গোর্খাল্যান্ড টেরিটোরিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বা জিটিএ-র চিফ এক্সিকিউটিভ পদ থেকে ইস্তফা দিলেন অনীত থাপা। ভারতীয় গোর্খা প্রজাতান্ত্রিক মোর্চার প্রধান অনীত ২০২২ সালে এই পদে বসেছিলেন। সেই হিসাবে আরও এক বছর এই পদে থাকার মেয়াদ ছিল তাঁর। তার আগেই পদত্যাগ করলেন তিনি। ঘটনাচক্রে, মঙ্গলবারই কার্শিয়াঙে গিয়ে জিটিএ-‘দুর্নীতি’ নিয়ে সরব হয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তিনি জানান, জিটিএ-তে যে দুর্নীতি হয়েছে, তার তদন্তের প্রয়োজন আছে। শুভেন্দুর কথায়, ‘‘যাঁরা চুরি করেছেন, তাঁদের জেলে ভরা হবে। কাউকে ছাড়া হবে না। যাঁরা লুটেছেন, তাঁদের জেলের ভিতরে ঢোকানোর কাজ করবে আমাদের সরকার।’’
২০২২ সালের জিটিএ নির্বাচনে ৪৫টি আসনের মধ্যে ২৭টিতে জয়ী হয়েছিল অনীতের দল।ভারতীয় গোর্খা প্রজাতান্ত্রিক মোর্চার সদস্য অঞ্জুল চৌহানকে চেয়ারম্যান করা হয়। রাজ্যের তৎকালীন শাসকদল তৃণমূলের সঙ্গে জোট গড়ে লড়েছিলেন অনীতেরা। ১০টি আসনে প্রার্থী দিয়ে পাঁচটি আসনে জয়ী হয়েছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল। এই নির্বাচনে অংশ নেয়নি বিমল গুরুংদের দল গোর্খা জনমুক্তি মোর্চা।
বুধবার ইস্তফা দেওয়ার পর একটি ভিডিয়োবার্তায় অনীত বলেন, “রাজ্যে নতুন সরকার এসেছে। স্বাভাবিক এই সরকারের প্রতি পাহাড় তথা রাজ্যের মানুষ আস্থাশীল। কিন্তু ত্রিপাক্ষিক বৈঠকের মাধ্যমে গঠিত জিটিএ-কে এই সরকার গুরুত্ব দিতে চাইছে না। এই পরিস্থিতিতে পদ আঁকড়ে থাকার কোনও কারণ দেখছি না।” তাঁর বক্তব্য, পাহাড়ের স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান বা স্বতন্ত্র গোর্খ্যাল্যান্ড রাজ্যের বিষয়ে রাজ্যের বিজেপি সরকার কী পদক্ষেপ করে, সে দিকে নজর রাখবেন তাঁরা। দার্জিলিঙের বিজেপি বিধায়ক নোমান অনীতের পদত্যাগের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি জানান, রাজ্যের যে সরকারের আমলে জিটিএ গঠন করা হয়েছিল, সেই সরকার আর নেই। নতুন সরকার পাহাড়ের স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধানের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে ইস্তফা দিয়ে অনীত সঠিক কাজই করেছেন বলে জানান দার্জিলিঙের বিজেপি বিধায়ক। অন্য দিকে, জিটিএ-তে ‘দুর্নীতি’ নিয়ে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী অনীতকে নিশানা করেছেন ইন্ডিয়ান গোর্খা জনশক্তি ফ্রন্ট-এর অজয় এডওয়ার্ডস।
এর আগে একাধিক বার জিটিএ-তে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। এর আগে মে মাসে প্রথম বার উত্তরবঙ্গে গিয়ে শুভেন্দু বলেছিলেন, ‘‘পাহাড়ের জিটিএ-তে দুর্নীতি হয়েছে। দুর্নীতির তদন্ত করে সব চোরকে জেলে পাঠানোর কাজ আমরা করব।’’ তবে কবে, কী ভাবে বা কোন সংস্থাকে দিয়ে তদন্ত করানো হবে, তা ভাঙেননি তিনি। গিয়েই জিটিএ-‘দুর্নীতি’র প্রসঙ্গ উত্থাপন করেন শুভেন্দু অধিকারী। শুভেন্দুর বক্তব্যের প্রেক্ষিতে সেই সময় অনীত বলেছিলেন ‘‘জিটিএ-তে অডিট বা তদন্তে আমাদের আপত্তি নেই। শুধু জিটিএ-র গোড়ার দিক বা ২০১২ সাল থেকে তা দেখতে হবে।’’ স্থানীয় রাজনীতির পর্যবেক্ষকদের বক্তব্য, জিটিএ-র সূচনায় ক্ষমতায় ছিল বিজেপির নির্বাচনী জোটসঙ্গী গোর্খা জনমুক্তি মোর্চা। অনীত সেই দিকেই ইঙ্গিত করতে চেয়েছেন বলে মনে করা হয়।
২০১১ সালে রাজ্য সরকার, কেন্দ্রীয় সরকার এবং গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার মধ্যে ত্রিপাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। তার পর থেকেই রাজ্য সরকারের অধীনে স্বশাসিত সংস্থা হিসাবে জিটিএ পাহাড়ের পরিকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষা-সহ নানা ক্ষেত্রে কাজ করছে। ১৯৮৮ সালে প্রতিষ্ঠিত দার্জিলিং গোর্খা হিল কাউন্সিলের পরিবর্তে এই স্বশাসিত সংস্থা ২০১১ সাল থেকে কাজ করা শুরু করে। জিটিএ-র প্রশাসনিক এলাকা মূলত দার্জিলিং এবং কালিম্পং জেলার বিভিন্ন মহকুমা ও অঞ্চল নিয়ে গঠিত। জিটিএ-র হাতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, পর্যটন, এবং পূর্ত-সহ প্রায় ৫৯টি বিভাগের প্রশাসনিক এবং আর্থিক ক্ষমতা রয়েছে।