চৌকিদার চোর হ্যায়— লোকসভা ভোটের আগে এই প্রচারই তেড়েফুঁড়ে করেছিলেন রাহুল গাঁধী। ভোট-পর্বের মাঝেও বলেছিলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ভাবমূর্তি তিনি ‘ধূলিসাৎ’ করে দিয়েছেন। কিন্তু ভোটে হেরে যাওয়ার পর সেই রাহুলই আক্ষেপ করেছেন, মোদীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে দলের কাউকে পাশে পাননি। প্রিয়ঙ্কা গাঁধী বঢরাও বলেন, একাই লড়ে গিয়েছেন তাঁর ভাই।

ভোটের তিন মাস পেরিয়েছে। রাহুলের বদলে সনিয়া গাঁধী এখন দলের অন্তর্বর্তী সভাপতি। কংগ্রেসেরই কিছু নেতা প্রকাশ্যে শুরু করলেন, মোদীকে সব সময় ‘খলনায়ক’ বলে কোনও লাভ নেই। তাঁর কাজের পুরোটাই নেতিবাচক নয়। বরং যে কাজের মাধ্যমে তিনি মানুষের মন জয় করেছেন, তার প্রশংসাও করা উচিত।

শুরুটা করেন জয়রাম রমেশ। গত কাল এক বই প্রকাশ অনুষ্ঠানে বলেন, ‘‘মোদী প্রশাসনের মডেল পুরোটাই নেতিবাচক নয়। অতীতে তাঁর প্রকল্প নিয়ে অনেক উপহাস করেছি আমরা। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, শুধু উজ্জ্বলা যোজনাতেই তিনি কোটি কোটি মহিলার মন জয় করেছেন। আমরা কৃষকদের দুর্দশার কথা বলেছি, কিন্তু তাঁরা মোদীকে দায়ী করছেন না। সব সময় মোদীকে খলনায়ক চিহ্নিত করে লাভ নেই। তাঁর কাজের স্বীকৃতি না-দিলে তাঁর মোকাবিলা করা যাবে না।’’

রাত পোহাতে আজ সকালে সুর মেলালেন অভিষেক মনু সিঙ্ঘভি। সিবিআই হেফাজতে থাকা পি চিদম্বরমের আইনজীবী এই কংগ্রেস নেতা বললেন, ‘‘আমি সব সময় বলেছি, মোদীকে খলনায়ক দেখানোটা ভুল। একতরফা বিরোধ করলে তাঁরই সুবিধে হবে। কাজ ভাল বা খারাপ হতে পারে। ব্যক্তিটি নয়, কাজের নিরিখেই হওয়া উচিত মূল্যায়ন। উজ্জ্বলা অবশ্যই অন্যতম ভাল প্রকল্প।’’

সুর জুড়লেন শশী তারুরও, ‘‘ছ’বছর ধরে বলছি, নরেন্দ্র মোদীর ঠিক কাজের প্রশংসা হওয়া উচিত। তাতে যখন তিনি ভুল করবেন, তখন সমালোচনা করলে আমাদেরই বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়বে।’’ একই বক্তব্যের উল্টো পিঠ প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়ের কন্যা শর্মিষ্ঠার মন্তব্যে। তাঁর নিশানা মোদী। বলেছেন, ‘‘দেশ গঠন একটি নিরন্তর প্রক্রিয়া। মোদী ও তাঁর টিমেরও এটা বোঝা দরকার। শুধু নেহরুকে দায়ী না-করে, কংগ্রেসের অবদান কী, সেটা বুঝতে হবে। সমালোচনা নীতির উপরেই হওয়া উচিত, ব্যক্তিকেন্দ্রিক নয়।’’

একের পর এক কংগ্রেসের নেতার একই ধরনের মন্তব্যের পর স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠছে, হঠাৎ এখন কেন?

এআইসিসি-র মঞ্চ থেকে মণীশ তিওয়ারি বলেন, ‘‘যে মহানুভবেরা এ সব মন্তব্য করছেন, তাঁরাই বলতে পারবেন কেন করছেন। কংগ্রেসের অবস্থান হল, দেশ জটিল সঙ্কটে, অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়ছে।’’ কিন্তু দলের অনেকে মনে করছেন, চিদম্বরমের মতো পোড় খাওয়া নেতা গ্রেফতার হওয়ায় কংগ্রেসের অনেকের আত্মবিশ্বাস টলে গিয়েছে। ভয় পেতে শুরু করেছেন তাঁরা। সে কারণেই হঠাৎ এই ‘বোধোদয়’ বা ‘ব্রহ্মজ্ঞান’-এর উদয়। এত দিন যে-কথা দলের ভিতরে বলতেন, সেটিই বাইরে বলতে শুরু করেছেন। বিশেষ করে রাহুল যখন আর নেতৃত্বে নেই। 

রাহুল অবশ্য আজও অর্থনীতির বেহাল দশা নিয়ে টুইট বোঝাতে চেয়েছেন, ভোটের আগে যা বলেছিলেন, এখন সত্য প্রমাণিত হচ্ছে। জন্মাষ্টমীর শুভেচ্ছা বার্তা দিয়ে সনিয়াও ফের বলেন, ‘‘শ্রীকৃষ্ণই বলেছিলেন, যখনই অধর্ম ও অন্যায়ের অন্ধকার ঘনায়, তখনই ন্যায়ের জন্য লড়াই করা কর্তব্য। প্রতিকূল পরিস্থিতি পরীক্ষা নেয়। আদর্শে যিনি অটল থাকেন, তাঁরই জয় হয়।’’

তবে একাধিক কংগ্রেস নেতার আচমকা সুর বদলে খুশি বিজেপি। দলের নেতা অমিত মালব্য বলেন, ‘‘সনিয়া গাঁধীর পারিষদদের উপর আইনের হাত পৌঁছতেই কংগ্রেসের অন্য নেতাদের উপর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। চিদম্বরমের আইনজীবীও এখন হঠাৎ প্রধানমন্ত্রীর প্রশস্তি শুরু করেছেন।’’