শাসন, মারধর করে সন্তান মানুষ করা উচিত? না কি আদর করে আগলে রেখে? এই নিয়ে বিতর্ক বহুদিনের। বিজ্ঞানীরা এই উপায় স্থির করতে মানুষের পাশাপাশি বানর অভিভাবকদের সন্তান লালনপালনও পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। আর তা থেকেই তাঁরা দেখেছেন, লালনের নির্দিষ্ট কোনও বিধি থাকতে পারে না। পরিবেশ, পরিস্থিতি অনুসারে তা বদলে যায়। সন্তানকে কী ভাবে বড় করবেন মা, তা নির্ভর করে অনেকটাই পরিবেশ, পরিস্থিতির উপরে।
বানর শ্রেণির জীবনযাপন পর্যবেক্ষণ করে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, পরিবেশ অনুসারে তাদের সন্তান লালনের ধরন বদলে যায়। যেখানে খাবারের অভাব থাকে, বিপদ অনেক বেশি থাকে, সেখানে বানর-অভিভাবকেরা সন্তানকে অনেক বেশি আগলে রাখে। সব সময় বুকে চেপে থাকে। আবার যেখানে খাবারের অভাব নেই, তেমন শত্রু নেই, সেখানে বানর-মায়েরা সন্তানদের অনেক বেশি স্বাধীনতা দেয়। একা ঘুরে বেড়াতে দেয়। দুই পরিস্থিতিতেই মায়েদের উদ্দেশ্য থাকে একটাই— সন্তানকে বাঁচিয়ে রাখা। তবে তার প্রকাশ, আচরণ হয় ভিন্ন।
‘দ্য কনভারসেশন’ জার্নালে এই সংক্রান্ত একটি গবেষণা প্রকাশিত হয়। সেই প্রতিবেদনে আমেরিকার মনস্তত্ত্ববিদ ডায়না বমরিন্ড জানিয়েছেন, সন্তান প্রতিপালনের সাধারণত তিনটি পদ্ধতি রয়েছে। এক, অথরিটেটিভ বা কর্তৃত্বমূলক। এই পদ্ধতিতে মায়েরা যেমন স্নেহ করে সন্তানকে, তেমন শাসনও করে। শৃঙ্খলার পাঠ দেয়। দুই, অথরিটেরিয়ান বা স্বৈরাচারী। এই মায়েরা শুধুই শাসন করে। শৃঙ্খলা নিয়ে তারা কড়াকড়ি করে বেশি। স্নেহের ভাগ কম। তিন, পারমিসিভ বা প্রশ্রয়দানকারী। এই মায়েরা শাসন কম করে। বরং সন্তানকে আদর দেয় অনেক বেশি।
তবে এই তিনটি পদ্ধতিতে সন্তানের লালনপালন শুধু মানুষ নয়, বানর শ্রেণির প্রাণীরাও করে। কিন্তু নির্দিষ্ট একটি উপায়েই সারা জীবন আটকে থাকে না। গবেষকেরা মানুষের পাশাপাশি এই বানর শ্রেণির প্রাণীর সন্তান লালনও পর্যবেক্ষণ করেছেন। বোঝার চেষ্টা করেছেন, পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে সন্তানের যত্ন নেওয়ার প্রক্রিয়া কী ভাবে বদলে যায়।
আরও পড়ুন:
বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, জীবজগতে শুধুমাত্র মানুষ এবং বানর শ্রেণির মায়েরাই সন্তানের যত্নে অনেক বেশি সময়, শক্তি খরচ করে। সন্তান জন্মানোর পর থেকে সাবালক হওয়া পর্যন্ত তার দেখভাল করে মায়েরাই। বাবাদের তুলনায় তারা অনেক বেশি দায়িত্ব নেয়। মানুষ এবং বানর শ্রেণির মায়েরা পরিবেশ, সন্তানের চাহিদা অনুসারে বদলায় লালন-পালনের ধরনও। মানুষের মতোই যত্ন করে আগলে সন্তান মানুষ করে বোনোবোস, গিবনস, সিয়ামাঙ্গস।
বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, মানুষের মতো বানর শ্রেণির সন্তান যখন বড় হয়, তখন তার প্রতি মায়ের আচরণ বদলে যায়। ছোটবেলায় সন্তানকে যতটা আগলে রাখে মা, বয়স বাড়লে আর তা করে না। বরং তাদের একটু বেশি স্বাধীনতা দেয়। মানুষ-মা যেমন সন্তান বড় হলে তাদের সঙ্গীদের সঙ্গে ছেড়ে দেয়, তেমনই করে বানর-মায়েরাও। গবেষকেরা দেখেছেন, সন্তানদের সবচেয়ে আগলে রাখে মানুষ এবং বোনোবোস। তাঁরা মনে করেন, দুই প্রজাতির জিনগত মিল থাকার কারণে দু’জনের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য এক ধরনের। মানুষ এবং বোনবোস— উভয় প্রজাতির মা তিনটি উপায় মেনেই সন্তান পালন করে। সন্তানের যে বয়সে তাদের যে ভাবে আগলানো দরকার, শাসন করা দরকার, সে ভাবেই করে ওই দুই প্রজাতির মায়েরা। তবে শুধু মা নয়, দুই প্রজাতির বাবারাও একই ভাবে শিশুদের যত্ন নেয়।
একমাত্র মানুষ এবং বানর শ্রেণির পুরুষেরাই সন্তানের যত্ন করে। অন্য স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মধ্যে সেই প্রবণতা দেখা যায় না। মারমোসেট, টামারিনস, টিটি, লেমুর, সিয়ামঙ্গদের মধ্যে সন্তানকে বাঁচানোর ক্ষেত্রে মায়ের মতোই গুরুত্বপূ্র্ণ ভূমিকা নেয় বাবা। মায়ের সঙ্গেই তারা শত্রুর হাত থেকে সন্তানকে রক্ষা করে। অনেক ক্ষেত্রেই বানর শ্রেণির বাবাদের সন্তানদের প্রতি আগ্রাসী আচরণ করতে দেখা যায়। গবেষকেরা বলছেন, তারা আসলে সন্তানকে শিক্ষা দেয়। সমাজে তাদের স্থান কোথায় তা বুঝিয়ে দেয় বানর-বাবারাই। যে সব স্তন্যপায়ীর সামাজিক বিন্যাস কঠোর, তাদের মধ্যে এই প্রবণতা অনেক বেশি দেখা যায়। যেমন শিম্পাঞ্জি-বাবা তার সন্তানকে অনেক বেশি শাসন করে।
মার্মোসেটের ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছে, সন্তান জন্মানোর পরে ৩০ সপ্তাহ লালনপালনে বড় ভূমিকা নেয় বাবা। শিশুকে বাঁচিয়ে রাখতে সাহায্য করে সে। তারা দীর্ঘদিন একই সঙ্গিনীর সঙ্গে থাকে। সাধারণত মার্মোসেট পুরুষ বহুগামী হয় না। মানুষ বাবার মতো বানর-বাবারাও মায়ের সঙ্গে সন্তান লালন করে। বিজ্ঞানীদের একটা বড় অংশের মত ছিল, মানুষ ছাড়া অন্য কোনও পুরুষ-প্রাণী সন্তান লালনে তেমন সহায়তা করে না। নতুন গবেষণা সেই ধারণা অনেকটাই ভেঙেছে। তাতে দেখা গিয়েছে, মানুষের মতো বানর-বাবাও সন্তান লালনের ক্ষেত্রে সক্রিয়।
ঠিক কী ভাবে শিশুকে বড় করা উচিত, শাসন করে না কি আদর করে, সেই নিয়ে বিতর্ক বহু দিনের। বিজ্ঞানীরা বানর শ্রেণির প্রাণীদের জীবনযাপন পর্যবেক্ষণ করে মনে করছেন, লালন-পালনের নির্দিষ্ট নিয়ম হতে পারে না। তা পরিস্থিতির প্রয়োজন মেনে পাল্টে যায়। অভিযোজিত হয়। তাই প্রতিপালনের জন্য নির্দিষ্ট কোনও বাঁধাধরা নিয়ম থাকতে পারে না। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, সন্তানপালন নিয়ে মনোবিদেরা যখন পরামর্শ দেন, তখন এই বিষয়টি মাথায় রাখা উচিত।