উঁচু প্রাচীরে ঘেরা দুর্গ। তৈরি হয়েছিল সেই একাদশ শতাব্দীতে। ১০৯৩ সালে। ৯০০ বছরেরও পুরনো এই দুর্গের নীচেই লুকিয়ে ছিল আদিম কালে এক প্রাগৈতিহাসিক রহস্য।
ব্রিটেনের কার্ডিফ শহর থেকে প্রায় ১৫০ কিলোমিটার পশ্চিমে রয়েছে এই পেমব্রোক দুর্গ। ওয়েলসের অন্যতম প্রাচীন দু্র্গ এটি। পেমব্রোক নদীর তীরে অবস্থিত এই দুর্গটিকে ঘিরে রয়েছে এক প্রাকৃতিক পরিখা। রয়েছে উঁচু উঁচু গম্বুজ, যেখান থেকে একসময়ে নজরদারি চালাতেন রাজপরিবারের সৈন্যসামন্তেরা। এখন অবশ্য দুর্গ খুলে দেওয়া হয়েছে পর্যটকেদের জন্য। ব্রিটেনের সংরক্ষিত দুর্গগুলির মধ্যে অন্যতম এটি। তবে প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে, বিশেষত্ব এই দুর্গের যতটা, তার চেয়েও বেশি এই দুর্গের তলায়।
দুর্গটির নীচে রয়েছে একটি গুহা। চুনাপাথরের গুহা। এত দিন মনে করা হত, গুহাটি মনুষ্যনির্মিত। দুর্গ তৈরির অনেক পরে সম্ভবত ভিক্টোরিয় যুগে (১৮৩৭-১৯০১ সাল, যে সময়ে রানী ভিক্টোরিয়ার শাসন ছিল) গুহাটি খনন করা হয়েছিল বলে মনে করা হত। এখন ওই গুহার আর কোনও প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব নেই— এমন ধারণাও ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক এক প্রত্নতাত্ত্বিক অভিযান ধরিয়ে দিল, গুহাটিকে নিয়ে এত দিনের ধারণা ছিল সম্পূর্ণ ভুল।
ওই অভিযানে স্পষ্ট, এত দিন যা মনে করা হত, তার চেয়েও অনেক পুরনো এই গুহা। সম্ভবত মনুষ্যনির্মিতও নয়। প্রাকৃতিক ভাবে নির্মিত। গবেষকদের দাবি, এই দুর্গের সঙ্গে যেমন জড়িয়ে রয়েছে রাজপরিবারের ইতিহাস, তেমনই রয়েছে রোমহর্ষক প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্বই। পেমব্রোক দুর্গের নীচে যে গুহাটি রয়েছে, স্থানীয়েরা সেটিকে বলেন ‘ওগান ক্যাভার্ন’। সম্প্রতি ব্রিটেনের অ্যাবারডিন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদল এই গুহায় খননকার্য চালান। পরীক্ষামূলক ওই অভিযানে মিলেছে চমকে দেওয়ার মতো তথ্য। গুহায় পাওয়া গিয়েছে আদিমানবদের অস্তিত্বের ‘প্রমাণ’। সঙ্গে মিলেছে কিছু প্রাণীর হাড়গোড়ও। তালিকায় রয়েছে জলহস্তী এবং লোমশ গণ্ডারও।
সম্প্রতি বিজ্ঞান বিষয়ক তথ্যপরিবেশনকারী ওয়েবসাইট ‘পপুলার মেকানিক্স’-এ এই প্রত্নতাত্ত্বিক অভিযানের খবর প্রকাশিত হয়েছে। অ্যাবারডিন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তথা গবেষকদলের প্রধান ডব ডিনিসের কথায়, এখন পর্যন্ত সীমিত পরিসরেই কাজ হয়েছে। তবে যতটুকু কাজ হয়েছে, তার ভিত্তিতেই নিশ্চিত ভাবে বলা যায়, ‘ওগান ক্যাভার্ন’ সত্যিই একটি অসাধারণ প্রত্নতাত্ত্বিক স্থল। তিনি বলেন, “এখানে যে শুধু হোমো সেপিয়েন্স (আধুনিক মানুষ)-এর নিদর্শন পাওয়া গিয়েছে, তা-ই নয়— আরও অনেক আগে থেকে মনুষ্যবসতির আভাস মিলেছে।” তবে সেটি কোন প্রজাতির মানবগোষ্ঠী ছিল তা এখনও নিশ্চিত ভাবে বলা সম্ভব নয় বলেই মনে করছেন ডিনিস। তাঁর মতে, নিয়ানডারথালেরও সম্ভবত এই গুহায় থাকত।
