জলে, স্থলে, আকাশে হয়েই চলেছে। হবে-হবে করলেও চেনা অর্থে ধরলে মহাকাশে এখনও কোনও যুদ্ধ হয়নি। তবে দশকের পর দশক ধরে চলছে তার প্রস্তুতি। এবং সেটাই হয়ে দাঁড়িয়েছে একটা অন্য ধরনের লড়াই। সেটা হল মহাকাশে যুদ্ধ হলে তার জন্য কে কতটা প্রস্তুত থাকতে পারে। যদিও নামের দিক দিয়ে এটাকে যুদ্ধমুখী কোনও চেষ্টা না বলে প্রতিরক্ষা-প্রয়াস বলেই তুলে ধরছে বিভিন্ন দেশ। এ পি জে আব্দুল কালাম বলতেন, শক্তিই শক্তিকে মর্যাদা দেয়, দুর্বলকে নয়। সেই পথে হেঁটেই ভারত যেমন কক্ষপথে থাকা উপগ্রহকে ধ্বংস করে মহাকাশে নিজের শক্তির প্রমাণ দিল আজ। কিন্তু এর পিছনের বার্তাটি স্পষ্ট, কোনও উন্মাদ দেশ বা গোষ্ঠী যদি উপগ্রহ পাঠিয়ে ক্ষতি করতে চায়, তবে ভারত মাটি থেকে ‘অ্যান্টি-স্যাটেলাইট তথা এ-স্যাট’ ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে তিন মিনিটের মধ্যেই তা গুঁড়িয়ে দিতে পারে। বিশ্বের আর মাত্র তিনটি দেশ, আমেরিকা, রাশিয়া ও চিন এই ক্ষমতা ধরে। 

মহাকাশ সেনা

মহাকাশ যুদ্ধের প্রস্তুতিতে বিশ্বের বাকি সব দেশের চেয়ে বেশ কয়েক কদম এগিয়ে থাকতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আলাদা করে মহাকাশ-সেনা তথা ‘স্পেস ফোর্স’ গড়ার তোড়জোড় চালাচ্ছেন। এখনও পর্যন্ত নাসা ও অন্যান্য সংস্থার সহযোগিতায় মার্কিন বায়ুসেনাই মহাকাশ প্রতিরক্ষার বিষয়টি সামলায়। ট্রাম্পের চেষ্টা সফল হবে কি না তা সময়ই বলবে। এর আগে ১৯৮৩ সালে আর এক মার্কিন প্রেসিডেন্ট  রোনাল্ড রেগন এমনই এক উচ্চাকাঙ্ক্ষী ভাবনার কথা ঘোষণা করেছিলেন। তার ভিত্তিতে ১৯৮৪-তে শুরু হয় স্ট্র্যাটেজিক ডিফেন্স ইনিশিয়েটিভ (এসডিআই)। 

স্টার ওয়ার্স

ঠান্ডা যুদ্ধের শেষে আমেরিকা ও রাশিয়া তখন পরমাণু অস্ত্রের ভাণ্ডার কমিয়ে আনছে ম্যাড (মিউচুয়াল অ্যাশিওর্ড ডেসট্রাকশন) চুক্তি মেনে। কিন্তু রেগন মনে করলেন, এটা আত্মঘাতী। তিনি চাইলেন এমন কোনও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যেখানে পরমাণু অস্ত্রের প্রয়োজনটাই ফুরিয়ে যায়। সেই দিশায় কাজ শুরু করে এসডিআই। যুদ্ধের অনেক রকম সম্ভাব্য পথ নিয়ে শুরু হয় গবেষণা। যেমন লেজার। এই রশ্মি দিয়েই নিশানাকে পুড়িয়ে দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু দীর্ঘ গবেষণায় দেখা যায়, পুড়িয়ে দেওয়ার মতো শক্তিশালী রশ্মি তৈরির জন্য ভারী সরঞ্জাম মহাকাশে বা রণক্ষেত্রে নিয়ে যাওয়াই সম্ভব নয়। যদিও তত দিনে পর্দার ‘স্টার ওয়ার্স’-এর দৌলতে এমন লেজার যুদ্ধ, গ্রহতারা বা মহাকাশযান ধ্বংস করা, রশ্মি-তরোয়াল নিয়ে সম্মুখ সমর— রীতিমতো চেনা হয়ে গিয়েছে গোটা বিশ্বের। সময় যত গড়াতে থাকে, তত দেখা যায়, এসডিআইয়ের ভাবনাগুলি বাস্তবায়নের জন্য আরও কয়েক দশকের গবেষণা প্রয়োজন। আর কতগুলির বাস্তবায়ন সম্ভবই নয়। দেশে সমালোচনা শুরু হয় প্রকল্পটির।  বরাদ্দ কমতে কমতে শেষে ১৯৯৩-এ বন্ধ হয়ে যায় রেগনের সাধের প্রকল্প।

