সুদূর অন্তরীক্ষে খোঁজ মিলল ‘অলকানন্দা’র।
মহাশূন্যে নদী! না, অলকানন্দা প্রায় ১২০০ কোটি আলোকবর্ষ দূরে থাকা সুষম গঠনের এক অতিকায় সর্পিল ছায়াপথ। সম্প্রতি ‘নাসা’র জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের চোখে তার অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েছেন পুণের ‘টাটা ইনস্টিটিউট অব ফান্ডামেন্টাল রিসার্চ’-এর অধীনস্থ ‘সেন্টার ফর রেডিয়ো অ্যাস্ট্রোফিজিক্স’-এর দুই গবেষক রাশি জৈন এবং যোগেশ ওয়াডকর। আমাদের সৌরজগৎ যে ছায়াপথের অংশ, সেই ‘আকাশগঙ্গা’-র সঙ্গে আশ্চর্যজনক মিল রয়েছে অলকানন্দার, জানিয়েছেন তাঁরা।
ছায়াপথটির আবিষ্কার অন্য দিক দিয়েও তাৎপর্যপূর্ণ। প্রথমত, এত দূরের কোনও ছায়াপথের অস্তিত্ব পাওয়া সহজ নয়। অলকানন্দা থেকে নির্গত আলো পৃথিবীতে পৌঁছতেই সময় নেয় ১২০০ কোটি বছর। এই দূরত্ব কল্পনা করাও কষ্টকর। এ পর্যন্ত হাতেগোনা কয়েকটি এমন ছায়াপথের সন্ধান মিলেছে। তবে, বেশি গুরুত্বপূর্ণ হল এর সৃষ্টিকাল। গবেষকদের দাবি, এই ছায়াপথ জন্মানোর সময়ে ব্রহ্মাণ্ডের বয়স ছিল মাত্র দেড়শো কোটি বছর। ব্রহ্মাণ্ডের নিতান্ত নবীন অবস্থায় যে এমন জটিল, সুষম গঠনের অতিকায় ছায়াপথের সৃষ্টি হয়েছিল, তা আগে জানা ছিল না।
শুধু চেহারায় নয়, কার্যকারিতা বিচারে অলকানন্দাকে ‘কসমিক পাওয়ারহাউস’ বললে অত্যুক্তি হয় না। এই ছায়াপথে যত নক্ষত্র রয়েছে, তার মিলিত ভর সূর্যের ১০০০ কোটি গুণ। নতুন নক্ষত্র তৈরির হারেও তা অনেক এগিয়ে আকাশগঙ্গার চেয়ে। অলকানন্দা প্রতি বছরে প্রায় ৬৪ সৌরভরের নক্ষত্র তৈরি করে, যা আকাশগঙ্গার চেয়ে ২০-৩০ গুণ বেশি। তবে অলকানন্দার সৌন্দর্য লুকিয়ে সেটির কার্যত নিখুঁত গঠনে, জানিয়েছেন রাশি। তাঁর কথায়, “উজ্জ্বল একটি ঢিবির মতো কেন্দ্রকে সাপের মতো পেঁচিয়ে রয়েছে দু’টি হাত। বিস্তার কমপক্ষে প্রায় ৩০ হাজার আলোকবর্ষ। নক্ষত্র তৈরির এলাকাও স্পষ্ট দৃশ্য়মান। সবটা এতই নিখুঁত যে, চোখে দেখেও বিশ্বাস হয় না।” জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের অসামান্য দক্ষতায় ছায়াপথের খুঁটিনাটি দেখা সম্ভব হয়েছে, জানিয়েছেন তিনি।
ব্রহ্মাণ্ড যখন নিতান্তই নবীন, এমন নিখুঁত গঠনের ছায়াপথ তৈরি কী ভাবে সম্ভব? এত দিন মনে করা হত, সৃষ্টির শুরুতে ব্রহ্মাণ্ড অনেক বেশি গরম এবং অস্থির ছিল। কয়েকশো কোটি বছর ধরে শীতল হওয়ার পরে তা স্থায়ী, নির্দিষ্ট সর্পিল গঠনের ছায়াপথ তৈরিতে সক্ষম হয়। সেই ধারণা পুরোপুরি পাল্টে দিয়েছে অলকানন্দার আবিষ্কার, জানান যোগেশ। তিনি বলেন, “সূর্যের ১০০০ কোটি গুণ ভরের নক্ষত্র রয়েছে ছায়াপথটির মধ্যে। তার উপরে সর্পিল হাতের বিস্তার থেমে নেই। অথচ গোটাটাই হয়েছে মাত্র কয়েকশো কোটি বছরে। মহাজাগতিক কর্মকাণ্ডের বিচারে এই গতি অবিশ্বাস্য।”তবে ছায়াপথের নাম ‘অলকানন্দা’ কেন? তা-ও খোলসা করেছেন রাশি ও যোগেশ। হিমালয়ের পাহাড়ি এলাকায় বয়ে চলা অলকানন্দা আর মন্দাকিনী পরস্পর যমজ নদী। ‘মন্দাকিনী’র অর্থ স্বর্গের গঙ্গা বা আকাশগঙ্গা। “আকাশগঙ্গা ছায়াপথের সঙ্গে সুদূর ওই ছায়াপথের অনেক মিল রয়েছে। অলকানন্দার চেয়ে তাই ভাল নাম আর কী হতে পারে”, বলেন যোগেশ।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)