আরও পড়ুন:
দুর্গের উত্তর দিকের অংশের ঠিক নীচেই রয়েছে ওগান ক্যাভার্ন গুহা। এই গুহাতেই এখন থাকে গ্রেটার হর্স শু প্রজাতির বাদুড়েরা। গুহার মেঝে আর পাঁচটা গুহার তুলনায় অনেকটা সমতল। আকার-আয়তনেও বড়। ফলে এটি গঠনের সময় থেকেই বিভিন্ন প্রয়োজনে ব্যবহারের উপযোগী ছিল বলে মনে করেন গবেষকেরা। তা সে আদিম কালেই হোক, বা আধুনিক যুগে।
গবেষকদের অনুমান এই গুহাটিকে মধ্যযুগে সম্ভবত কোনও গুদামঘর হিসাবে ব্যবহার করা হত। তা ছাড়া রোমান যুগেও এই গুহাটি যে ব্যবহৃত হত, তারও প্রমাণ মিলেছে। তবে গবেষকদের ধারণা, এর গুহার অতীত জুড়ে রয়েছে আরও প্রাচীন কালে। আগামী দিনে এই গুহায় আরও প্রত্নতাত্ত্বিক অভিযানের পরিকল্পনা রয়েছে ডিনিসদের। তাঁর কথায়, এই গুহা বিশ্লেষণ করে আদিমানবের এক দীর্ঘ এবং ধারাবাহিক ঘটনাপরম্পরা উন্মোচন করা সম্ভব হবে। ডিনিস বলেন, “এই গুহায় যে সব প্রমাণ মিলেছে তা থেকে স্পষ্ট এখানে আনুমানিক ৩৫-৪৫ হাজার বছর আগেও মানুষের অস্তিত্ব ছিল।” ব্রিটেনে হোমো সেপিয়েন্সদের আদিমতম গোষ্ঠীগুলির মধ্যে একটি এই গুহায় থাকত বলে মনে করেন তিনি। কিংবা তা নিয়ানডারথাল মানবগোষ্ঠীর অস্তিত্বের প্রমাণও হতে পারে। সেই সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না ডিনিস।
আরও পড়ুন:
অ্যাবারডিন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতাত্ত্বিক কেট ব্রিটনও এই অভিযানের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। দুর্গের নীচে এই গুহাটির প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্বের কথা মানছেন তিনিও। তাঁর কথায়, এই গুহায় মাটির স্তরগুলি বেশ ভাল ভাবে সংরক্ষিত রয়েছে। ফলে ভবিষ্যত গবেষণার ক্ষেত্রে তা সুবিধাজনক হবে। তিনি বলেন, প্রাথমিক গবেষণায় দেখা গিয়েছে হাড় এবং গুহার মাটির স্তর উভয়ের মধ্যেই আদিম কালের ডিএনএ সংরক্ষিত রয়েছে। ফলে ওই হাড়ের নমুনাগুলি কোন মানবপ্রজাতির তা নিয়ে গবেষণায় এই ডিএনএ অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা নিতে পারে বলে মনে করছেন ব্রিটন।
হোমো সেপিয়েন্স এবং নিয়ানডারথাল উভয়েরই অস্তিত্বের প্রমাণ একসঙ্গে পাওয়া যায়, এমন প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান ব্রিটেনে খুবই কম রয়েছে। সে দিক থেকেই পেমব্রোক দুর্গের এই গুহাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। আগামী মে মাসে অ্যাবারডিন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদলটি ফের একবার এই গুহায় অভিযানে নামবে। সেখান থেকে আরও নমুনা সংগ্রহ করা হবে বলে জানিয়েছেন গবেষকেরা। প্রাথমিক খনন পর্বে ইতিমধ্যে ম্যামথ, লোমশ গন্ডার, বল্গা হরিণ, জলহস্তী এবং ঘোড়ার হাড়গোড় পেয়েছেন তাঁরা। পাওয়া গিয়েছে পাথরের তৈরি বিভিন্ন অস্ত্রও, যা ইঙ্গিত করে এই গুহায় আদিমানবেরা বাস করত।