দিল্লি দখলের লড়াইলোকসভা নির্বাচন ২০১৯ 

লেজারে লড়াই

মহাকাশ যুদ্ধের প্রস্তুতি অবশ্য চলতেই থাকে। যার সর্বশেষে সম্ভাব্য রূপটি হল ট্রাম্পের ‘স্পেস ফোর্স। মহাকাশে কোনও উপগ্রহকে ধ্বংস করাটাকে বলা যেতে পারে একটা মোটা দাগের ব্যাপার। পৃথিবীর বাইরে টক্কর কিন্তু সমানে চলেছে। এই লেজার রশ্মি ব্যবহার করে শত্রুদেশের উপগ্রহের নজর ধাঁধিয়ে দেওয়া বা অন্ধ করে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। অভিযোগ, চিন ও ইরানই এটা করেছে আমেরিকার উপরে। এটাও কি এক ধরনের যুদ্ধ নয়?

সাইবার যুদ্ধ

এ ছাড়াও সাইবার যুদ্ধ ও আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের টক্কর তো চলছেই। এখন ছোট্ট একটা ঘরে বসেই মাউস আর কি-বোর্ড নেড়েচেড়ে বিগড়ে দেওয়া যায় কোনও বিশাল নেটওয়ার্ক। পৃথিবীর এক প্রান্তে বসে লেখা কোড বা ‘ম্যালওয়ার’-এর কারণে ইরানের পরমাণু জ্বালানি তৈরির সেন্ট্রিফিউজ এত জোরে 

ঘুরতে শুরু করেছিল যে, থামানোর পরে আর সেগুলিকে সারানোই যায়নি। মহাকাশের কোনও উপগ্রহকেও বিগড়ে দেওয়াটা অসম্ভব নয় এখন। হ্যাক তো মাঝেমধ্যেই হচ্ছে। এটা যুদ্ধের চেহারা নিতে পারে যে কোনও সময়।             

যোদ্ধা উপগ্রহ

জেট ফাইটারের মতো অভিমুখ বদলের কসরত করতে পারে এমন সামরিক উপগ্রহ ‘পলিয়ট’ নিয়ে রাশিয়া কাজ করে চলেছে সেই ১৯৬৩ সাল থেকে। ১৯৮৪ সালে তাদের এমনই এক উপগ্রহের গতিবিধি নজর কেড়েছিল সংবাদমাধ্যমের। কক্ষপথ পাল্টে নানা রকম কাজকর্ম করতে পারে, অনেকগুলি নিশানার ক্ষতি করতে পারে, ‘শিজিয়ান সিরিজ’-এর এমন উপগ্রহ নিয়ে কাজ করে চলেছে চিন। ২০০৭ সালে তারা মাটি থেকে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে নিজেদের একটি আবহাওয়া উপগ্রহ ধ্বংস করেছে নিজের সামরিক ক্ষমতার প্রমাণ দিতে। ৮৬৫ কিমি উচ্চতায় সেকেন্ডে ৮০০০ মিটার বেগে ছুটো চলা ওই উপগ্রহ লাখ দেড়েক টুকরো হয়ে মাটিতে এসে পড়েছিল। ২০১৫ সালে রাশিয়াও ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে কৃত্রিম উপগ্রহকে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। আপাতত নিশানাবস্তু নিজের দেশের। কাল যে অন্য দেশের হবে না, তার নিশ্চয়তা কোথায়?    

শান্তির নামে

অনেকে তবু মনে করছেন, মহাকাশে যুদ্ধটা হয়তো শেষ পর্যন্ত হবে না। কারণ চাঁদে ও মহাকাশে কোনও গণবিধ্বংসী অস্ত্র নিয়ে যাওয়া চলবে না— এই মর্মে আন্তর্জাতিক চুক্তি রয়েছে। একে রক্ষাকবচ বলে মনে করেন তাঁরা। কিন্তু ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা (ইএসএ)-র প্রধান জান ওয়নার বলছেন, ‘‘সামরিক উদ্দেশ্যে অনেক কিছুই করা যায় শান্তির নামে।’’ তাঁর মতে চিন ও রাশিয়ার ওই কক্ষ আর পথ পাল্টাতে সক্ষম উপগ্রহগুলির উদ্দেশ্য আসলে সামরিক। লিখিত ভাবে ওয়নারদের ইএসএ শুধুমাত্র শান্তিপূর্ণ কোনও লক্ষ্যেই কাজ করতে পারে। তারা এখন মহাকাশের গভীরে বিকল উপগ্রহ তথা ‘মহাকাশ-বর্জ্য’ কী ভাবে নির্মূল করা যায়, সেই গবেষণা চালাচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, মৃত উপগ্রহকে যা নিশানা করতে পারে, তা তো জীবিত উপগ্রহকেও বিকল বা ধ্বংস করতে পারবে! ফলে সেগুলিকে যে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হবে না তার নিশ্চয়তা কী?

যুদ্ধ-জিগির

এর ফলে ভারতীয় প্রতিরক্ষা গবেষণা কেন্দ্র ডিআরডিও আজ যে ‘শক্তি’ পরীক্ষা চালাল তা নিয়ে প্রতিবেশী পাকিস্তান বা চিনে প্রতিক্রিয়া হতে বাধ্য। ভারতেও রাজনৈতিক স্বার্থে ভোটের মুখে কেউ কেউ বলছেন, সন্ত্রাসের আঁতুড়ঘর পাকিস্তানকে সমঝে দেওয়া গেল। অত্যুৎসাহী এক নেতা এমনও বলছেন, এটা যথেষ্ট নয়। পাকিস্তানকে শিক্ষা দিতে আরও প্রত্যক্ষ, ধরাছোঁয়া- ও দেখা যায়, এমন আঘাত হানা প্রয়োজন। সব মিলিয়ে একটা বিষয় স্পষ্ট, খাতায় কলমে মহাকাশে যু্দ্ধ এখনও হয়নি। কিন্তু সেই যুদ্ধের প্রস্তুতির যুদ্ধটাও কম বিপজ্জনক নয়।

একটাই পৃথিবী

বিশেষ করে আমাদের বসবাসের এক মাত্র আশ্রয় এই পৃথিবীর পক্ষে। চিন বা ভারত যে উপগ্রহ ধ্বংস করেছে, সেগুলি ছিল তুলনায় পৃথিবীর কাছে। তাই ধ্বংসের পর টুকরোগুলি কয়েক দিনের মধ্যে ছাই হয়ে পৃথিবীতে এসে পড়েছে ও পড়বে। কিন্ত গভীর মহাকাশে বর্জ্যের অজস্র টুকরো ধারাবাহিক সংঘর্ষের জন্ম দিতে পারে। পৃথিবীর চার পাশে ছোট-

বড় বর্জ্যের বলয় তৈরি হওয়ারও আশঙ্কা থাকছে। কারণ, মহাকাশে বর্জ্য জমানো বন্ধে কোনও আন্তর্জাতিক চুক্তি বা বিধি নেই। এটা নিয়েও বিপদের মেঘ জমছে।