৪০ বছর আগেকার কথা। ১৯৭৯ সালের ১০ অগস্ট। রকেট উৎক্ষেপণ শুরু করার সেই দিনটা কিন্তু ইসরোর পক্ষে মোটেই শুভ ছিল না।

অন্ধ্রপ্রদেশের শ্রীহরিকোটা থেকে স্যাটেলাইট লঞ্চ ভেহিক্যালের (এসএলভি-৩) রকেটের পিঠে চেপে রওনা হওয়ার মিনিট দেড়েকের মধ্যেই বঙ্গোপসাগরে ভেঙে পড়েছিল ‘রোহিনী টেকনোলজি ডেমনস্ট্রেটর উপগ্রহ’।

কালামকে সে দিন ‘ফায়ার’ করেননি সতীশ ধওয়ন!

না, তার পরেও ‘মিসাইল ম্যান’ প্রয়াত প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি এ পি জে আবদুল কালামকে সে দিন ‘ফায়ার’ করেননি ইসরোর তদানীন্তন চেয়ারম্যান সতীশ ধওয়ন! বলেননি, ‘দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হল কালামকে’! কোনও শাস্তি-টাস্তি তো দূরের কথা। বরং ওই ঘটনা নিয়ে যখন সমালোচনায় সরব গোটা দেশ, তখন ইসরোর চেয়ারম্যান সতীশ ধওয়ন সাংবাদিক সম্মেলন করলেন। আর সেই সাংবাদিক সম্মেলনে পাশে বসালেন কালামকেই। সকলের সামনে তাঁর পিঠ চাপড়ে দিলেন। যাঁর ‘সব দোষ’, সেই কালামেরই পিঠ চাপড়ালেন ধওয়ন!

চন্দ্রলোকে অভিযান

‘দোষ’টা সে দিন কী করেছিলেন কালাম?

এ বার সেই গল্পটায় একটু ঢোকা যাক। ৪০ বছর আগেকার সেই দিনে ইসরোর ‘রোহিনী’ উপগ্রহ উৎক্ষেপণের মূল দায়িত্বে ছিলেন যে দু’জন, কালাম ছিলেন তাঁদের অন্যতম। বলা ভাল, এক নম্বর।

অন্ধ্রপ্রদেশের শ্রীহরিকোটার লঞ্চপ্যাডে তখন কাউন্টডাউন শুরু হয়েছে। সেই সময়েই ইসরোর গ্রাউন্ড কন্ট্রোল রুমে কম্পিউটার জানাল, ‘রকেটে কোনও যান্ত্রিক ত্রুটি (গ্লিচ) রয়েছে। আর সেটা রয়েছে রকেটের দ্বিতীয় পর্যায়ে (সেকেন্ড স্টেজ)। ফলে, উৎক্ষেপণ হলে তা সফল হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।’

সেই ‘রোহিনী টেকনোলজি ডেমনস্ট্রেটর উপগ্রহ’।

শুধু এইটুকু জানিয়েই কম্পিউটার থেমে গেল না। কাউন্টডাউনও বন্ধ করে দিল। ইসরোর কন্ট্রোল রুমে শুরু হয়ে গেল গুঞ্জন। ‘কী হবে এ বার?’ ‘সব ভেস্তে যাবে?’ কেউ কেউ বলতে শুরু করলেন, ‘কী দরকার এখনই রোহিনী উৎক্ষেপণের? কম্পিউটার যখন বলছে তখন উৎক্ষেপণ স্থগিত রাখাই হোক।’

কথাটা কানে পৌঁছল কালামের। কিন্তু সেই সব কথা কানে তোলার পাত্রই নন কালাম! জানিয়ে দিলেন, ‘‘রোহিনীর উৎক্ষেপণ হবে। নির্ধারিত সময়েই। যা-ই বলুক কম্পিউটার, রোহিনীর যাত্রা আটকে থাকবে না।’’

অ্যালবামের পাতা উল্টে: এ পি জে আবদুল কালাম ও সতীশ ধওয়ন

যন্ত্রকে গুরুত্ব না দিয়ে একেবারেই নিজের দায়িত্বে সে দিন সিদ্ধান্তটা নিয়েছিলেন কালাম। সেটা ভুল হয়েছিল, বোঝা গেল উৎক্ষেপণের কয়েক মুহূর্তের মধ্যে বঙ্গোপসাগরে রোহিনী ভেঙে পড়ার পর।

রোহিনী ভেঙে পড়ার পর কালামের পিঠ চাপড়ালেন ধওয়ন!

