প্লাস্টিক শুধু মাটি, নদী, সমুদ্র নয়, বায়ুমণ্ডলকেও দূষিত করছে। বিজ্ঞানীরা প্রমাণ পেয়েছেন, বায়ুমণ্ডলে ঘুরে বেড়ায় প্লাস্টিকের কণা। আর তার প্রভাবে বদলে যাচ্ছে মেঘের গঠন। বদলাচ্ছে বৃষ্টির ধরন। এমনকি, উড়ানের ক্ষেত্রেও বিপদ ডেকে আনতে পারে এই প্লাস্টিক কণা। মানবসভ্যতাকে ঠেলে দিতে পারে ধ্বংসের মুখে।
পেন স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের এক দল গবেষক প্লাস্টিক কণার প্রভাব নিয়ে গবেষণা করেছিলেন। ‘জার্নাল এনভায়রমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি: এয়ার’-এ সেই গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে। গবেষকেরা দেখিয়েছেন, জল জমে বরফ হওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয় বায়ুমণ্ডলের প্লাস্টিক কণা। এমনিতে জল যে তাপমাত্রায় জমে বরফে পরিণত হয়, এই প্লাস্টিক কণা তাতে উপস্থিত থাকলে তার চেয়ে বেশি তাপমাত্রায়ও জল জমে বরফে পরিণত হয়।
বিজ্ঞানীরা জাপান এবং চিনে মেঘ পরীক্ষা করে তাতে প্লাস্টিক কণার উপস্থিতি খুঁজে পেয়েছেন। তা থেকেই তাঁরা সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, শুধু নদী, সমুদ্র নয়, বায়ুমণ্ডলেও ছড়িয়ে রয়েছে প্লাস্টিক কণা। ২০২৩ সালে পূর্ব চিনের মাউন্ট তাই এবং জাপানের মাউন্ট ফুজির উপরে ভেসে থাকা মেঘের মধ্যে থেকে জলকণা সংগ্রহ করে তাতে প্লাস্টিক কণার উপস্থিতি লক্ষ করেন বিজ্ঞানীরা।
গবেষকেরা পরিবেশে চার ধরনের প্লাস্টিকের উপস্থিতি লক্ষ করেছেন— কম ঘনত্বের পলিথাইলিন, পলিপ্রোপাইলিন, পলিভিনাইল ক্লোরাইড, পলিথাইলিন টেরেফথালেট যা পিইটি নামে পরিচিত। জলের ফোঁটায় মিশে থাকে ওই প্লাস্টিক কণা। সেই জলের ফোঁটা যখন জমে বরফে পরিণত হয়, তখন প্লাস্টিক কণাও জমে যায়। তার প্রভাবে জলের বরফে পরিণত হওয়ার প্রক্রিয়া কোনও ভাবে প্রভাবিত হয় কি না, তা দেখার চেষ্টা করেন বিজ্ঞানীরা। তাঁরা দেখেন, প্লাস্টিকের কণাযুক্ত জলবিন্দু বিশুদ্ধ জলবিন্দুর তুলনায় ৫ থেকে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি তাপমাত্রাতেও জমাট বাঁধতে সমর্থ হয়।
বায়ুমণ্ডলের অবস্থা যখন আদর্শ থাকে, তখন এক বিন্দু জল জমাট বাঁধে মাইনাস ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় (বিশুদ্ধ জল কণা ওই তাপমাত্রা পর্যন্ত তরল থাকতে পারে, যেখানে অবিশুদ্ধ জলবিন্দু ০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে বরফে পরিণত হয়)। এক বিন্দু জলে যখন প্লাস্টিকের কণা মিশে থাকে, তখন তা অর্ধেকের বেশি জলবিন্দু মাইনাস ২২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় জমাট বাঁধে। তা থেকেই বিজ্ঞানীদের মনে হয়েছে, প্লাস্টিক কণা জল জমাট বাঁধার ক্ষেত্রে সাহায্যকারী হিসাবে কাজ করে।
এ বার এই প্রক্রিয়া কী ভাবে বৃষ্টি হওয়ার ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলে, তা নিয়ে গবেষণা করেন পেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা। তাঁরা জানান, যখন মেঘে থাকা জল বাতাসের অধিক সংখ্যক ভাসমান কণার মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে, তখন ছোট ছোট জলকণা তৈরি হয়। এই জলকণা অনেকটাই ছোট হয়, ফলে বৃষ্টি হওয়ার মতো জলকণার আকার নিতে তার অনেক সময় লাগে। ফলে প্রাথমিক ভাবে কম বৃষ্টির প্রবণতা দেখা যায়।
পেন বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়নের অধ্যাপক মিরিয়াম ফ্রিডম্যান জানিয়েছেন, এই প্রক্রিয়া শেষে যখন বৃষ্টি হয়, তখন আর তা প্রবল বেগে হয় না। বরং হালকা বৃষ্টি হয়। বিজ্ঞানীদের একাংশের মতে, এই কারণে গোটা দুনিয়ার বৃষ্টিপাত প্রভাবিত হতে পারে। বাড়তে পারে খরা। বদলাতে পারে জলবায়ু। তবে তা নিয়ে এখনও অনেক গবেষণা বাকি বলে জানিয়েছেন ফ্রিডম্যানেরা।
আরও পড়ুন:
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বায়ুমণ্ডলে প্লাস্টিক কণার কোনও পরিবর্তন হয় কি না, বিজ্ঞানীরা তা-ও দেখা চেষ্টা করেছেন। তাদের উপর আলো, ওজন এবং অ্যাসিডের প্রভাব পরীক্ষা করেছেন। তারা দেখেছেন, সব রকম প্লাস্টিক কণার উপরে এগুলির প্রভাব একই নয়। কম ঘনত্বের পলিথাইলিন, পলিপ্রোপাইলিন, পিইটি-র ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছে, তাদের বরফ তৈরির ক্ষমতা কমেছে। তবে পিভিসির বেড়েছে।
বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, টায়ারের ক্ষয়, সিন্থেটিক কাপড়ের তন্তু, শহর এবং শিল্পাঞ্চলের প্লাস্টিকের জিনিসের ক্ষয়ের কারণে প্লাস্টিকের কণা বায়ুমণ্ডলে মিশে যায়। মিশে যায় মাটি, জল, বরফে। তার পরে ক্রমে ক্রমে মানুষের শরীরে। বিজ্ঞানীদের একাংশ মনে করছেন, প্লাস্টিককণা নিশ্বাসের মধ্যে দিয়ে মানুষের শরীরে প্রবেশ করলে ফুসফুসের কলার ক্ষতি হতে পারে। প্রদাহ হতে পারে।
তেমনই বায়ুমণ্ডলে প্লাস্টিকের কণা বদলে দিতে পারে মেঘের চরিত্র। তার জেরে বদলাতে পারে বৃষ্টির ধরন। কমতে পারে তার পরিমাণ। তার জেরে খরার প্রকোপ বাড়তে পারে। তবে এই নিয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা।