প্রায় ৪০০০ বছর আগে সিন্ধু নদীর তীরে গড়ে উঠেছিল সভ্যতা। পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন এই সভ্যতা মূলত পাকিস্তান, পশ্চিম ভারত এবং আফগানিস্তানের কিছু অংশে বিস্তার লাভ করেছিল। সেখান থেকে পাথর, পোড়া মাটির উপরে খোদাই করা বেশ কিছু লিপি মিলেছে। এখনও ওই লিপিগুলির পাঠোদ্ধার সম্ভব হয়নি।
কী রয়েছে সে সব লিপিতে? কোনও লিপিতে রয়েছে ইংরেজি অক্ষর ‘ইউ’, যার দুই মাথায় তিনটি করে আঙুল, চৌকো আকারের হিরে, চাকার মতো কিছু চিহ্ন। প্রশ্ন ওঠে, কোনও দিনই কি সেই সব লিপির পাঠোদ্ধার করা সম্ভব হবে না? কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে কি মানে বোঝা যাবে ওই লিপির?
খ্রিস্ট জন্মের ২,৬০০ থেকে ১,৯০০ বছর আগে বিকশিত হয়েছিল সিন্ধু সভ্যতা। মাটি খনন করে প্রায় হাজার ফলক বা জিনিসপত্র খুঁজে পেয়েছেন প্রত্নতাত্ত্বিকেরা, যাতে লিপি খোদাই করা রয়েছে। সেই নিয়ে মাইকেল ফিলিপ ওকস গবেষণা করেছেন। সেই গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে ‘জার্নাল কোয়ান্টিটিভ লিঙ্গুইস্টিক্স’-এ। ওকস জানিয়েছেন, সিন্ধু সভ্যতা থেকে যে সব লিপি উদ্ধার হয়েছে, তার বেশির ভাগই সংক্ষিপ্ত। এক-একটি লিপিতে সর্বাধিক পাঁচটি চিহ্ন রয়েছে।
আরও পড়ুন:
কোন ভাষায় সেগুলি লেখা রয়েছে, তা এখনও গবেষকদের কাছে স্পষ্ট নয়। অনেকে আবার মনে করেন, ওই লিপি আদতে কোনও ভাষাতেই লেখা হয়নি। বরং কোনও ব্যক্তি বা বস্তুকে বোঝানোর জন্য প্রতীক ব্যবহার করা হয়েছে। প্রত্নতত্ত্ববিদদের মতে, সিন্ধু সভ্যতার লিপিগুলিতে মোট ১০০ রকম প্রতীক মিলেছে। তাঁদের অর্থ নিয়ে দ্বন্দ্ব রয়েছে ইতিহাসবিদদের। সেই দ্বন্দ্ব, মতভেদ এতটাই বেশি যে, মনে করা হয় সে কারণেই আজও সিন্ধু সভ্যতার লিপিগুলির পাঠোদ্ধার হয়নি।
স্টিভ বন্টা নামে এক গবেষক জানিয়েছেন, নব্বইয়ের দশকেই সিন্ধু সভ্যতার লিপিগুলির পাঠোদ্ধার অনেকটাই সম্ভব হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু একদল বিজ্ঞানী সেই পাঠোদ্ধারের অর্থ মানতে চাননি। তা ছাড়া উদ্ধার হওয়া বেশির ভাগ লিপিতে প্রতীকগুলির পুনরাবৃত্তি হয়েছে। সে কারণেও ওই লিপি দুর্বোধ্য হয়ে উঠেছে।
আরও পড়ুন:
প্রশ্ন উঠছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)-এর সাহায্যে কি এই পাঠোদ্ধার সম্ভব? বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এআই হয়তো কাজ কিছুটা এগিয়ে দিতে পারে। কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে গবেষকদের। বন্টা জানিয়েছেন, এটা মনে রাখতে হবে যে এআই তৈরি করেছিল মানুষই। তাই তারও সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে। নেব্রাস্কা-লিঙ্কন বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটিংয়ের অধ্যাপক পিটার রেভেসের মতে, এআইয়ের মাধ্যমে এই লিপির পাঠোদ্ধার করা অনেকটাই সম্ভব। সেই চেষ্টাও ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। ডেটা মাইনিং এবং সংখ্যাতত্ত্ব বিশ্লেষণ করে বোঝার চেষ্টা হচ্ছে, কোন প্রতীকগুলির অর্থ একই রকম বা কাছাকাছি। ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্সের অধ্যাপক রাজেশ রাওয়ের মতে, সিন্ধু সভ্যতার লিপিগুলিতে একটি নির্দিষ্ট ধরন রয়েছে। তা অনেকটাই বুঝতে পেরেছেন বিজ্ঞানীরা। তবে তার সম্পূর্ণ অর্থ উদ্ধার সম্ভব নয় বলেই মনে করেন তিনি।
রাওয়ের মতে, সিন্ধু সভ্যতার লিপির সংখ্যা পদ্ধতি কিছুটা হলেও বুঝতে পেরেছেন গবেষকেরা। লিপিতে উল্লম্ব যে রেখা রয়েছে, সেগুলিকে মনে করা হচ্ছে সংখ্যা। বিজ্ঞানীদের মতে সিন্ধু সভ্যতার আরও কিছু লিপি ভবিষ্যতে উদ্ধার করা গেলে এই সংখ্যাতত্ত্ব স্পষ্ট হতে পারে।