মোহনপুরের ‘ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চ (আইসার-কলকাতা)’-এর অধ্যাপক সৌরপদার্থবিজ্ঞানী দিব্যেন্দু নন্দীর কথায়, ‘‘এর পর সবাই সমালোচনা শুরু করে দিল কালামের। আপাতদৃষ্টিতে সেটাই স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু চমকপ্রদ ঘটনা ঘটল তার পর। যখন সকলে চমকে গিয়ে দেখলেন, খোদ সতীশ ধওয়ন ওই ঘটনা নিয়ে ডাকা সাংবাদিক সম্মেলনে তাঁর পাশে বসালেন কালামকে। ব্যর্থতার দায় স্বীকারের পর পিঠ চাপড়ে দিলেন কালামের। বললেন, এই টিমটার উপর যথেষ্ট আস্থা রয়েছে। খুব শীঘ্রই আমরা সফল ভাবে রোহিনী উৎক্ষেপণ করতে পারব। সব ভুল-ত্রুটি শুধরে নিতে পারব। কোনও চিন্তা করবেন না আপনারা।’’

উৎক্ষেপণ সফল হওয়ার পর কালামকেই সামনে এগিয়ে দিলেন ধওয়ন...

ধওয়নের কথাটা সে দিন শুধুই কথার কথা ছিল না। কারণ, তার পর একটা বছরও গড়াল না। রোহিনী উপগ্রহের সফল উৎক্ষেপণ করল ইসরো। পরের বছরেই। ১৯৮০-র ১৮ জুলাই।

দিব্যেন্দু বলছেন, ‘‘মজাটা কি জানেন? সেই সাফল্যের পর ধওয়ন আবার সাংবাদিক সম্মেলন ডাকলেন। কিন্তু সেই সাংবাদিক সম্মেলনে নিজে থাকলেন না। কালামকে দিয়েই করালেন সেই সাংবাদিক সম্মেলন। এটাই ইসরো। এই ভাবেই চলে ইসরো। বিক্রম সারাভাইয়ের হাতে জন্মের পর থেকে ইসরো এই ভাবেই চলে এসেছে। এখনও চলছে। আমার বিশ্বাস, এই ভাবেই চলবে, আগামী দিনেও।’’

যে পথে নামার কথা ছিল (লাল রং), তার থেকে যে ভাবে শেষ মুহূর্তে বদলে গেল বিক্রমের অবতরণের পথ (সবুজ রং)। 

ল্যান্ডার ‘বিক্রম’ চাঁদের পিঠে অবতরণের পর কোনও পৌঁছ সংবাদ (রেডিয়ো সিগন্যাল) এখনও পর্যন্ত পাঠায়নি চাঁদ থেকে ১০০ কিলোমিটার দূরে কক্ষপথে আবর্তনরত চন্দ্রযান-২-এর অরবিটারকে। এর পর ইসরো জানিয়েছে, তাদের এই অভিযান ৯৫ শতাংশ সফল হয়েছে। কারণ, অরবিটার খুব ভাল করছে। আর জ্বালানি সাশ্রয়ের ফলে তার আয়ুও এক বছর থেকে বেড়ে সাত বছর হয়েছে।

ল্যান্ডার ‘বিক্রম’-এর খুঁটিনাটি: দেখুন ইসরো ভিডিয়ো

চন্দ্রযান-২ সফল ৯৫ শতাংশ, কী ভাবে বলছে ইসরো?

এটা আন্দাজে ঢিল মারা নয় তো?

দিব্যেন্দু বলছেন, ‘‘না। এটাও কালামেরই উদ্ভাবিত পদ্ধতি। উৎক্ষেপণের কাউন্টডাউন থেকে শুরু করে সেই অভিযানের শেষ পর্যন্ত কয়েকটি ধাপ থাকে। সেই ধাপগুলি কী ভাবে পেরনো সম্ভব হচ্ছে, সেটা কতটা সফল ভাবে হচ্ছে, তার মুল্যায়ন করেই সেই অভিযানের সাকসেস রেট বা সাফল্যের হার মাপার পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছিলেন কালাম।’’

‘বোঝা’ চাপিয়েছিলেন কালাম, তিনিই এখন উদ্ধারকর্তা!

যে কালাম কম্পিউটারের সিদ্ধান্তকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ৪০ বছর আগে ইসরোর কাঁধে ‘ব্যর্থতার বোঝা’ চাপিয়েছিলেন, সেই কালামেরই পদ্ধতির ভিত্তিতে ইসরো বলতে পারছে ভারতের দ্বিতীয় চন্দ্রাভিযানের সাফল্য কতটা?

ব্যর্থতা তা হলে সত্যি-সত্যিই সাফল্যের প্রধান সোপান হয়ে ওঠে। তাই না?

ছবি ও ভিডিয়ো সৌজন্যে: ইসরো

গ্রাফিক: শৌভিক দেবনাথ