Advertisement
E-Paper

আন্টার্কটিকার ‘রক্তপ্রপাত’ রহস্যের সমাধান! বরফ ফুঁড়ে নামতে থাকা স্রোতের বর্ণপরিচয় অবশেষে আবিষ্কৃত

প্রশ্ন হচ্ছে, আন্টার্কটিকার ঠান্ডায় কী ভাবে নোনা জল বরফে পরিণত না হয়ে তরল থাকে? বিজ্ঞানীরা বলছেন, নোনা জলের ঘনত্ব অনেক বেশি হয়। তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নীচে নেমে গেলেও নোনা জল বরফে পরিণত হয় না।

আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক

শেষ আপডেট: ২০ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:৫৯
অ্যান্টার্কটিকার ম্যাকমার্ডো ড্রাই ভ্যালির টেলর হিমবাহের সেই রক্ত প্রপাত।

অ্যান্টার্কটিকার ম্যাকমার্ডো ড্রাই ভ্যালির টেলর হিমবাহের সেই রক্ত প্রপাত। — ফাইল চিত্র।

বরফ-সাদা হিমবাহ চিরে নামছে রক্তের মতো লাল ধারা। আন্টার্কটিকার ম্যাকমার্ডো উপত্যকায় এই ছবি পরিচিত। কিন্তু কেন এমন হয়? শুধুই কি আয়রনের প্রভাবে? রাসায়নিক বিক্রিয়াই কি এক মাত্র কারণ? বিজ্ঞানীরা বলছেন, এগুলিই শুধু কারণ নয়। হিমবাহের নীচে যা চলে, তার জেরেও ফাটল দিয়ে বেরিয়ে আসে রক্ত ধারা।

এই রক্ত প্রপাত হল আদতে আয়রন সমৃদ্ধ, অতি-লবণাক্ত জলের একটি প্রবাহ। অ্যান্টার্কটিকার ম্যাকমার্ডো ড্রাই ভ্যালির টেলর হিমবাহের নিচ থেকে নির্গত হয়। বিজ্ঞানীদের একটা অংশ মনে করেন, অক্সিজেনহীন প্রাচীন লবণাক্ত জল বাতাসের সংস্পর্শে এসে আয়রন অক্সাইড গঠন করে। সে কারণে এই প্রপাতের রং লাল। তবে সাম্প্রতিক একটি গবেষণা এই পুরনো তত্ত্বেই নতুন করে আলো ফেলেছে। ওই গবেষণাকারীদের দাবি, শুধু রাসায়নিক বিক্রিয়া নয়, অভ্যন্তরীণ চাপও এর জন্য দায়ী। ওই টেলর হিমবাহের উচ্চতা কমে যাওয়ার সঙ্গে এই জলের লাল রঙ হওয়ার যোগ রয়েছে। তাঁরা মনে করেন, জলের রঙের পরিবর্তনের অন্যতম কারণ হল চাপের তারতম্য এবং বরফের নীচে জলপ্রবাহের গতিবিধি।

অ্যান্টার্কটিকার ম্যাকমার্ডো ড্রাই ভ্যালির বরফের নদী টেলর হিমবাহে সেই রক্ত প্রপাত প্রথম দেখা গিয়েছিল প্রায় শতাধিক বছর আগে। তবে তার কারণ নিয়ে ছিল ধন্দ। একটি ট্র্যাকার বা যন্ত্র বসিয়ে রেখেছিলেন বিজ্ঞানীরা। ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে ওই ট্র্যাকারে ধরা পড়ে যে, টেলর হিমবাহটির উচ্চতা কমে গিয়েছে। লুইসিয়ানা স্টেট ইউনিভার্সিটির ভূবিজ্ঞানী পিটার টি ডোরান এবং তাঁর দলের ধারণা হয়, লাল জলের ওই প্রবাহের সঙ্গে হিমবাহের উচ্চতা কমে যাওয়ার একটা সম্পর্ক রয়েছে। তার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে চাপের তারতম্য। কয়েক সপ্তাহ ধরে পর্যবেক্ষণ করে তাঁরা দেখেন, হিমবাহের উপরিভাগ প্রথমে বসে যায় এবং পরে আবার আগের অবস্থায় ফিরে আসে। এর কারণ, হিমবাহের নিচে জলের ধারা (ড্রেনেজ পালস)-র প্রবাহ।

Advertisement

হিমবাহের নিচ দিয়ে যখন নোনা জল প্রবাহিত হয়, তখন তাতে প্রচণ্ড চাপ দিতে থাকে বরফের স্তর। তার জেরেই ওই জলের ধারা হিমবাহের ফাটল দিয়ে বেরিয়ে আসে বাইরে। তার পরে তা বাতাসের সংস্পর্শে আসে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, আন্টার্কটিকার ঠান্ডায় কী ভাবে নোনা জল বরফে পরিণত না হয়ে তরল থাকে? বিজ্ঞানীরা বলছেন, নোনা জলের ঘনত্ব অনেক বেশি হয়। তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নীচে নেমে গেলেও নোনা জল বরফে পরিণত হয় না। তাই তা হিমবাহের ফাটল দিয়ে বাইরে নির্গত হয়।

সেই নোনা জল বাতাসের সংস্পর্শে এলে অক্সিজেনের সঙ্গে বিক্রিয়া হয় আয়রনের। নিমেষে জলের রং হয়ে যায় লাল।

সাধারণত হিমবাহের নিচে থাকা জল পিচ্ছিলকারক হিসেবে কাজ করে তাকে সামনে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে। কিন্তু টেলর হিমবাহের ক্ষেত্রে সেই জল ফাটলের মাধ্যমে বেরিয়ে যায়। এর ফলে হিমবাহটি সরাসরি নীচে থাকা পাথরের উপর চেপে বসে। এর ফলে হিমবাহের গতিও কমে যায়। গলনও কমে।

বিজ্ঞানীরা বিশেষ প্রযুক্তি ব্যবহার করে টেলর হিমবাহের নীচে কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ লবণাক্ত জলের ধারা খুঁজে পেয়েছেন। বিজ্ঞানীদের কাছে এ-ও স্পষ্ট হয়েছে যে, কেন হিমবাহের নির্দিষ্ট একটি ফাটল দিয়েই জল বেরিয়ে আসে। তাঁরা দেখেছেন, নোনা জলের গভীরে দীর্ঘ দিন বেঁচে রয়েছে অণুজীবও। কী ভাবে? বিজ্ঞানীরা বলছেন, বরফের নিচে দীর্ঘ দিন থাকার পরেও লোহা এবং সালফারের রাসায়নিক বিক্রিয়ার কারণে সেগুলি বেঁচে থাকে। অক্সিজেনের পরিবর্তে, তাদের মধ্যে অনেকেই সম্ভবত দ্রবীভূত খনিজ পদার্থকে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করে, যা অন্ধকার পরিবেশেও তাদের বাঁচার ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখে।

ভূতাত্ত্বিকদের মতে, আন্টার্কটিকার ওই উপত্যকায় হিমবাহের নীচে জলধারাটি ৩০ থেকে ৫০ লক্ষ বছর আগে থেকে ‘বন্দি’। ওই উপত্যকায় ওর থেকে পুরনো আর জলধারা নেই বলেই মত বিজ্ঞানীদের। সেই জলধারাই ফাটল দিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে, যার জন্য দায়ী চাপের তারতম্য। এখন আর তা বিস্ময়কর কোনও প্রক্রিয়া নয়। বরং বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত যে, ওই লাল প্রপাত আদতে চাপ নিঃসরণের স্থান।

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy