একের পর এক ‘মৃত্যু’! ‘নিরুদ্দেশ’ হয়ে যাওয়ার ঘটনা। এমনকী, ‘আত্মহত্যা’ও! চাঁদে, বুধে, মঙ্গলে, শনি গ্রহে! ৬০ বছর ধরেই চলেছে সেই ‘মিছিল’।

সেই ‘মিছিলের মুখ’গুলির মধ্যে রয়েছে রাশিয়া (সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন), আমেরিকা, জাপান, ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সি (ইসা), চিন, ইজরায়েল। হালে সেই মিছিলে ঢুকে পড়ল আরও একটি মুখ। ভারত। চন্দ্রযান-২-এর ল্যান্ডার ‘বিক্রম’-এর দৌলতে।

চাঁদে, বুধে, মঙ্গল, শনিতে ‘মৃত্যু’ ও ‘আত্মহত্যা’র ঘটনার সূত্রপাত হয় ১৯৫৯ সালে। ৬০ বছর আগে। সেই ঘটনাও ঘটেছিল সেপ্টেম্বরেই। ১৩ তারিখে।

প্রথম নিখোঁজের নাম ‘লুনা-১’!

জানুয়ারিতে রওনা হওয়া রুশ মহাকাশযান ‘লুনাক’ বা ‘লুনা-১’ চাঁদে পৌঁছতে গিয়ে পা হড়কেছিল। চাঁদের কক্ষপথে ঢুকতে না পেরে হারিয়ে গিয়েছিল এই সৌরমণ্ডলেই। বিজ্ঞানীরা এখনও পাননি লুনা-১-এর হদিশ। ৬০ বছর কেটে গিয়েছে, রুশ লুনা-১ এখনও নিরুদ্দেশ। বিজ্ঞানীদের বিশ্বাস, সেই হারিয়ে যাওয়া লুনা-১ এখনও প্রদক্ষিণ করে চলেছে সূর্যকে।

আরও পড়ুন- মিলে গেল বাঙালির পূর্বাভাস, ভিন মুলুকের বার্তা নিয়ে সৌরমণ্ডলে ঢুকল ‘পাগলা ঘোড়া’!​

এ বছর এপ্রিলে ইজরায়েলি ল্যান্ডার ‘বেরেশিট’ চাঁদে আছড়ে পড়ার পর।

তার ঠিক আট মাস পর, সেই ১৯৫৯-এই নামার সময় গতি সামলাতে না পেরে চাঁদের বুকেই মরণ ঝাঁপ মেরেছিল আরও একটি রুশ মহাকাশযান ‘লুনা-২’। তবে সেটি চাঁদের কক্ষপথে ঢুকে পড়তে পেরেছিল। সেটাই ছিল কোনও একটি মহাজাগতিক বস্তু থেকে অন্য একটি মহাজাগতিক বস্তুতে সভ্যতার প্রথম অনুপ্রবেশ।

চাঁদে যেখানে রয়েছে বিক্রম। গত ১৭ সেপ্টেম্বর প্রদক্ষিণের সময় জায়গাটিকে চিহ্নিত (হলুদ দাগ) করেছে নাসার ‘এলআরও’।

তবে তা সে নিরুদ্দেশ হওয়াই বলুন বা মৃত্যু অথবা আত্মহত্যা, প্রতিটি ঘটনা থেকেই শিক্ষা নিয়েছে নাসা, ইসা, জাপান স্পেস এজেন্সি বা ‘জাক্সা’। প্রতিটি ঘটনাই মহাকাশবিজ্ঞান ও প্রযুক্তির গবেষণাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করেছে। এগিয়ে নিয়ে গিয়েছে। এমনকী, কখনও কখনও জানা যায়নি মহাকাশযানগুলির সেই সব মৃত্যু ও আত্মহত্যার ঘটনাগুলি চাঁদ মুলুকে ঠিক কোথায় কোথায় ঘটেছে।

চাঁদে শুরু হল মৃত্যু-আত্মহত্যা!

