Advertisement
E-Paper

নিখরচায় অস্ত্রোপচার, পাশে ‘শিশু সাথী’

জন্ম থেকেই হৃদযন্ত্রের সমস্যা। তাই একটু নড়াচড়া করলেই হাঁফিয়ে উঠত ছোট্ট মেয়েটি। ধীরে ধীরে নীল হয়ে যাচ্ছিল হাতের পাতাও। চোখের সামনে দিদির বছর দু’য়েকের মেয়ে রিয়াকে এ ভাবে কষ্ট পেতে দেখে মনভার হয়ে যেত দুবরাজপুর গার্লসের একাদশ শ্রেণির ছাত্রী শিপ্রার।

দয়াল সেনগুপ্ত

শেষ আপডেট: ০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৫ ০১:৪৬

জন্ম থেকেই হৃদযন্ত্রের সমস্যা। তাই একটু নড়াচড়া করলেই হাঁফিয়ে উঠত ছোট্ট মেয়েটি। ধীরে ধীরে নীল হয়ে যাচ্ছিল হাতের পাতাও। চোখের সামনে দিদির বছর দু’য়েকের মেয়ে রিয়াকে এ ভাবে কষ্ট পেতে দেখে মনভার হয়ে যেত দুবরাজপুর গার্লসের একাদশ শ্রেণির ছাত্রী শিপ্রার। কিন্তু, অস্ত্রোপচারের জন্য প্রয়োজনীয় খরচ জোগাড় করা তার পরিবারের পক্ষে সম্ভব ছিল না।

শিপ্রার দুশ্চিন্তা দূর করেছে জাতীয় স্বাস্থ্য মিশনের আওতাধীন ‘শিশু সাথী’ প্রকল্প। ওই প্রকল্পে সম্পূর্ণ বিনা খরচে গত বুধবার দুর্গাপুরের দ্য মিশন হাসপাতালে রিয়ার হৃদয়ে সফল অস্ত্রোপচার হয়েছে। আর তার পিছনে বড় ভূমিকা নিয়েছে জেলা চাইল্ড লাইন। চাইল্ড লাইনের শিবিরের প্রথম এমন একটি প্রকল্পের কথা জানতে পারে শিপ্রা। প্রকল্পের আধিকারিকদের সঙ্গে যোগাযোগের পরেই মেলে অস্ত্রোপচারের সুযোগ। শিপ্রার ওই অভিজ্ঞতা অবশ্য সরকারি প্রকল্পটির প্রচার নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। অভিযোগ, শুধু মাত্র সঠিক প্রচারের অভাবেই এমন নানা সরকারি সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন সাধারণ মানুষ।

ঘটনাও হল, বিনা খরচে এত বড় অস্ত্রপচার যে সম্ভব তা জানাই হতো না, যদি না মাস দু’য়েক আগে স্কুলে চাইল্ড লাইন আয়োজিত সচেতনতা শিবিরে থাকত শিপ্রা। সেখানেই সে জেনেছিল, ০-১৮ বছর বয়সী কেউ কোনও সমস্যায় পড়লে তার পাশে কী ভাবে দাঁড়াচ্ছে সংস্থা। এমনকী, নিখরচায় অস্ত্রোপচারের সুযোগও পেতে পারে, সেটাও তারা সে দিন প্রথম জেনেছিল। তাই শিবির শেষে দৌড়ে গিয়ে চাইল্ড লাইনের সোমা মিত্রকে নিজের বোনঝির কথা জানিয়েছিল শিপ্রা। তার পর সোমাদেবীই ‘শিশু সাথী’ প্রকল্পের মাধ্যমে ছোট্ট রিয়ার অস্ত্রোপচারের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। শিপ্রা বলছে, ‘‘সোমাদিরা স্কুলে না এলে এমন একটি প্রকল্পের কথা জানতেই পারতাম না। এমন একটি জটিল ও ব্যয়বহুল অস্ত্রোপচার করানোর সামর্থ্য আমার পরিবারের ছিল না। চাইল্ড লাইনের দিদিকে অনেক ধন্যবাদ।’’ সোমাদেবী অবশ্য জানান, তাঁরা সংস্থার পক্ষ থেকে শুধুমাত্র সেতুবন্ধনের কাজটাই করেছেন। এ দিকে, মিশন হাসপাতাল সূত্রের খবর, শিশুটি বর্তমানে ভাল আছে। ওর হৃদয়ে ‘টস’ (টিওএস) অস্ত্রোপচার অর্থাৎ সার্জিকাল কারেকশন করা হয়েছে। দিন দু’য়েক পরেই শিশুটিকে ছুটি দেওয়া হবে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, পেশায় অলঙ্কারের দোকানের কর্মী রতন দাসের বাড়ি দুবরাজপুরের আচার্যপাড়ায়। বছর তিনেক আগে রতনবাবুর বড় মেয়ে রিম্পার সঙ্গে বিয়ে হয় বর্ধমানের উখড়ার কুমারডিহির ধরম দাসের। জন্মের পরেই দম্পতি জানতে পারেন, তাঁদের মেয়ের মলদ্বার বা পায়ুছিদ্রই নেই। ছ’দিনের মাথায় শিশুটির পেটে ফুটো করে বিকল্প মলদ্বার বানিয়ে দিয়েছিল কলকাতার এনআরএস হাসপাতালের চিকিৎসকেরা। বড় হলে অস্ত্রোপ্রচার করে শিশুটির মলদ্বার তৈরি করে দেওয়া যাবে এ কথা জানানোর পাশাপাশি আরও একটা বিপদের কথা শুনিয়ে রেখেছিল হাসপাতাল। হৃদযন্ত্রেও সমস্যা আছে শিশুটির। প্রথমে হৃদযন্ত্রের অস্ত্রোপচার করাতে হবে। তার পরেই মলদ্বার তৈরি করে দেওয়া সম্ভব। এতেই মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছিল রিম্পার মাথায়। ভেঙে পড়েছিলেন রিম্পার বাবা, রতনবাবু এবং মা শিবাদেবীও।

০-১৮ বছর বয়সী ছেলেমেয়েদের জন্য বিনা পারিশ্রমিকে কার্ডিয়াক সার্জারি।

সম্পূর্ণ খরচ মেটাবে রাজ্য সরকার।

সরকারি স্কুলে স্কুলে মেডিক্যাল টেস্টের সুযোগ।

জেলার মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক বা নোডাল অফিসারের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাবে।

এ সময় মেয়ের শ্বশুরবাড়ির সঙ্গে কিছু সমস্যাও তৈরি হয় রতনবাবুর পরিবারের। বর্তমানে অধিকাংশ সময় দুবরাজপুরে বাপের বাড়িতেই থাকেন রিম্পা। ছোট্ট মেয়েটিকে নিয়ে এমন করুণ অবস্থার জন্য দুশ্চিন্তায় ভুগত মাসী শিপ্রাও। মেয়ের সফল অস্ত্রপচারের পরে রিম্পা বলছেন, ‘‘সবটাই সম্ভব হল শিপ্রার জন্য। ও-ই এসে চাইল্ড লাইনের দেওয়া ১০৯৮-এ নম্বরে ফোন করে সবটা জানাতে বলেছিল। সে ভাবেই আমরা এগিয়ে ছিলাম।’’ মেয়ে সুস্থ হওয়ায় খুশি ধরমবাবুও। তিনি বলেন, ‘‘আমার আর্থিক সামর্থ্য ছিল না। মেয়ে সুস্থ হয়ে উঠেছে। ভাল লাগছে।’’ অন্য দিকে, শিপ্রা জানাচ্ছে, নিখরচায় এমন অস্ত্রোপ্রচার করা সম্ভব, এ নিয়ে আরও প্রচার দরকার। ঠিক ভাবে প্রকল্পের কথা জানতে পারলে তাঁদের মতো বহু পরিবারই উপকৃত হবে।

প্রকল্প নিয়ে প্রচারে ঘাটতির অভিযোগ অবশ্য মানছেন না প্রশাসনের কর্তারা। জাতীয় স্বাস্থ্য মিশনের জেলা প্রোগ্রাম ম্যানেজার বিশ্বনাথ মিত্র জানান, স্কুল হেল্‌থের মাধ্যমে স্কুলে স্কুলে, অঙ্গনওয়াড়িগুলিতে বিভিন্ন রোগ নিয়ে প্রচার অভিযান চলছে। সেখান থেকেই কোনও শিশুর কী ধরনের সমস্যা রয়েছে, তা দেখা হয়। তার পরে প্রতিটি বিপএইচসি-তে থাকা ‘অন্বেষা ক্লিনিকে’ ওই শিশুদের পাঠানো হয়। সেখানে চিকিৎসকেরা দেখার পরে প্রয়োজনে রেফার করেন জেলা হাসপাতালের ‘অনুভব ক্লিনিকে’। সেখান থেকে জেলার স্বাস্থ্য দফতরের নির্দিষ্ট সেলের মাধ্যমে শিশুটিকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসার জন্য সরকারি বা সরকার মনোনীত বেসরকারি হাসপাতালে পাঠানো হয়। হৃদযন্ত্রের কোনও সমস্যা থাকলে পাঠানো হয় দুর্গাপুর মিশন হাসপাতালে। বিশ্বনাথবাবুর দাবি, ‘‘জেলায় ইতিমধ্যেই ৮০০ জন এমন শিশুকে চিহ্নিত করা হয়েছে। ৫০০ জন শিশুর অস্ত্রোপচার হয়েছে। প্রচার না থাকলে, এটা কী ভাবে সম্ভব? তবে, যে কোনও ব্যক্তি বা স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা কোনও শিশুকে খুঁজে বের করতেই পারেন।’’

এ নিয়ে প্রচারে ঘাটতির কথা মানতে নারাজ জেলা মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক হিমাদ্রি আরিও। তাঁর বক্তব্য, ‘‘দুবরাজপুরের শিশুটির মতো এমন অনেকে বাদ থেকে যেতে পারে। তবে, এত সংখ্যক শিশু যখন চিহ্নিত হয়েছে এবং চিকিৎসা হয়েছে, তা হলে প্রচার হয়নি বা কেউ জানেন না, এমনটা বলা যাচ্ছে না। তবে প্রচারে যদি কোথাও খামতি থাকে সেটাও দেখা হবে।”

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy