• সুজয় চক্রবর্তী
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

হকিং, পেনরোজ কি উদ্ভাসিত অমল আলোয়? কী বলছে ইতিহাস

hawking, penrose and AKR
মধ্যমণি অমলকুমার রায়চৌধুরী, দু’পাশে স্টিফেন হকিং এবং রজার পেনরোজ। গ্রাফিক: তিয়াসা দাস।

অমল আলোয় কি পরে সত্যিসত্যিই উদ্ভাসিত হয়েছিলেন স্টিফেন হকিং এবং রজার পেনরোজ?

পাঁচের দশকে প্রথম যে আলো ফেলেছিলেন এক বঙ্গসন্তান। অধ্যাপক অমলকুমার রায়চৌধুরী। আইনস্টাইনের মৃত্যুর এক মাসের মধ্যেই। ১৯৫৫ সালে। প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর বিখ্যাত ‘রায়চৌধুরী ইক্যুয়েশন’।

পরে তার স্বীকৃতি কি মিলেছিল হকিং, পেনরোজের কাছ থেকে? আলাপ, আলোচনায় বা তাঁদের গবেষণাপত্রের উল্লেখে অথবা লেখা বইয়ে রায়চৌধুরী ইক্যুয়েশনের গুরুত্ব ও তাৎপর্যকে কি তুলে তুলে ধরেছিলেন হকিং, পেনরোজ? কতটা?

ইতিহাস ঘেঁটে এই প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজল ‘আনন্দবাজার ডিজিটাল’। খতিয়ে দেখল কী ভাবে সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদ প্রকাশের সাড়ে তিন দশক পরে তাঁর ইক্যুয়েশনের পথে হেঁটেছিলেন এক বঙ্গসন্তান আর পরে তার কতটা স্বীকৃতি পেয়েছিলেন হকিং ও পেনরোজের। পশ্চিমী দুনিয়ার।

সর্ব নাশই ভূত, ভবিষ্যতও

সেই ইতিহাস জানাচ্ছে্, অমল আলোতেই প্রথম জানা গিয়েছিল, সর্ব নাশই আমাদের ভূত বা অতীত। সেই সর্ব নাশ হতেও পারে ব্রহ্মাণ্ডের ভবিষ্যতে। পদার্থবিজ্ঞানের পরিভাষায় যা ‘সিঙ্গুল্যারিটি’।

যা সময়কেও পুরোপুরি গিলে ফেলে। যার সর্বগ্রাসী ক্ষুধা এড়াতে পারে না আলোও। ব্রহ্মাণ্ডের স্থান ও কালকে (‘স্পেস-টাইম’) যা এতটাই বাঁকিয়েচুরিয়ে দুমড়ে-মুচড়ে দেয় যে সেই বক্রতা (‘কার্ভেচার’) হয়ে যায় অসীম। যাকে আর মাপা যায় না। কণা বা পদার্থের ঘনত্বও (একক আয়তনে ভর) অসীম হয়ে যায়। অসীম হয়ে যায় অভিকর্ষও। বিজ্ঞানের কোনও নিয়মকানুনই তখন আর খাটে না।

১০৫ বছর আগে, ১৯১৫-র নভেম্বরে যখন তাঁর সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদের গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়, তখনই সেই সর্ব নাশের করাল ছায়া দেখতে পেয়েছিলেন আইনস্টাইন। কিন্তু মানতে চাননি। নিজেকে বার বার প্রশ্ন করেছেন। রয়্যাল সোসাইটির সদস্যদের কাছে বার বার জানতে চেয়েছেন এটা কী ভাবে হয়? হলে তো সর্বনাশ! বাস্তবে এমন ‘কেলেঙ্কারি’ কী ভাবে সম্ভব? যেখানে স্থান ও কাল এমন ভাবে বেঁকে'চুরে যাবে যে তার ভিতরে থাকা বস্তটি (বা, গুলি) একেবারেই হাপিশ হয়ে যাবে! ম্যাজিশিয়ানের ভাষায়, ‘ভ্যানিশ’! উত্তর খুঁজে পাননি সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদের স্রষ্টা।

অমলকান্তিও রোদ্দুর খুঁজে পাননি…

এই কাহিনীর ‘অমলকান্তি’ও ‘রোদ্দুর’ই খুঁজেছিলেন! আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিতাবাদের সমীকরণগুলি থেকে প্রথমে উত্তর কলকাতা ও পরে বালিগঞ্জ প্লেসের বাসিন্দা অমল দেখেছিলেন এক সর্ব নাশা অন্ধকারের ছায়া। এই ব্রহ্মাণ্ডের আদিমতম অতীতে। যা হতে পারে ব্রহ্মাণ্ডের অন্তিম ভবিষ্যতেও।

এই ‘অমলকান্তি’ও সেই সর্বগ্রাসী অন্ধকার থেকে মুক্তির পথ খুঁজেছিলেন। চেয়েছিলেন অন্ধকারের অনিবার্যতার হাত থেকে রেহাই পেতে। পারেননি। সেই ‘রোদ্দুরে’র খোঁজ পাননি এই ‘অমলকান্তি’ও।

অমল কেন ‘রোদ্দুরে’র আশা করেছিলেন?

সচরাচর আমরা যা দেখি সেই নদীর জলস্রোতে জলের সব কণাই তো আর একটি বিন্দুতে গিয়ে মেশে না। কেন মেশে না? সেই স্রোতে জলকণাদের তো ভিন্ন ভিন্ন গতিবেগ থাকে। ঘূর্ণিরও ভিন্নতা থাকে। যা জলকণাদের নিজেদের কাছে আসার টানকে (এটাই অভিকর্ষ) উপেক্ষা করতে পারে। ফলে জলস্রোতের সব কণাই একটি বিন্দুর দিকে এগিয়ে যায় না। তাদের ভিন্ন ভিন্ন দিক থাকতে পারে। থাকেও।

সময় এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে ব্রহ্মাণ্ডের কণাস্রোতেরও তো তেমনটাই হওয়ার কথা। অভিকর্ষের টানে তারা সবাই একে অন্যের গায়ে গিয়ে হামলে পড়বে কেন? তাদেরও কারও কারও গতিবেগ, কারও ঘূর্ণির সেই অভিকর্ষকে উপেক্ষা করার ক্ষমতা তো থাকবেই। তাই অভিকর্ষের টানে ব্রহ্মাণ্ডের সব কণাই একটা সময় পরে কোনও একটা বিন্দুতে গিয়ে মিশে যাবে, এমনটা ভেবে নেওয়া কি ঠিক হবে?

১৯৫৫-য় আইনস্টাইনের মৃত্যুর পর। রায়চৌধুরী ইক্যুয়েশনের সেই গবেষণাপত্র। 

নদী তার চলার পথে কখনও গিরিখাত ধরে এগোতে পারে। সেখানে তার গতিপথটা কিছুটা সঙ্কুচিত হয়ে যায়। ফলে জলস্রোতও তখন আর আগের মতো চওড়া দেখায় না। তা কম এলাকার মধ্যে সঙ্কুচিত হয়ে পড়ে। জলকণাগুলি তখন আরও কাছাকাছি আসে। তাতে তাদের অভিকর্ষের টান আরও বেড়ে যায়। কিন্তু তার পরেও তো তারা একটি বিন্দুতে মিলেমিশে গিয়ে তালগোল পাকিয়ে যায় না। স্রোত সামনের দিকেই বইতে থাকে। তবু তারই মধ্যে গতিবেগ আর ঘূর্ণির ভিন্নতার জন্য কোনও কোনও জলকণা এ-দিকে ও-দিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে। একটি জলকণার তুলনায় অন্যটি দৌড়ে কিছুটা পিছিয়েও পড়ে।

ফারাকটা এই, ব্রহ্মাণ্ডের কণাস্রোত শুধুই সামনের দিকে এগোয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে। সেই স্রোতের কোনও কণাই এ-দিকে ও-দিকে ছড়িয়ে, ছিটকে প়ড়ে না। একের তুলনায় অন্যটি পিছিয়েও পড়ে না। 

রোদ্দুরের পরিবর্তে ফোকাস্‌ড বিন্দু!

অমল দেখলেন সামনের দিকে এগোতে গিয়ে ব্রহ্মাণ্ডের সব কণাস্রোতই কোনও একটি বিন্দুতে ‘ফোকাস্ড’ হয়ে যাচ্ছে। সব কণার গতিপথ একটি বিন্দুতে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। আতস কাচ দিয়ে আলোকে যে ভাবে আমরা একটি বিন্দুতে নিয়ে আসি। কাগজের কোনও একটি বিন্দু সেই আলোয় পুড়ে কালোও হয়ে যায়। ফলে, অমল ‘রোদ্দুর’ খুঁজে পেলেন না!

পরিবর্তে দেখলেন, এই সর্ব নাশই, এই সর্বগ্রাসী অন্ধকারই আমাদের ব্রহ্মাণ্ডের আদিমতম অতীত। এমনকী, তা হতে পারে তার অন্তিম ভবিষ্যতও।

দেখালেন এটাই আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদের সমীকরণগুলির অনিবার্য ও অবশ্যম্ভাবী পরিণতি। ‘ইনএভিটেব্‌ল কনসিকোয়েন্স’। সিঙ্গুল্যারিটি। যেখানে পৌঁছে কোনও পদার্থ আর তার অণু, পরমাণুর ঘনত্ব অসীম হয়ে যায়। ব্রহ্মাণ্ডের স্থান-কালের বক্রতাও অসীম হয়ে যায়। যেখানে পৌঁছলে আলোর বেরিয়ে আসার পথ বন্ধ হয়ে যায়। এমনকী, সময় বা কাল (‘টাইম’)-এরও আর অস্তিত্ব থাকে না। বিজ্ঞানের সব নিয়মকানুন, যাবতীয় ব্যাখ্যাই (‘ফিজিক্যাল ল’জ’) অচল হয়ে পড়ে। আর কাজে লাগে না। এটাই রায়চৌধুরী ইক্যুয়েশন নামে আজ জগদ্বিখ্যাত। বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় যার প্রয়োগ উত্তরোত্তর বেড়েই চলেছে। সাড়ে ৬ দশক ধরে।

অ্যালবামের পাতা উল্টে। প্রয়াত পদার্থবিজ্ঞানী অমলকুমার রায়চৌধুরী।

একটা নির্দিষ্ট সময় পরে ব্রহ্মাণ্ডের সব কিছুই এই অনিবার্যতার ক্রীতদাস! যা থেকে পরিত্রাণের কোনও উপায়ই নেই। অসম্ভবই।

সময়ের এগিয়ে যাওয়ার ইতিহাস খোঁজার পথেই সময়কে পিছিয়ে নিয়ে গিয়ে অতীত-সন্ধানও করা সম্ভব। গণিতের মাধ্যমেই।

অতীতটা কেমন ছিল? তা ভবিষ্যতের ছবি থেকেও কল্পনা করা সম্ভব, গাণিতিক সূত্রেই। অমল সেটাই করেছিলেন।

তাঁর সুবিধা হয়েছিল, বছরকুড়ি আগেই এডউইন হাব্‌ল দেখিয়েছেন, ব্রহ্মাণ্ডের গ্যালাক্সিগুলি একে অন্যের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। দুরে সরে যাচ্ছে সবক’টি মহাজাগতিক বস্তুই। যে ভাবে ক্রমশ ফুলে ওঠা একটি বেলুনের গায়ের দু’টি বিন্দুর মধ্যে দূরত্ব বেড়ে যায় উত্তরোত্তর।
হাব্‌ল দেখালেন ব্রহ্মাণ্ড উত্তরোত্তর প্রসারিত হচ্ছে বেলুনের মতোই। যার মানে অতীতে সেটা তুলনায় সঙ্কুচিত ছিল। আরও অতীতে ছিল সেটা আরও বেশি সঙ্কুচিত। এই ভাবেই অমল পৌঁছে গেলেন ব্রহ্মাণ্ডের সেই আদিমতম বিন্দুতে। যার নাম বিগ ব্যাং। যে বিন্দুতে এই ব্রহ্মাণ্ডের সংকোচন ছিল অসীম। তার বক্রতাও ছিল অসীম। ফলে সেই সময় কণা বা পদার্থের কোনও আয়তনই ছিল না। ঘনত্ব ছিল অসীম। যেন কণাদের যাবতীয় আয়তন, তাদের চলার পথের সব বক্রতাকে কেউ গোগ্রাসে গিলে খেয়েছে। কিছুই ফেলে রাখেনি! যা আদতে সিঙ্গুল্যারিটিই।

অতীত, ভবিষ্যতের দুই মহারাক্ষস

১৩৭০ কোটি বছরের ব্রহ্মাণ্ড সময়ের সঙ্গে পিছতে পিছতে একটি বিন্দুতে গিয়ে মেশে। যেখানে কোনও কণা বা পদার্থের ঘনত্ব অসীম হয়ে যায়। আলো বেরিয়ে আসে না। সময় বলে কিছুর আর অস্তিত্ব থাকে না। ফলে, সময়কে আর পিছিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না। ব্রহ্মাণ্ডের বক্রতাও হয়ে যায় অসীম। যেন সব কিছুই গিলে খায়। ‘মহারাক্ষস’। সেটাই বিগ ব্যাং বা মহা-বিস্ফোরণ। যা থেকে জন্ম হয়েছিল ব্রহ্মাণ্ডের। এটাই বিগ ব্যাং সিঙ্গুল্যারিটি। যাকে ‘টাইম-লাইক সিঙ্গুল্যারিটি’ও বলা হয়।

সিঙ্গুল্যারিটি থিয়োরেমের দুই পুরোধা। স্টিফেন হকিং এবং রজার পেনরোজ।

আবার একটা নির্দিষ্ট সময় পর ব্রহ্মাণ্ডের সব কণা, পদার্থ, আলো, স্থান, কালও গিয়ে মিশতে পারে একটি বিন্দুতে। যেখান থেকে কেউই বেরিয়ে আসতে পারে না। সময়কেও আর এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না। সেই অনিবার্য পরিণতির নামই ব্ল্যাক হোল বা কৃষ্ণগহ্বর। আর এক মহারাক্ষস। এটা ব্ল্যাক হোল সিঙ্গুল্যারিটি। যাকে ‘লাইট-লাইক সিঙ্গুল্যারিটি’ও বলা হয়।

ব্রহ্মাণ্ড সমসত্ত্ব নয়

সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদের গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হওয়ার পরের বছরই বিজ্ঞানী সোয়ের্শচাইল্ড দেখিয়েছিলেন, একটা বিন্দুতে পৌঁছে বিজ্ঞানের সব নিয়মকানুন অচল হয়ে পড়ছে।

যাঁরা সেটা মানতে চাননি (আইনস্টাইনও), তাঁদের যুক্তি ছিল, একটি অতি সাধারণ ধারণার ভিত্তিতে সোয়ের্শচাইল্ডের এই গাণিতিক সিদ্ধান্ত। যেখানে একটি নক্ষত্রকে ধরে নেওয়া হয়েছিল তা আদ্যোপান্ত সমসত্ত্ব। ‘হোমোজিনিয়াস’। তার সর্বত্র পদার্থ একেবারে সম পরিমাণে আছে। সম্পদের ভাগ-বাঁটোয়ারায় কোনও বৈষম্য, ভেদাভেদ নেই। সেই নিখাদ গোলকের একেবারে কেন্দ্রস্থলে প্রকৃতির সব নিয়মই অচল। ব্যাখ্যার অযোগ্য। অসীম সংখ্যা যেমন।

কিন্তু কোনও নক্ষত্রের সর্বত্র পদার্থ তো সম পরিমাণে না-ও থাকতে পারে। বাস্তবে তা থাকেও না।। তাই তার কেন্দ্রবিন্দুতেই বিজ্ঞানের সব নিয়মকানুন অচল হয়ে পড়ছে, এই সিদ্ধান্তে কোথাও যেন খামতি রয়েছে।

পৃথিবীরও সর্বত্র সমান নয়। কোথাও পাহাড়, কোথাও সমতল, কোথাও বা নদী। পদার্থ সর্বত্র সম পরিমাণে নেই। ব্রহ্মাণ্ডও সে রকমই।

অসীমকে বিজ্ঞান অগ্রাহ্য করে। যেহেতু সেখানে বিজ্ঞানের কোনও নিয়মই খাটে না। তাই অসীম দূরত্বে থাকা কোনও বস্তুর উপর হামলে পড়ে কখনওই তার গুণাগুণ, আচার, আচরণ বোঝার চেষ্টা করে না বিজ্ঞান। সেটা করে ওই বস্তু থেকে একটা নির্দিষ্ট দূরত্বে থেকে। যত দূর পর্যন্ত বিজ্ঞানের নিয়মকানুন খাটে, সেই সসীম দূরত্ব অবধি।

অমলও সেটাই চেয়েছিলেন। কিন্তু সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদের সমীকরণগুলির সমাধান করতে গিয়ে দেখলেন একটা নির্দিষ্ট সসীম সময়ের পরে সেগুলির সব ফলাফলই অসীম হয়ে যাচ্ছে। মিশে যাচ্ছে এমন একটি বিন্দুতে যেখানে বিজ্ঞানের আর কোনও নিয়মই খাটছে না।

সোয়ের্শচাইল্ডের পরেও পাঁচের দশকের গো়ড়ার দিক পর্যন্ত আরও কয়েকটি সলিউশান বা মডেলে ইঙ্গিত মেলে সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদের সমীকরণগুলির অবশ্যম্ভাবী পরিণতি আসলে সিঙ্গুল্যারিটিই।

সেই মডেলগুলির অন্যতম ‘ওপ্‌নহাইমার-স্নাইডার মডেল’, ‘ল্যমঁত্রে মডেল’, ‘ফ্রিডম্যান ক্লোজ্‌ড মডেল’ এবং ‘দ্য সিটার সলিউশন’।

কণার চলার পথ: নিউটন বনাম আইনস্টাইন

ব্রহ্মাণ্ড চলছে কী ভাবে?

ব্যাখ্যা করতে গিয়ে নিউটন গোটা ব্রহ্মাণ্ডকে একটা সমতল ধরে নিয়েছিলেন। তাঁর প্রথম সূত্র বলেছিল, বাইরে থেকে কোনও বল (‘ফোর্স’) প্রয়োগ না করা হলে কোনও কণা বা পদার্থ এই ব্রহ্মাণ্ডে একটি বিন্দু থেকে আর একটি বিন্দুতে যায় সরলরেখায়। সবচেয়ে সহজ পথ ধরে। দু’টি বিন্দুর মধ্যে এটাই ওই কণা বা পদার্থের সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত পথ। ‘জিওডেসিক’।

পদার্থবিজ্ঞানের দুই কিংবদন্তী। আইজ্যাক নিউটন এবং অ্যালবার্ট আইনস্টাইন।

আইনস্টাইনের পথটা নিউটনের থেকে বেঁকে গেল এইখানেই।

ব্রহ্মাণ্ডে তিন ধরনের জিওডেসিক

এই জিওডেসিক মূলত তিন রকমের হয়। আলোর কণা বা ফোটনের মতো ভরশূন্য কণাগুলি মহাকাশে (‘স্পেস’) দু’টি বিন্দুর মধ্যে যে সংক্ষিপ্ততম বাঁকা পথ ধরে চলে কোনও বলপ্রয়োগ ছাড়াই, তাকে বলে ‘নাল জিওডেসিক’ বা লাইট-লাইক জিওডেসিক। সিঙ্গুল্যারিটি নিয়ে ’৬৫-তে প্রকাশিত পেনরোজের গবেষণার মূল বিষয় ছিল এই নাল জিওডেসিক। যে সিঙ্গুল্যারিটি আসলে কোনও ব্ল্যাক হোলের কেন্দ্রবিন্দু।

আরও পড়ুন- আইনস্টাইনের সংশয় দূর করেই পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল রজার পেনরোজের, সঙ্গে আরও দুই​

আরও পড়ুন- আমার বন্ধু রজার​

আর ভর আছে এমন কণাগুলি দু’টি বিন্দুর মধ্যে যে সংক্ষিপ্ততম বাঁকা পথ ধরে চলে কোনও বলপ্রয়োগ ছাড়াই, তাকে বলে টাইম-লাইক জিওডেসিক। রায়চৌধুরী ইক্যুয়েশন প্রথম প্রকাশিত হওয়ার সময় অমল যার উপর গবেষণা করেছিলেন। যে সিঙ্গুল্যারিটির বিন্দুটি আসলে বিগ ব্যাং।

এ ছাড়াও আর এক ধরনের জিওডেসিক আছে। স্পেস-লাইক জিওডেসিক। যার পরিণতি স্পেস-লাইক সিঙ্গুল্যারিটিতে। 

সোজা পথ, বাঁকা পথ

সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদে আইনস্টাইন বললেন, কণাদের চলার পথ ব্যাখ্যা করতে বলের কোনও প্রয়োজনই নেই। ব্রহ্মাণ্ডের চেহারাটা কোথায় কেমন হবে তা নির্ভর করে সেখানে কত ভরের বস্তু আছে তার উপর। সেই ভর যত বেশি হবে তার চলার পথে ব্রহ্মাণ্ডের সেখানটা তত বেশি দুমড়ে-মুচড়ে (‘কার্ভেচার’) যাবে। এটাই অভিকর্ষ (‘গ্র্যাভিটি’)।

ব্রহ্মাণ্ড তখন আর সমতল থাকবে না বলে একটি বিন্দু থেকে অন্য বিন্দুতে সেই বস্তটি তখন আর সরলরেখা ধরে যাবে না। পথটা বেঁকে যাবে। তবে সেটাও দু’টি বিন্দুর মধ্যে কণাটির সংক্ষিপ্ততম দূরত্বই হবে। ব্রহ্মাণ্ডে কোনও কণা বা পদার্থের এটাই আদত জিওডেসিক। চলার সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত পথ।

হার মানছে অভিকর্ষ। বিগ ব্যাংয়ের পর এই ভাবেই ফুলে উঠেছে, ফুলে চলেছে ব্রহ্মাণ্ড।

যার অর্থ, নিউটন যেখানে ভেবেছিলেন কোনও বলপ্রয়োগ না করা হলে দু’টি বিন্দুর মধ্যে কোনও কণার চলার পথটা সব সময়ই সরলরেখা, সেখানে আইনস্টাইন দেখালেন, বলপ্রয়োগ না করা হলেও ব্রহ্মাণ্ডে যে কোনও কণারই দু’টি বিন্দুর মধ্যে চলার পথটা আদতে বক্র রেখা। সরলরেখা নয়।

সব জিওডেসিকই একটি বিন্দুতে গিয়ে মিশে যাচ্ছে!

কলকাতার ‘ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য কাল্টিভেশন অব সায়েন্সেস (আইএসিএস)’-এর অ্যাকাডেমিক ডিন অধ্যাপক সৌমিত্র সেনগুপ্তের কথায়, ‘‘অমলই প্রথম দেখালেন, সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদ কণাদের যে সংক্ষিপ্ততম বক্র পথের কথা বলছে, সেই পথগুলি একটা নির্দিষ্ট সময় পরে একটি বিন্দুতে গিয়ে মিশে যাচ্ছে। মিলে যাচ্ছে। ফলে, সেখানকার স্থান ও কালের বক্রতা অসীম হয়ে যাচ্ছে। সেখান থেকে কণাগুলির আগের আলাদা আলাদা বক্র পথগুলিকে আর বের করে আনা যাচ্ছে না। বিন্দুর সেই অসীম বক্রতায় কণাগুলির সবক’টি পথই তালগোল পাকিয়ে গিয়েছে। এটাই রায়চৌধুরী ইক্যুয়েশন।’’

বরিশাল থেকে ভায়া কলকাতা সিঙ্গুল্যারিটির পথে

বাংলাদেশের বরিশালে জন্ম অমলের, ১৯২৩-এ। প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বিএসসি এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএসসি করার পর আইএসিএস-এর এক্স-রে ক্রিস্টালোগ্রাফির গবেষণাগারে চাকরি পান। রিসার্চ সায়েন্টিস্ট হিসেবে। কাজটা মনঃপুত হচ্ছিল না। ছেড়ে চলে যান আশুতোষ কলেজে। সেখানেও ভাল লাগল না, তাই ফিরে আসেন আইএসিএস-এ। পাঁচের দশকের গোড়ায়।

’৫৩-য় তাঁর গবেষণাপত্রটি জমা দেন নামজাদা আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান-জার্নাল ‘ফিজিক্যাল রিভিউ’-এ। গবেষণাপত্রের শিরোনাম ছিল- ‘রিলেটিভিস্টিক কসমোলজি, ওয়ান’। তার পর টানা দু’বছরের টালবাহানা। প্রতীক্ষা। গবেষণাপত্রটি শেষমেশ প্রকাশিত হয় ’৫৫-য়।

‘‘এই সমীকরণের মৌলিকত্ব, মর্মার্থ ও গুরুত্ব বুঝে উঠতেই সম্ভবত দেরি হয়েছিল রেফারিদের। বিলম্বের জন্য জার্নালের সম্পাদকও স্যরের (অমল রায়চৌধুরী) কাছে দুঃখপ্রকাশ করেছিলেন’’, বললেন অন্যতম প্রিয় ছাত্র সৌমিত্র। ’৭৮ থেকে ’৮৩ পর্যন্ত একটানা যিনি ছাত্র ছিলেন অমলের। তার পরেও ২০০৫ সালে মৃত্যু পর্যন্ত অমলের কাছে ছিল তাঁর প্রায় নিত্য আনাগোনা।

একটি মজার খবর দিলেন কলকাতার ‘টেগোর সেন্টার ফর ন্যাচারাল সায়েন্সেস অ্যান্ড ফিলোজফি’র ডিস্টিংগুইশ্‌ড ফেলো অধ্যাপক পার্থ ঘোষ। তাঁর মন্তব্য, ‘‘অমলবাবু এক বার আমাকে ফিজিক্যাল রিভিউয়ে ওঁর সেই গবেষণাপত্র প্রকাশের কাহিনী শুনিয়েছিলেন। জমা দেওয়ার পর গবেষণাপত্রটি দু’বছর প্রকাশিত হয়নি। তখন চিঠিপত্রের মাধ্যমেই জার্নাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন গবেষক, অধ্যাপকরা। জমা দেওয়ার বেশ কিছু দিন পর এক রেফারি গবেষণাপত্রটি পড়ে জার্নাল-কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো তাঁর মন্তব্যে জানিয়েছিলেন আগের কোনও লিটারেচারেই তিনি এমন সমীকরণের কোনও উল্লেখ খুঁজে পাননি। এই গল্প বলে অমলবাবু একটু মুচকি হেসে আমাকে বলেছিলেন, ‘‘পাবেন কী ভাবে? ওটা তো আমিই প্রথম করে দেখালাম।’’

মনে হল, উনি ভাবছেন রেফারি কতটা নির্বোধ!

হকিংয়ের পিএইচডি পেপারে রায়চৌধুরীর উল্লেখ

ইতিহাস জানাচ্ছে, অমলের সমীকরণটি প্রকাশিত হওয়ার পর পরই তা নিয়ে কৌতূহলী হয়ে ওঠে আইনস্টাইনের তত্ত্ব ও অভিকর্ষ নিয়ে গবেষণা করা বিশ্বের বিজ্ঞানীমহল।

সেটা ১৯৬৪। কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করছেন স্টিফেন হকিং। তাঁর কাজও কসমোলজি নিয়ে। রায়চৌধুরী ইক্যুয়েশনের কথা কানে পৌঁছল হকিংয়ের। সমীকরণটি দেখেই তার তাৎপর্য বুঝতে পেরেছিলেন হকিং। গবেষণাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে তাঁকে রায়চৌধুরী ইক্যুয়েশন ব্যবহার করতে হয়েছিল।

’৬৬-তে প্রকাশিত তাঁর পিএইচডির-র গবেষণাপত্রের প্রথম পাতাতেই রায়চৌধুরী ইক্যুয়েশনের শরণাপন্ন হওয়ার কথা স্বীকার করেছিলেন হকিং। রয়্যাল সোসাইটির জার্নালে প্রকাশিত হকিংয়ের সেই গবেষণাপত্রের শিরোনাম ছিল ‘দ্য অকারেন্স অব সিঙ্গুল্যারিটিজ ইন কসমোলজি’। গবেষণাপত্রের ‘ইনট্রোডাকশন’-এর একাদশ লাইনেই রায়চৌধুরী ইক্যুয়েশনের উল্লেখ করেছিলেন হকিং। পরে ‘রেফারেন্স’ সেকশনেও ছিল তার উল্লেখ।

হকিংয়ের পিএইচডির গবেষণাপত্র। ইনট্রোডাকশানেই রায়চৌধুরী ইক্য়ুয়েশনের উল্লেখ।

পেনরোজের গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত (জানুয়ারি, ’৬৫) হওয়ার ৬ মাসের মধ্যেই ‘ফিজিক্স লেটার্স’-এ হকিং এবং জি এফ আর এলিসের একটি গবেষণাপত্র বেরয়। তার শিরোনাম- ‘সিঙ্গুল্যারিটিজ ইন হোমোজিনিয়াস ওয়ার্ল্ড মডেলস’। সেই গবেষণাপত্রেই প্রথম স্পষ্ট ভাবে উল্লেখ করা হয় রায়চৌধুরী ইক্যুয়েশনের প্রয়োজনীয়তা।

’৭০-এ হকিং, পেনরোজের গবেষণাপত্রে রায়চৌধুরী এফেক্ট

’৬৫-তেই সিঙ্গুল্যারিটি নিয়ে রজার পেনরোজের প্রথম গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়। ‘ফিজিক্যাল রিভিউ লেটার্স’-এ। পেনরোজ তখন ইংল্যান্ডের বার্কবেক কলেজে পড়ান। যার শিরোনাম ছিল ‘গ্র্যাভিটেশনাল কোলাপ্স অ্যান্ড স্পেসটাইম সিঙ্গুল্যারিটিজ’। তার পর ’৭০ পর্যন্ত প্রায় প্রতি বছরই সিঙ্গুল্যারিটি নিয়ে হকিংয়ের সঙ্গে পেনরোজের যৌথ গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়।

সেই সর্বশেষ গবেষণাপত্রটির শিরোনাম ছিল ‘দ্য সিঙ্গুল্যারিটিজ অব গ্র্যাভিটেশনাল কোলাপ্স অ্যান্ড কসমোলজি’। প্রকাশিত হয় রয়্যাল সোসাইটির জার্নালে। সেই গবেষণাপত্রেও উল্লেখ ছিল রায়চৌধুরী ইক্যুয়েশনের। লেখা হয়েছিল ‘রায়চৌধুরী এফেক্ট’। গবেষণাপত্রের ৫৪০ পৃষ্ঠার শেষ অনুচ্ছেদে লেখা হয়, ‘‘দ্য ফ্যাক্ট দ্যাট দে ডু ইজ এসেন্সিয়ালি আ কনসিকোয়েন্স অব দ্য রায়চৌধুরী এফেক্ট (১৯৫৫)।’’

রায়চৌধুরী ইক্যুয়েশনের উল্লেখ হকিংয়ের বইতেও

সাতের দশকেই জি এফ আর এলিসের সঙ্গে লেখা হকিংয়ের বই ‘দ্য লার্জ স্কেল স্ট্রাকচার অব স্পেস-টাইম’ প্রকাশিত হয়। রায়চৌধুরী ইক্যুয়েশনে তাঁর অনুপ্রাণিত হওয়ার কথা সেই বইয়ে অনেকটা জায়গা জুড়ে লিখেছেন হকিং।

বইটির ৭৮ পৃষ্ঠায় ‘দ্য ফিজিক্যাল সিগনিফিকেন্স অব কার্ভেচার’ শীর্ষক চতুর্থ অধ্যায়ে হকিং এবং এলিস লিখেছেন, ‘‘সিঙ্গুল্যারিটি থিয়োরেমের প্রমাণগুলির মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে রায়চৌধুরী ইক্যুয়েশনের।’’

হকিংয়ের বইয়ে। রায়চৌধুরী ইক্য়ুয়েশনের কী ভূমিকা ছিল সিঙ্গুল্যারিটি থিয়োরেমে? 

রায়চৌধুরী ইক্যুয়েশনের গুরুত্ব বোঝাতে বইটির ৮৪ পৃষ্ঠাতেও হকিং এবং এলিস লেখেন, ‘‘আগামী দিনে সিঙ্গুল্যারিটির গবেষণায় এই সমীকরণের খুব বড় ভূমিকা থাকবে।’’

পরে ভারত-সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তাঁদের বক্তৃতাতেও রায়চৌধুরী ইক্যুয়েশনে তাঁর অনুপ্রাণিত হওয়ার কথা স্বীকার করেছিলেন হকিং-পেনরোজ।

জার্মানিতে প্রথম বলেন রতনলাল ব্রহ্মচারী

খড়্গপুরের ‘ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (আইআইটি)’-র অধ্যাপক সায়ন কর বললেন, ‘‘আমি শুনেছি, রায়চৌধুরী ইক্যুয়েশন যখন প্রথম প্রকাশিত হল ’৫৫ সালে তখন সত্যেন্দ্রনাথ বসুর ছাত্র, পরে বিশিষ্ট বাঘ-বিশেষজ্ঞ রতনলাল ব্রহ্মচারী ছিলেন জার্মানিতে। সেই সময় একটি সেমিনারে অমলের গবেষণাপত্রটি নিয়ে আলোচনা হয় মূলত রতনলালের উৎসাহেই। তিনি এই ইক্যুয়েশনটি সম্পর্কে বিজ্ঞানী এঙ্গলবার্ট শ্যুকিংয়ের গ্রুপের সদস্যদের প্রথম জানান বলে শুনেছি। এর পর কেম্ব্রিজে হয়েল-নারলিকার তত্ত্ব নিয়ে (‘স্টেডি স্টেট থিয়োরি’) নিয়ে কাজ করার সময়েই সম্ভবত রায়চৌধুরী ইক্যুয়েশনের কথা জানতে পারেন স্টিফেন হকিং। হয়তো সেই সময় জানতেন পেনরোজও। ’৬৫-তে প্রকাশিত তাঁর গবেষণাপত্রে রায়চৌধুরী ইক্যুয়েশনের উল্লেখ না থাকলেও পরে বিভিন্ন গবেষণাপত্রে এই ইক্যুয়েশনের উল্লেখ করেছেন পেনরোজ।’’

রায়চৌধুরী ইক্যুয়েশনই আমার চোখ খুলে দিয়েছিল: নারলিকার

অমলের মৃত্যুর পরের বছরই (২০০৬) তাঁর স্মরণে একটি লেখায় পুণের ‘ইন্টার-ইউনিভার্সিটি সেন্টার ফর অ্যাস্ট্রোনমি অ্যান্ড অ্যাস্ট্রোফিজিক্স (আয়ুকা)’-র এমেরিটাস অধ্যাপক জয়ন্তবিষ্ণু নারলিকার সবিস্তারে জানান কী ভাবে তাঁর প্রথম আলাপ হয়েছিল অমলের সঙ্গে, টেক্সাসে। সেই সময় কেম্ব্রিজে পিএইচডি করছেন নারলিকার। তাঁর সুপারভাইজার বিশিষ্ট মহাকাশবিজ্ঞানী ফ্রেড হয়েল। যাঁর সঙ্গে পরে বিগ ব্যাংয়ের পাল্টা তত্ত্ব খা়ড়া করেছিলেন নারলিকার। ‘স্টেডি স্টেট থিয়োরি’।

মূল্যায়ন। অধ্যাপক জয়ন্তবিষ্ণু নারলিকারের চোখে রায়চৌধুরী ইক্যুয়েশন।

নারলিকার লিখেছেন, ‘‘’৬০ সালেই আমি প্রথম পরিচিত হই রায়চৌধুরী ইক্যুয়েশনের সঙ্গে। সেই সময়ের অন্য একটি মডেলের (হেকম্যান-শ্যুকিং) দাবির সারবত্তা কতটা তা বোঝার জন্য ব্যাকগ্রাউন্ডের কাজ করতে গিয়ে। ওই ইক্যুয়েশনই হয়েল আর আমার চোখ খুলে দিয়েছিল। বুঝেছিলাম দুই জার্মান বিজ্ঞানী হেকম্যান ও শ্যুকিংয়ের যে মডেলকে ঘিরে নানা ধরনের প্রত্যাশার জন্ম হয়েছে তা কোনও দিনই পূরণ হওয়ার নয়।’’

তখন থেকেই নারলিকার আর হয়েল আগ্রহী হয়ে উঠেছিলেন একেআর-এর (অমলের সংক্ষিপ্ত নাম) সঙ্গে দেখা করার জন্য।

ফ্রেড হয়েল ভেবেছিলেন অমলের বয়স অনেক!

সুযোগটা এল ১৯৬৩-তে। টেক্সাসে একটি সেমিনারে হয়েল, নারলিকারের সঙ্গে দেখা হয়েছিল অমলের। সেই প্রথম। অমল সেখানে ছিলেন আমন্ত্রিত বক্তা।

নারলিকার লিখেছেন, ‘‘সেই সময় একেআর-কে দেখে অবাক হয়ে যান হয়েল। ওঁর সমীকরণ দেখে হয়েল ভেবেছিলেন সমীকরণের যা গভীরতা তা কোনও অল্প বয়সের কারও মাথা থেকে বেরতে পারে না। নিশ্চয়ই তিনি মধ্যবয়স্ক হবেন। কিন্তু সেই সময় একেআর-এর বয়স মাত্র চল্লিশের কোঠায়।’’

সব সিঙ্গুল্যারিটি থিয়োরেমেরই বীজ

‘ক্লাসিক্যাল অ্যান্ড কোয়ান্টাম গ্র্যাভিটি’ জার্নালে ২০১৪-য় প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে (‘দ্য নাইন্টিন সিক্সটি ফাইভ পেনরোজ সিঙ্গুল্যারিটি থিয়োরেম’) স্পেনীয় অধ্যাপক হোসে এম এম সেনোভিয়া ও রচেস্টারের ওকল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডেভিড গারফিঙ্কল লেখেন, ‘‘আইনস্টাইনের মৃত্যুর এক মাসের মধ্যেই শুরু হয় সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদের নবযুগ। রায়চৌধুরী ইক্যুয়েশনের মাধ্যমে। যার মধ্যেই ছিল আগামী দিনের সিঙ্গুল্যারিটি থিয়োরেমের (হকিং-পেনরোজ) বীজ। যা পরে সব রকমের সিঙ্গুল্যারিটি থিয়োরেমেরই ভিত হয়ে দাঁড়িয়েছে।’’

শ্রদ্ধা ও সম্ভ্রম। বিদেশি জার্নালে রায়চৌধুরী ইক্যুয়েশনের তাৎপর্যের উল্লেখ।

তবে এ বার পেনরোজ কিন্তু সিঙ্গুল্যারিটি থিয়োরেমের জন্য নোবেল পুরস্কার পাননি। পেয়েছেন কী ভাবে ব্ল্যাক হোল তৈরি (‘ব্ল্যাক হোল ফর্মেশন’) হয় তা ব্যাখ্যা করার জন্য। যে ব্ল্যাক হোলের কেন্দ্রবিন্দুটাই সিঙ্গুল্যারিটি। যা ঢাকা থাকে ‘ইভেন্ট হরাইজ্‌ন’ দিয়ে। এই দু’টিকে নিয়েই ব্ল্যাক হোল।

তবে সিঙ্গুল্যারিটি না থাকলে ইভেন্ট হরাইজ্‌নের প্রয়োজনই থাকে না। আর সিঙ্গুল্যারিটিই রায়চৌধুরী ইক্যুয়েশনের মর্মবস্তু। তাই ব্ল্যাক হোলের গবেষণায় রায়চৌধুরী ইক্যুয়েশনের তাৎপর্য এতটা।

ভারতীয়রাই চিনতে পারেননি অমলকে!

তবে অমলকে নিয়ে ভারতীয়দের বিড়ম্বনার মধ্যেও পড়তে হয়েছে। সঠিক সময়ে রায়চৌধুরী ইক্যুয়েশনের গুরুত্ব তদানীন্তন ভারতীয় বিজ্ঞানীরা অনুধাবন করতে না পারায়! ’৫৫-য় প্রকাশিত যে সমীকরণটি নিয়ে তার পরের বছর থেকেই আলোড়ন পড়ে যায় পশ্চিমী দুনিয়ায়, এক দশকের মধ্যেই যা গবেষণার অন্যতম হাতিয়ার হয়ে ওঠে হকিং-পেনরোজের, ভারতে তার গুরুত্ব, তাৎপর্যের প্রচার প্রথম শুরু হয় সাতের দশকের গোড়ায়! ’৭২-এ নারলিকার ভারতে ফিরে আসার পর।

অবহেলার অমল! ভারতীয়দের পক্ষে লজ্জার নয়?

ভারতীয়দের সেই লজ্জার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে ২০০৭-এ প্রকাশিত তাঁর একটি প্রবন্ধে জারগেন এহ্‌লার্স কিছুটা কটাক্ষের সুরে লেখেন, ‘‘এর (রায়চৌধুরী ইক্যুয়েশন) গুরুত্ব, তাৎপর্য ও ব্যবহারের দিকটিকে যদিও সেই সময় স্বীকৃতি দেননি ওঁর (অমল) ভারতীয় সতীর্থরা।’’

এখন ফোটন নিয়ে কাজেও ব্যবহৃত রায়চৌধুরী ইক্যুয়েশন

’৬৫-তে সিঙ্গুল্যারিটি নিয়ে প্রকাশিত তাঁর প্রথম গবেষণাপত্রে কিন্তু রায়চৌধুরী ইক্যুয়েশনের কোনও উল্লেখ করেননি পেনরোজ।

’৭৫ থেকে ’৮২ পর্যন্ত অমলের ছাত্রদের অন্যতম মোহনপুরের ‘ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স এডুকেশান অ্যান্ড রিসার্চ (আইসার কলকাতা)’-এর অধ্যাপক নারায়ণ বন্দোপাধ্যায় মনে করেন, এর কারণ হতে পারে পেনরোজ সেই সময় গবেষণা করছিলেন নাল জিওডেসিক বা ভরশূন্য ফোটন কণাদের নিয়ে। রায়চৌধুরী ইক্যুয়েশনের গোড়ার পর্বে অমল কাজটা করেছিলেন টাইম-লাইক জিওডেসিক নিয়ে। ভর আছে এমন কণাদের গতিপথ নিয়ে। তাই হয়তো রায়চৌধুরী ইক্যুয়েশনের উল্লেখের প্রয়োজনীয়তা তখন বোধ করেননি পেনরোজ।

নারায়ণের কথায়, ‘‘সিঙ্গুল্যারিটি সংক্রান্ত পেনরোজের প্রথম গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হওয়ার ৫৫ বছর পর এখন ফোটনের মতো ভরশূন্য কণাদের নিয়ে কাজ করা হলেও রায়চৌধুরী ইক্যুয়েশন ব্যবহার করা হয়। বলা হয়, ‘রায়চৌধুরী ইক্যুয়েশন ফর নাল জিওডেসিক’। ’৬৫ থেকে ’৭০ পর্যন্ত দফায় দফায় পেনরোজের সঙ্গে তাঁর সিঙ্গুল্যারিটি থিয়োরেম পরিমার্জন, পরিবর্ধন করেছেন হকিং। তার পরেও তা করেছেন অন্যরা। রায়চৌধুরী ইক্যুয়েশনেরও পরিমার্জন, পরিবর্ধন হয়েছে। কিন্ত সব সিঙ্গুল্যারিটি থিয়োরেমেরই আদত ভিত হিসেবে থেকে গিয়েছে রায়চৌধুরী ইক্যুয়েশনই। এটাই বেসিক ইক্যুয়েশন। প্রমাণিত হয়েছে এই সমীকরণ শুধুই কোনও বিশেষ ক্ষেত্র বা পরিস্থিতির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য তা নয়; সিঙ্গুল্যারিটির গবেষণায় এই ইক্যুয়েশন সব ক্ষেত্রেই সমান ভাবে প্রয়োজনীয়। গুরুত্বপূর্ণ। হকিং-পেনরোজের সবক’টি সিঙ্গুল্যারিটি থিয়োরিরই মূল ভিত এই রায়চৌধুরী ইক্যুয়েশন।’’

আরও পড়ুন- দার্জিলিঙের সকালে রজার আমাকে সৃষ্টির রূপ বোঝাতে শুরু করলেন​

আরও পড়ুন- ‘আমার তত্ত্বের ফাঁকফোকর খুঁজছি, তোমরাও খুঁজে দেখ’, এখনও বলেন জিম পিবল্‌স​

সায়ন জানাচ্ছেন, ’৫৫-এ প্রকাশিত তাঁর গবেষণাপত্রে অমল যে ভাবে তাঁর সমীকরণটি লিখেছিলেন এখন আর সেটি সে ভাবে লেখা হয় না। মূল বিষয়টি না বদলালেও সেটি লেখা হয় আধুনিক গাণিতিক ভাষায়। আর এ ব্যাপারে জারগেন এহ্‌লার্স এবং রেইনার শ্যাক্সের অবদান অনস্বীকার্য। অমল যে ভাবে তাঁর সমীকরণে পৌঁছেছিলেন তা গত বছর একটি রিভিউয়ে খুব সহজ ভাবে তুলে ধরেন প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এডওয়ার্ড উইট্‌ন।

‘‘৫৫-র কিছু আগে-পরে আর এক বিশিষ্ট বিজ্ঞানী লেভ লান্ডুও তাঁর বই ‘ক্লাসিক্যাল থিয়োরি অব ফিল্ডস’-এ রায়চৌধুরী ইক্যুয়েশনের কাছাকাছি একটি সমীকরণ লিখেছিলেন। কিন্তু সেটি ছিল বিশেষ ক্ষেত্রে ব্যবহারের জন্য। রায়চৌধুরী ইক্যুয়েশন কোনও বিশেষ ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নয় বলেই তার গ্রহণযোগ্যতা তর্কের অতীত’’, বলছেন সায়ন।

মতামতে বিশেষজ্ঞরা। গোলাম মুর্তজা হোসেন (বাঁ দিক থেকে), সায়ন কর, নারায়ণ বন্দোপাধ্যায়, পার্থ ঘোষ, তরুণ সৌরদীপ, সৌমিত্র সেনগুপ্ত এবং অমিতাভ রায়চৌধুরী।

আইসার কলকাতার আর এক অধ্যাপক গোলাম মুর্তজা হোসেনের বক্তব্য, তা সে বিগ ব্যাং সিঙ্গুল্যারিটিই হোক বা ব্ল্যাক হোল সিঙ্গুল্যারিটি, সব ধরনের সিঙ্গুল্যারিটিকেই এক সঙ্গে ব্যাখ্যা করতে পারে রায়চৌধুরী ইক্যুয়েশন। এটাই এই সমীকরণের সর্বজনীনতার এক ও একমাত্র কারণ।

গোলামের কথায়, ‘‘আইনস্টাইনের সমীকরণের বাঁ দিকটা অভিকর্ষ। ডান দিকটা ভর। ’৬৫ থেকে ’৬৯ পর্যন্ত পেনরোজের সঙ্গে সিঙ্গুল্যারিটি থিয়োরেমের পরিমার্জন, পরিবর্ধন করতে গিয়ে হকিং দেখিয়েছিলেন বিভিন্ন ভরের কণার ক্ষেত্রেই রায়চৌধুরী ইক্যুয়েশনকে সমান ভাবে ব্যবহার করা যাচ্ছে। তাই এটা অনস্বীকার্য, রায়চৌধুরী ইক্যুয়েশন ছাড়া হকিং-পেনরোজ সিঙ্গুল্যারিটি থিয়োরেম প্রতিষ্ঠিতই হতে পারতো না।’’

এই সমীকরণ আসলে জ্যামিতিরই

তবে রায়চৌধুরী ইক্যুয়েশনকেই হকিং-পেনরোজ এগিয়ে নিয়ে গিয়েছেন বলে যা প্রচারিত হচ্ছে তার সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করেন আইসার পুণের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ার প্রফেসর আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মহাকাশবিজ্ঞানী তরুণ সৌরদীপ।