১৯৬৯-এর ২০ জুলাই দুই মার্কিন মহাকাশচারী নিল আর্মস্ট্রং ও বাজ (এডুইন) অলড্রিন চাঁদের বুকে পা ছোঁয়ানোর কয়েক মাস আগে এক বার ‘ড্রেস রিহার্সাল’ চালিয়েছিল নাসা। অ্যাপোলো-১০ মহাকাশযান পাঠিয়ে। কী ভাবে নভশ্চরদের নামানো হবে, তা পরখ করে দেখতে সেই মার্কিন মহাকাশযান থেকে একটি অংশকে চাঁদের বুকে আছড়ে ফেলা হয়েছিল। যা কার্যত ছিল একটি ‘মুন ইমপ্যাক্ট প্রোব’। তার নাম ছিল ‘স্নুপি’।

অ্যাপোলো-১০ মহাকাশযানের সেই ‘স্নুপি’।

তার পর চাঁদের বুকে ‘আত্মহত্যা’র আরও একটি ঘটনা ঘটেছিল। অ্যাপোলো-১১ অভিযানের মহাকাশচারীরা ফিরে আসার পর অরবিটার থেকে চাঁদের বুকে আছড়ে ফেলা হয়েছিল লুনার মডিউল ‘ইগ্‌ল’কে। কতটা কেঁপে উঠতে পারে আমাদের উপগ্রহ, আছড়ে ফেললে তার বুক থেকে লাফিয়ে কতটা উঁচুতে উঠতে পারে কোনও লুনার মডিউল বা তার টুকরোটাকরা, তা বুঝতে ৬টি অ্যাপোলো মিশনের বেশ কিছু যন্ত্রপাতি ও সেই সব অভিযানে ব্যবহৃত রকেটগুলির বাতিল অংশগুলিকে আছড়ে ফেলা হয়েছিল চাঁদে।

বধ্য়ভূমি হয়ে উঠল মঙ্গলও

তবে চাঁদকেই শুধু বধ্যভূমি ভাবলে হবে না! আমাদের সাহসী কৌতূহলকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে প্রতিবেশী ‘লাল গ্রহ’ মঙ্গল। সূর্যের সবচেয়ে কাছে থাকা গ্রহ বুধও। এমনকী, বহু বলয়ে চার পাশ ঘিরে রাখা নাটকীয় গ্রহ শনিতেও বছরদু’য়েক আগে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটিয়েছে নাসা। ‘ক্যাসিনি’কে শনিতে ডুবিয়ে দিয়ে।

মঙ্গল ছুঁতে গিয়েও আছড়ে পড়ার ধাক্কাটা প্রথম সইতে হয়েছিল সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নকেই। ১৯৭১ সালে। মঙ্গলে ঢুকতে গিয়েছিল সোভিয়েতের ‘মার্স-২’ ল্যান্ডার মহাকাশযান। কিন্তু নামার সময় গতি সামলাতে না পেরে লাল গ্রহের বুকে আছড়ে পড়ে সেই সোভিয়েত ল্যান্ডার।

নাসার অঙ্কে ভুল, মঙ্গলে গিয়ে প্রাণ গেল এমসিও-র!

তার পরেই মঙ্গল মুলুকে ঘটে নাসার একটি মহাকাশযানের মৃত্যুর ঘটনা। সেটা ১৯৯৯ সাল। সেই দুর্ঘটনার জন্য কোনও দায় ছিল না নাসার মঙ্গলযান ‘মার্স ক্লাইমেট অরবিটার’ (এমসিও)। যাবতীয় দোষ ছিল নাসার গ্রাউন্ড কন্ট্রোল রুমের। সেখান থেকে ‘কম্যান্ড’ দেওয়ার সময় ইংরেজি ও মেট্রিক পদ্ধতির এককের মধ্যে হয়ে গিয়েছিল ব্যাপক গন্ডগোল।

আরও পড়ুন- একটা সাফল্যের পিছনে অজস্র ব্যর্থতা! বিজ্ঞানের ইতিহাসই তো ইসরোর সম্বল​

সেই বছরেরই শেষের দিকে আবার মঙ্গল মুলুকে গিয়ে মৃত্যু হয় একটি মার্কিন মহাকাশযানের। তার নাম ছিল, ‘মার্স পোলার ল্যান্ডার’ (এমপিএল)। অবতরণের সময় যতটা আগে তার ইঞ্জিন বন্ধ হওয়ার কথা ছিল ‘সফ্‌ট ল্যান্ডিং’-এর, তা হয়নি। ফলে, হুড়মুড়িয়ে মঙ্গলের রুখুসুখু লাল মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়েছিল নাসার সেই ল্যান্ডার।

মাঝখানে বেশ কয়েকটা বছরের ব্যবধান। সেটা ২০১২। মঙ্গলের মাটি কেমন, বুঝতে নাসা রোভার পাঠাল লাল গ্রহে। ‘মিস কিউরিওসিটি’।

মঙ্গলে আত্মঘাতী হল ‘স্কাই ক্রেন’

