আমেরিকার মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা অ্যাপোলো অভিযানের মাধ্যমে চাঁদ থেকে কুড়িয়ে এনেছিল সেখানকার পাথরের টুকরো। তা নিয়ে দীর্ঘ দিন ধরে বিস্তর গবেষণা হয়েছে। এখনও হচ্ছে। অবশেষে সেই পাথরের একটি রহস্য সমাধান করলেন বিজ্ঞানীরা। নতুন গবেষণায় দাবি, চাঁদের ওই রহস্যের যুক্তিগ্রাহ্য উত্তর এত দিনে মিলেছে।
কী রহস্য? তার সমাধানই বা কী?
চাঁদের পাথর পরীক্ষা করে দেখা গিয়েছে, তাতে চৌম্বকশক্তি অত্যধিক। চাঁদ পৃথিবীর চেয়ে আকারে ছোট হওয়ায় তার অভ্যন্তরীণ শক্তি এবং গতিশীলতা তুলনামূলক কম। পৃথিবীর যে গতিশীলতা তার চৌম্বকক্ষেত্রকে শক্তিশালী করে, তার সঙ্গে চাঁদের তুলনা চলে না। তা সত্ত্বেও চাঁদ থেকে তুলে আনা পাথরে অভাবনীয় চুম্বকের টান দেখেছেন বিজ্ঞানীরা। কোনও কোনও ক্ষেত্রে তার চৌম্বকশক্তি পৃথিবীকেও ছাপিয়ে গিয়েছে। সংশ্লিষ্ট পাথরের নমুনা প্রায় ৩৫০ কোটি বছরের পুরনো। তাতে কোথা থেকে এত চৌম্বকশক্তি এল? দীর্ঘ দিন ধরে বিষয়টি বিজ্ঞানীদের ভাবিয়ে তুলেছিল। সম্প্রতি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক দল ব্রিটিশ বিজ্ঞানী এ নিয়ে গবেষণা করেছেন। তাঁদের গবেষণার ফল ‘নেচার জিওসায়েন্স’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।
আরও পড়ুন:
বিজ্ঞানীদের দাবি, চাঁদের পাথরের নমুনায় যে নিদর্শন মিলেছে, তা থেকে বহু কোটি বছর আগে পৃথিবীর উপগ্রহে বড়সড় কোনও ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। এমন কিছু চাঁদে ঘটেছিল, যা সাময়িক ভাবে সেখানে ‘চৌম্বকত্বের বিস্ফোরণ’ ঘটায়। গ্রহ-উপগ্রহের ভূতত্ত্ববিদ ক্লেয়ার নিকোল্স বলেন, ‘‘আমাদের নতুন গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, অ্যাপোলো অভিযানে আনা নমুনাগুলি চাঁদে কয়েক হাজার বছর ধরে চলা অত্যন্ত বিরল ভূতাত্ত্বিক ঘটনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে এখনও পর্যন্ত এগুলিকে ৫০ লক্ষ বছরের চন্দ্র ইতিহাসের প্রতিনিধিত্বকারী বলে ধরা হচ্ছে। আসলে চাঁদে শক্তিশালী চৌম্বকত্বের ঘটনা কতটা বিরল এবং সংক্ষিপ্ত ছিল, আমরা এত দিন তা বুঝতে পারিনি।’’
চাঁদ থেকে আনা পাথরের টুকরোগুলি নতুন করে খুঁটিয়ে পরীক্ষা করে দেখেন বিজ্ঞানীরা। এই পাথর মেয়ার ব্যাসল্ট নামে পরিচিত। এর ভূতাত্ত্বিক উপাদানগুলি এবং তাদের চৌম্বকত্বের মধ্যে ‘প্যাটার্ন’ খোঁজার চেষ্টা করা হয়। বিজ্ঞানীদের দাবি, ‘প্যাটার্ন’ পাওয়া গিয়েছে। যে সমস্ত পাথরের নমুনায় চৌম্বকত্ব যত বেশি, তার মধ্যে টাইটানিয়ামের পরিমাণও তত বেশি। এর পরের ধাপে কম্পিউটার মডেল ব্যবহার করা হয়। কোন পদ্ধতিতে টাইটানিয়াম সমৃদ্ধ পাথরে চৌম্বকক্ষেত্র শক্তিশালী হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখেন বিজ্ঞানীরা। দেখা যায়, চাঁদের কেন্দ্রস্থ ম্যান্টেলের সীমারেখার কাছে টাইটানিয়াম সমৃদ্ধ উপাদানের গলন তাপের প্রবাহ বাড়িয়ে দিতে পারে। এতেই চৌম্বকক্ষেত্র বৃদ্ধি পায়। টাইটানিয়াম সমৃদ্ধ লাভার প্রবাহও বাড়ে।
আরও পড়ুন:
গবেষকদের মতে, অ্যাপোলো অভিযানে চাঁদের মেয়ার ব্যাসল্ট সমৃদ্ধ এলাকাকেই অবতরণের জন্য বেছে নেওয়া হয়েছিল। তাই এই অংশের পাথরের নমুনায় শক্তিশালী চৌম্বকক্ষেত্রের নিদর্শন ধরা পড়েছে। অন্য কোনও অংশে তা নেই। চাঁদের বাকি অংশে চৌম্বকক্ষেত্র পৃথিবীর চেয়ে দুর্বল। সে ক্ষেত্রে চাঁদের অত্যন্ত জরুরি ইতিহাস আমাদের অজানা থেকে যেত, দাবি অক্সফোর্ডের গবেষকদলের। তাঁরা জানিয়েছেন, চাঁদের কিছু অংশের মাটিতে শক্তিশালী চৌম্বকক্ষেত্রের মেয়াদ ছিল মাত্র কয়েক হাজার বছর। চাঁদের প্রাচীনত্বের সামনে যা নগন্য।
এমনিতে চাঁদের চৌম্বকক্ষেত্র দুর্বল। তার কারণ নিয়েও বিজ্ঞানীদের মধ্যে একাধিক তত্ত্ব প্রচলিত রয়েছে। কেউ কেউ বলেন, প্রকাণ্ড কোনও গ্রহাণুর সঙ্গে সংঘর্ষের ফলে চৌম্বকত্ব হারিয়েছে চাঁদ। পৃথিবীর একমাত্র এই উপগ্রহের পাথর সম্পর্কে সাম্প্রতিক গবেষণার অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বিজ্ঞানীরা মেনে নিয়েছেন, অনেক ক্ষেত্রে তাঁদের তৈরি তত্ত্ব খাড়া করার জন্য প্রমাণ ছাড়াই ধারণা দিয়ে ফাঁক পূরণ করতে হয়েছে। সেই সংক্রান্ত পর্যাপ্ত তথ্য পাওয়া যায়নি। পরীক্ষার জন্য যেটুকু পাথরের নমুনা বিজ্ঞানীদের হাতে ছিল, তা-ও পর্যাপ্ত নয়। তবে এর থেকে এত দিনের রহস্য কিনারার একটি সূত্র পাওয়া গেল। অনেকের মতে, আগামী দিনে আরও গবেষণার মাধ্যমে পাকাপাকি ভাবে এই রহস্যের সমাধান সম্ভব হবে।