ও শরতের এই সংযোগকালে জলবাহিত রোগ টাইফয়েড, ডায়রিয়া হতে দেখা যায়। জলবাহিত জীবাণুর কারণে ত্বকের সংক্রমণ আর্দ্র ঋতুতে হয় ঠিকই, শীতের দিনে স্নান বাদ দিলেও তা হতে পারে। বারবার ডিটারজেন্টের সংস্পর্শে এলে নখে সংক্রমণ হয়। আবার তা দূষিত জল থেকেও হতে পারে। এগুলো সবই ছত্রাকজনিত সংক্রমণ। বর্ষার জমা জল থেকেও এই সমস্যা দেখা দিতে পারে। জমা জলে প্রোটোজ়োয়া থাকলে তার থেকেও সংক্রমণ হতে পারে। এর ফলে চুলকায়, ত্বকে ক্ষত সৃষ্টি হয়। যথা সময়ে অ্যান্টিফাঙ্গাল ক্রিম না লাগালে সমস্যা বাড়বে,’’ জানালেন জেনারেল ফিজ়িশিয়ান সুবীর কুমার মণ্ডল।
পেটের অসুখ এড়াতে পানীয় জল ব্যবহারের সময়ে বিশেষ সতর্ক হতে বলছেন তিনি। যে টিউবওয়েল ডুবে গিয়েছে, যে কলের মুখ খোলা, সেগুলি ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকতে পরামর্শ দিচ্ছেন। তাঁর কথায়, ‘‘টিউবওয়েল নষ্ট হয়ে যাওয়ার পর তার পাশে আর একটা টিউবওয়েল বসানো হয়। পুরনো পাইপটা সিমেন্ট দিয়ে সিল করে দিতেই হবে। তা না হলে, জলে সংক্রমণের সমস্যা হবে।’’
ছোটখাটো সতর্কতাই বড় আয়ুধ
এ সময়ে ভিড় এড়িয়ে চলা, সার্জিক্যাল মাস্ক পরা, বাইরে থেকে এসে সাবান দিয়ে মুখ-হাত ধোয়া জরুরি। ডা. তালুকদারের পরামর্শ, যে তাপমাত্রায় আপনি আছেন, দুম করে তার চেয়ে পাঁচ ডিগ্রি কমবেশি তাপমাত্রায় ঢুকে পড়বেন না। বাইরের ও ভিতরের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরের মধ্যে মাঝামাঝি তাপমাত্রার কোনও ঘরে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিন। জুতো খুলুন, একটু বসুন, জল খান। এতে ধীরে ধীরে শরীর তাপমাত্রার হ্রাসবৃদ্ধির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেবে। না হলে হঠাৎ এসি ঘরে ঢুকলে ঠান্ডা লেগে যেতেই পারে।
শপিং করতে গেলে বা পুজোর সময়ে খাওয়াদাওয়া নিয়েও সজাগ হন। রেস্তরাঁ বা খোলা জায়গায় বসে খাওয়ার চেয়ে খাবার প্যাকেট করে নিয়ে এসে গরম করে বাড়ির প্লেট-চামচ ব্যবহার করে খাওয়াই ভাল। ভোগও প্যাকেট করে বাড়িতে নিয়ে এসে খাওয়া যেতেই পারে।
বাইরে বেরোলে তো বটেই, বাড়িতে লোকজন এলেও মাস্ক খুলবেন না। প্রতিষেধকের দুটো ডোজ় সম্পূর্ণ হয়ে গেলেও সাবধান। ডা. তালুকদার বললেন, ‘‘টিকা দেওয়া থাকলেও করোনা হতে পারে। তবে তীব্রতা হয়তো কমবে। টিকা দেওয়ার অর্থ রক্তের মধ্যে বর্ম পরিয়ে দেওয়া। তাতে তো নাক-মুখ সুরক্ষিত হয় না। তার জন্য মাস্কই ভরসা।’’
বৃষ্টিতে ভিজলে তো বটেই, সব সময়েই গরম জলে স্নান করা উচিত। এতে পরিষ্কার বেশি হয়। দেহে যে ব্যাকটিরিয়া-ভাইরাস থাকে সেগুলি বেরিয়ে যায়।
যাঁরা করোনা থেকে সেরে উঠেছেন, তাঁরা একটু শরীরের প্রতি যত্নবান থাকুন। এই দিনগুলোয় ঘুরতে বেরিয়ে ক্লান্ত বোধ করলে ফিরে এসে বিশ্রাম নিন। তা বলে শুয়েবসে থাকাও ঠিক নয়। ডা. মণ্ডল বললেন, ‘‘কোভিডের দশ দিন পরেই স্বাভাবিক জীবন শুরু করা উচিত। দিনে অন্তত এক বার সিঁড়ি ভাঙুন। তাতে রক্ত সঞ্চালন বাড়বে। ফুসফুস কর্মক্ষমতা ফিরে পাবে।’’ তবে, সবটাই শরীর কী অবস্থায় আছে, তা বুঝেশুনে করা উচিত। ডা. তালুকদারের মতে, এ রোগটাকে আমরা এখনও পুরোপুরি চিনে উঠতে পারিনি। তাই স্বাস্থ্যবিধি মেনে সাবধানে থাকুন। পুজো নিশ্চয়ই ভাল কাটবে।
ছবি: অমিত দাস