তার পর মহাকাশযানের যে অংশটি থেকে কার্যত ছুঁড়ে ফেলে মঙ্গলের মাটিতে নামানো  হয়েছিল কিউরিওসিটি-কে, সেই ‘স্কাই ক্রেন’ অংশটিকে ইচ্ছা করেই লাল গ্রহের মাটিতে আছড়ে ফেল নষ্ট করেছিল নাসা। কাজে লাগবে না বলে। যাকে কাজে লাগবে না তাকে জ্বালানি খরচ করে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনার চেয়ে মহাকাশেই নষ্ট করা ভাল।

মঙ্গলে যেখানে আত্মঘাতী হয়েছে নাসার ‘স্কাই ক্রেন’। রোভার ‘কিউরিওসিটি’কে নামানোর পর।

তাই ‘স্কাই ক্রেন’-কে আত্মঘাতী হয়েছিল! আজ থেকে সাত বছর আগে, লাল গ্রহের বুকে। আরে সেটা এতটাই গতিবেগে গিয়ে আছড়ে পড়েছিল, যে তার অভিঘাতে লাল গ্রহের বুকে তৈরি হয়েছিল বিশাল একটি গহ্বর। কালো রঙের সেই গহ্বর এখনও দেখা যায় মঙ্গলের কক্ষপথ থেকে।

মৃত্যু-মিছিলে রয়েছে আরও আরও মুখ!

সেখানেই শেষ নয়। মৃত্যু-মিছিলে রয়েছে আরও কয়েকটি মুখ! যেমন, ২০১৬-য় মঙ্গলে ‘পালকের ছোঁয়া’য় নামতে গিয়ে গতি সামলাতে না পেরে মুখ থুবড়ে পড়েছিল ইউরোপিয়ান স্পেস (ইসা) ও রুশ স্পেস এজেন্সির (রসকসমস) যৌথ উদ্যোগে পাঠানো ‘স্কিয়াপ্যারেলি’ ল্যান্ডার। তার ফলে, লাল় গ্রহের পিঠে তৈরি হয়েছিল আরও একটি ‘কলঙ্ক’। কালো দাগ।

‘স্কিয়াপ্যারেলি’ ল্যান্ডারের আছড়ে পড়ার দাগ মঙ্গলে।

শুক্রেও মৃত্যু, আত্মহত্যা...একের পর এক!

হ্যাঁ, পৃথিবীর ‘যমজ বোন’ শুক্রেও ঘটেছে মহাকাশযানের মৃত্যুর ঘটনা। সেখানেও প্রথম নামটি সোভিয়েত মহাকাশযানের। গত শতাব্দীর ছয়, সাত ও আটের দশকে শুক্রে বেশ কয়েকটি মহাকাশযান পাঠিয়েছে রুশ মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ‘রসকসমস’। কিন্তু আজ থেকে ৫৩ বছর আগে, ১৯৬৬ সালে শুক্রে আছড়ে পড়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের মহাকাশযান ‘ভেনাস-৩’।

কিন্তু শুক্রে কি শুধুই ঘটেছে মৃত্যুর ঘটনা? না, আত্মঘাতী হতেও বাধ্য করানো হয়েছে অন্তত চারটি মহাকাশযানকে। ১৯৭৮ সালে। নাসা ওই বছর চারটি মহাকাশযানকে ইচ্ছা করেই আছড়ে ফেলে শুক্রের বুকে। শুক্রের পিঠ কতটা শক্তপোক্ত, তার গঠন জানতে, বুঝতে।

তার ১৬ বছর পর ফের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে শুক্র মুলুকে। নাসার ‘ম্যাগেলান’ মহাকাশযান ১৯৯৪ সালে শুক্রের পুরু বায়ুমণ্ডলে ঢোকার পর ঘর্ষণে জ্বলেপুড়ে যায়।

মৃত্যু, আত্মহত্যার ঘটনা শুক্রেও!

আরও ২০ বছর পর ফের আত্মঘাতী হওয়ার ঘটনা ঘটে শুক্রের মুলুকে। অভিযান সফল হওয়ার পর জ্বালানি খরচ করে আর পৃথিবীতে ফিরিয়ে এনে কী হবে, সেই ভাবনা থেকেই শুক্রের বায়ুমণ্ডলে ইচ্ছা করে ঢুকিয়ে মহাকাশযান ‘ভেনাস এক্সপ্রেস’কে পুড়ে মরতে বাধ্য করে ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সি বা ইসা।

বুধে মৃত্যু হয়েছিল বার্তাবাহকের!

বিপত্তি ঘটেছে এই সৌরমণ্ডলে সূর্যের সবেচেয়ে কাছে থাকা গ্রহটির মুলুকে গিয়েও। বুধের কক্ষপথে ঘুরতে ঘুরতে জ্বালানি ফুরিয়ে গিয়েছিল নাসার ‘মেসেঞ্জার’ মহাকাশযানের। ২০১৫-য় তাকে জোরালো অভিকর্ষ বলের টানে টেনে আছড়ে মারে বুধ। তার উত্তর মেরুতে। যেখানে আছড়ে পড়ে মৃত্যু হয়েছিল ‘মেসেঞ্জারে’র, সেই ছবিও গ্রাউন্ড কন্ট্রোল রুমে পাঠিয়ে গিয়েছিল নাসার মহাকাশযান।

শুক্রের বায়ুমণ্ডলে পুড়ে মরতে বাধ্য করা হচ্ছে ‘ভেনাস এক্সপ্রেস’কে। শিল্পীর কল্পনায়।

গ্রহাণুতে আত্মঘাতী ‘নিয়ার শুমেকার’

গ্রহাণুও বা বাদ যাবে কেন? তাকে চেনা, জানার কৌতূহলেরও মাসুল গুনতে হয়েছে সভ্যতাকে। ২০০১ সালে প্রথম কোনও গ্রহাণুতে পা ছুঁইয়েছিল সভ্যতা। গ্রহাণু ‘৪৩৩ ইরস’-এ পৌঁছেছিল নাসার যান ‘নিয়ার শুমেকার’। কিন্তু পা ছোঁয়ানোর পর অরবিটারে তার রেডিও সিগন্যাল পাঠানোর কাজটা শেষ করে উঠতে পারেনি ‘নিয়ার শুমেকার’। তার মৃত্যু হয়েছিল।

হ্যাঁ, ধূমকেতুতেও আত্মঘাতী হয়েছে আমাদের পাঠানো মহাকাশযান। আজ থেকে ১৪ বছর আগে, ২০০৫-এ। নাসার ‘ডিপ ইমপ্যাক্ট’ মহাকাশযানকে ইচ্ছা করেই আছড়ে ফেলা হয়েছিল ধূমকেতু ‘৯পি/টেম্পল-১’-এর পিঠে। তার পিঠটা কেমন, তা বুঝতে।

মৃত্যুর ঘটনা ধূমকেতুতেও

বছর পাঁচেক আগেকার ঘটনা। ধূমকেতু ‘৬৭পি/চুরিয়ামোভ-গেরাশিমেঙ্কো’র পিঠে ‘রোসেটা’ মহাকাশযান থেকে ‘ফিলি’ ল্যান্ডার নামিয়েছিল ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সি। কিন্তু নামার পর নিখোঁজ, নিরুদ্দেশ হয়ে গিয়েছিল সেই ল্যান্ডার। তন্নতন্ন তল্লাশির পর বছরদু’য়েক আগে অবশ্য খোঁজ মেলে সেই ল্যান্ডারের। কিন্তু তখন আর তার কোনও প্রাণ ছিল না।

ধূমকেতু ‘৬৭পি/চুরিয়ামোভ-গেরাশিমেঙ্কো’র পিঠে নেমে যেখানে হারিয়ে যায় ‘ফিলি’ ল্যান্ডার। ২০১৪-য়।

প্রাণ গিয়েছিল বৃহস্পতিতে!

বৃহস্পতি ছাড়িয়ে আমাদের সৌরমণ্ডলের বাইরের দিকে যেতে গিয়ে জ্বলেপুড়ে মহাকাশযানের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে একাধিক বার। বৃহস্পতির বায়ুমণ্ডলে ঢুকে জ্বলেপুড়ে খাক হয়ে টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে পড়েছিল নাসার ‘গ্যালিলিও’ মহাকাশযান। ২০০৩ সালে।

শনিতে ঝাঁপ মেরেছিল ‘ক্যাসিনি’

আর বছরদু’য়েক আগে শনির বলয়গুলিকে বাঁচানোর জন্য এই সৌরমণ্ডলের সুন্দরতম গ্রহের বায়ুমণ্ডলে ঝাঁপ মেরে আত্মঘাতী হয়েছিল নাসার মহাকাশযান ‘ক্যাসিনি’।

ছবি সৌজন্যে: নাসা

গ্রাফিক: তিয়াসা দাস