বছর ১২ আগেকার কথা। সাইবেরীয় অঞ্চলে রেললাইন পাততে গিয়ে হঠাৎ করেই সন্ধান মেলে এই সমাধির। এক মধ্যবয়স্কা মহিলার সমাধি। কিন্তু এমন সমাধি ওই অঞ্চলের অন্য পাঁচটা সমাধির চেয়ে আলাদা। সমাধিতে মহিলার কঙ্কালের সঙ্গে মিলেছে এক সদ্যোজাতের কঙ্কাল এবং এক ঘোড়ার অক্ষত চামড়া। মিলেছে মহিলার ব্যক্তিগত কিছু সামগ্রীও।
সাইবেরীয় অঞ্চলে এই সমাধিটির সন্ধান মেলে ২০১৪ সালে। ওই সময়ে সায়ান পর্বতমালায় রেললাইন পাতার আগে খননকার্য চলছিল। সেখানে পাথরে ঘেরা একটি ঢিবি খোঁড়ার সময় সন্ধান মেলে সমাধিটির। সায়ান হল দক্ষিণ সাইবেরিয়ার একটি পর্বতমালা। দক্ষিণ-পূর্ব রাশিয়া এবং উত্তর মঙ্গোলিয়ায় এটি বিস্তৃত। এই অঞ্চলে আগেও বেশ কিছু ছোট ছোট বসতি এবং কয়েক ডজন কবরের সন্ধান মিলেছে। তবে এই সমাধিটি ছিল ‘অনন্য’। ৪০ বছর বয়সি এক মহিলাকে এক সদ্যোজাত, একটি ভেড়ার মেরুদণ্ড, একটি ঘোড়ার অক্ষত চামড়া, খুলি-সহ সমাধিস্থ করা হয়েছিল। পাওয়া গিয়েছে আয়না, ঘোড়ার পিঠে ওঠার জন্য রূপোর তৈরি পা-দানি। এ ছাড়া কানের দুল, লোহার ছুরি এবং হাত দিয়ে সুতো কাটার যন্ত্রও মিলেছে।
সায়ান পর্বতমালায় এই প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্যের নেতৃত্বে ছিলেন রাশিয়ান অ্যাকাডেমি অফস সায়েন্সেস-এর গবেষক আন্দ্রে পোলিয়াকভ। সমাধিস্থলটি যে ওই অঞ্চলের অন্য প্রাচীন সমাধির চেয়ে আলাদা, তা দেখা মাত্রই বুঝতে পেরেছিলেন তিনি। পোলিয়াকভের কথায়, “এটি যে কোনও সাধারণ সমাধি ছিল না, তা বেশ স্পষ্ট। গোটা সায়ান-আলতাই অঞ্চলে এ ধরনের সমাধি কয়েক ডজনের বেশি নেই।” কিন্তু এই সমাধিস্থলের গুরুত্ব কতটা, তা সঠিক ভাবে বিশ্লেষণ করতে গবেষণার প্রয়োজন ছিল। এবং সেই গবেষণায় এক দশকেরও বেশি সময় লেগে যায়। সম্প্রতি এই গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে রাশিয়ার নোভোসিবিরস্ক স্টেট ইউনিভার্সিটির এক জার্নালে।
দীর্ঘ গবেষণার পরে পোলিয়াকভ এবং তাঁর সহযোগীরা নিশ্চিত হন— এটি একটি মধ্যযুগীয় সমাধি (ইউরোপে পঞ্চম থেকে পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষ ভাগ পর্যন্ত মধ্যযুগ ছিল, অঞ্চলভেদে মধ্যযুগের সময়কালও ভিন্ন)। সমাধিস্থলের রেডিয়োকার্বন ডেটিং (সময়কাল নির্ধারণের প্রক্রিয়া) করে দেখা যায় সেটি নবম থেকে ত্রয়োদশ শতাব্দীর মাঝে কোনও এক সময়ে তৈরি হয়েছিল। তবে সমাধির ভিতর যে সব প্রত্নতাত্ত্বিক সামগ্রী পাওয়া গিয়েছে, তা বিশ্লেষণ করে আরও নির্দিষ্ট সময়কাল নির্ধারণ করা সম্ভব হয়। গবেষকদের অনুমান মহিলা এবং সদ্যোজাতকে সম্ভবত দশম শতাব্দীতে সমাধিস্থ করা হয়েছিল।
তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, ওই সময়ে স্তেপ অঞ্চলের যাযাবরদের মধ্যে দেহ সমাধিস্থ করার এমন প্রথা ‘বিরল’। স্তেপ তৃণভূমি ইউরেশিয়ায় প্রায় আট হাজার কিলোমিটার এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে। ভৌগোলিক ভাবে যা বর্তমান হাঙ্গেরি থেকে শুরু করে ইউক্রেন, রাশিয়া, কাজাখস্তান ও মঙ্গোলিয়া হয়ে মাঞ্চুরিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত।
আরও পড়ুন:
সাইবেরিয়ার ওই সমাধিতে যে আয়না এবং ঘোড়ার পিঠে ওঠার পা-দানি পাওয়া গিয়েছে, সেগুলির গায়ে মিলেছে শিল্পশৈলীর ছোঁয়া। তার সঙ্গে সমসাময়িক চিনা শিল্পকার্যের মিল রয়েছে। যা ইঙ্গিত দেয় দশম শতাব্দীতেও এশিয়ার বিভিন্ন প্রান্তের মধ্যে সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন ছিল। প্রত্নতাত্ত্বিকেরা গবেষণাপত্রে লিখেছেন, সমাধিতে মহিলাটির কিছু ব্যক্তিগত সামগ্রীও পাওয়া গিয়েছে। তালিকায় রয়েছে ব্রোঞ্জের এক জোড়া কানের দুল, একটি ভাঙা আয়নার অংশ, একটি লোহার ছুরি এবং হাত দিয়ে সুতো কাটার একটি যন্ত্র। উল্লেখযোগ্য ভাবে আয়নাটির গায়ে আঙুরের থোকা-সহ একটি পেঁচানো সরু গাছের ডালের মতো অলঙ্করণ ছিল। এই ধরনের অলঙ্করণ শৈলীর সঙ্গে চীনের তাং রাজবংশের আমলে (৬১৮-৯০৭ খ্রিস্টাব্দ) অভিজাতদের সমাধিতে পাওয়া আয়নার কারুকার্যের মিল রয়েছে। যা থেকে গবেষকেরা আরও স্পষ্ট ইঙ্গিত পান যে ওই সময়েও এশিয়ার বিভিন্ন অংশে সাংস্কৃতিক যোগাযোগ ছিল।
মনুষ্য সমাধির সঙ্গে ঘোড়াকে সমাধিস্থ করার প্রথা অতীতে বিভিন্ন জায়গায় দেখা দিয়েছে। প্রাচীন মঙ্গোলিয়ায় এই ধরনের প্রথা ছিল। ব্রিটেনেও প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্যে এই ধরনের উদাহরণ মিলেছে। অনুমান করা হয়, অভিজাতদের মধ্যে রাজকীয় অন্তেষ্টির একটি প্রথা হিসাবে এটি প্রচলিত ছিল। তবে সাইবেরিয়ার ওই পার্বত্য অঞ্চলে এই ধরনের সমাধি ‘বিরল’।