তাঁর কথায়, ‘‘এটা বাড়িয়ে বলা হচ্ছে। আসলে হকিং-পেনরোজের সিঙ্গুল্যারিটি থিয়োরেমের খুব গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়েছে রায়চৌধুরী ইক্যুয়েশন। পরবর্তিকালে তা সহায়ক হয়েছে সিঙ্গুল্যারিটি সংক্রান্ত অন্য থিয়োরিগুলিরও পরিমার্জন, পরিবর্ধনে। মূলত জ্যামিতিক সমীকরণ বলে রায়চৌধুরী ইক্যুয়েশনের ব্যবহার উত্তরোত্তর বেড়েছে, বে়ড়ে চলেছে বিজ্ঞানের অন্য কয়েকটি শাখাতেও।’’

তরুণ মনে করেন, রায়চৌধুরী ইক্যুয়েশনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে মূলত একটি কারণে। বিগ ব্যাং সিঙ্গুল্যারিটির ব্যাখ্যা (ফ্রিডম্যান) করতে গিয়ে একটা জায়গায় সমস্যা হচ্ছিল। বিগ ব্যাংয়ের পর ব্রহ্মাণ্ডের সর্বত্র সম পরিমাণে কণা বা পদার্থের বণ্টন হয়েছিল (‘আইসোট্রপিক’) ধরে নেওয়া হলে সেই সিঙ্গুল্যারিটি অনিবার্য, দেখা যাচ্ছিল। কিন্তু বিগ ব্যাংয়ের পর তো কণাদের সর্বত্র সম পরিমাণে বণ্টন হয়নি (‘অ্যানাইসোট্রপিক’)। কিছুটা সময় পর্যন্ত। ব্রহ্মাণ্ড ফুলে উঠতে শুরু করে কিছুটা থমকে, কোনও দিকে বেশি কোনও দিকে কম, এই ভাবেও কিছুটা সময় ফুলেছিল। এমন পরিস্থিতিতে সিঙ্গুল্যারিটি প্রমাণ করা যাচ্ছিল না। রায়চৌধুরী ইক্যুয়েশন ব্যবহার করে দেখানো যায় যে, তা সে আইসোট্রপিক বা অ্যানাইসোট্রপিক যা-ই হোক না কেন ব্রহ্মাণ্ডের টাইম-লাইক সিঙ্গুল্যারিটি হবে সেই বিগ ব্যাং-ই।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতপূর্ব ‘পালিত চেয়ার প্রফেসর’ অমিতাভ রায়চৌধুরী মনে করেন, শুধু সিঙ্গুল্যারিটির ক্ষেত্রেই নয়, রায়চৌধুরী ইক্যুয়েশনের ব্যাপক ব্যবহার শুরু হয়েছে বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখাতেও। তার অন্যতম হাইড্রো-ডায়নামিক্স। যে কোনও বক্রতলের ক্ষেত্রেই এই সমীকরণকে ব্যবহার করা যায়।

অমিতাভ বলছেন, ‘‘পরে দেখা গিয়েছে সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদের সমীকরণগুলি থেকে এই সমীকরণটি বেরিয়ে আসলেও তার উৎস আদতে বিশুদ্ধ গণিতের একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা। জ্যামিতি। সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদের জন্ম না হলেও এই সমীকরণ জ্যামিতি থেকেই বেরিয়ে আসত। তাই জ্যামিতিক আকারের যে কোনও ক্ষেত্রের জন্যই এই সমীকরণ ব্যবহার করা সম্ভব।’’

ব্যাপ্তিই রায়চৌধুরী ইক্যুয়েশনের বড় গুণ

ব্যাপ্তিই পরবর্তিকালে রায়চৌধুরী ইক্যুয়েশনের উপর বিজ্ঞানী, গবেষকদের আগ্রহ বাড়িয়েছে। বাড়িয়ে চলেছে।

সৌমিত্রর কথায়, ‘‘যে কোনও বড় মাপের গবেষণার বিশেষত্ব হল, তা শুধু কোনও একটিমাত্র অজানা বিষয়ের উপর আলোকপাত করে না। সেই গবেষণা আগামী দিনে বিভিন্ন ক্ষেত্রে গবেষণার নতুন নতুন সম্ভাবনাগুলিও তৈরি করে দেয়। এটাই বড় মাপের গবেষণার গুণ। অভিনবত্ব। রায়চৌধুরী ইক্যুয়েশনও তেমনই একটি বড় মাপের গবেষণা যা ভবিষ্যতে বিভিন্ন ক্ষেত্রে নতুন নতুন দিকে গবেষণার সম্ভাবনার জন্ম দিয়েছে।’’

সেগুলি কী রকম?

সৌমিত্র জানাচ্ছেন,  রায়চৌধুরী ইক্যুয়েশনই দেখিয়েছিল আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদের সমীকরণগুলি অনিবার্য ভাবে সিঙ্গুল্যারিটির দিকনির্দেশ করে। আবার এই রায়চৌধুরী ইক্যুয়েশনই পরে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সিঙ্গুল্যারিটিকে এড়ানোর সম্ভাবনাগুলিকে খতিয়ে দেখার গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। সহায়ক হয়েছে। যার মধ্যে অন্যতম হল, খুব বেশি বক্রতায় অভিকর্ষের মডেল কেমন হবে তা বোঝা। ব্রহ্মাণ্ডের স্থান ও কালে ঘূর্ণি (‘টর্শন’) থাকলে সিঙ্গুল্যারিটির অনিবার্যতাকে এড়ানো সম্ভব হয় কি না তা দেখা। ব্রহ্মাণ্ডের আরও অনেক তল (‘ডাইমেনশন’) থাকলে অভিকর্ষ কেমন হবে, তা বোঝার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে এখন রায়চৌধুরী ইক্যুয়েশনই। স্ট্রিং থিয়োরিতেও এই সমীকরণের ভূমিকা অনস্বীকার্য। ‘এডিএস-সিএফটি ডুয়ালিটি’র মতো হলোগ্রাফিক মডেল তৈরির ক্ষেত্রেও এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকছে রায়চৌধুরী ইক্যুয়েশনের।

পরিত্রাতা জ্যামিতিই

পদার্থবিজ্ঞানী হলেও অমল সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদের ধাঁধার জট খুলেছিলেন বিশুদ্ধ গণিতের শাখা জ্যামিতির ভিত্তিতে।

আর সেই অমল আলোতেই আলোকিত হয়ে গণিতের অধ্যাপক রজার পেনরোজ এক দশক পরে হকিংকে সঙ্গে নিয়ে পদার্থবিজ্ঞানের একটি অত্যন্ত জটিল ধাঁধার জট খুলেছিলেন। জন্ম হয়েছিল সিঙ্গুল্যারিটি থিয়োরেমের।

জ্যামিতিই ‘চোখ’ হয়েছিল ব্রহ্মাণ্ডের জ্যামিতির ভবিষ্যত-দর্শনে!

গ্রাফিক: তিয়াসা দাস।

তথ্য সহায়তা: অধ্যাপক পারঙ্গমা সেন, অধ্যাপক সায়ন কর,অধ্যাপক গোলাম মুর্তজা হোসেন।

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন