সম্প্রতি কলকাতা সেন্টার ফর ক্রিয়েটিভিটি-র অ্যাম্ফিথিয়েটারে পরিবেশিত হয় কথাকলি নৃত্যশৈলীতে আধারিত এবং রামায়ণের সুন্দরকাণ্ডে বর্ণিত অশোকবনে সীতা ও হনুমানের কথোপকথনের আবেগপূর্ণ আখ্যান— ‘সীতা অঞ্জনেয় কথা’।
রামায়ণের সুন্দরকাণ্ডে দেখা যায়, রামায়ণের কারাগারে বন্দি সীতা যখন চরম দুর্দশায় দিন কাটাচ্ছিলেন, তখন হনুমান গাছের আড়াল থেকে শ্রীরামের কথা বলে তাঁর মন জয় করেন। শ্রীরামের স্তবগান শুনে সীতা জানতে চান, কে এই স্তবগান করছেন। বৃক্ষ থেকে নেমে হনুমান করজোড়ে সীতার সামনে দাঁড়ান এবং নিজেকে শ্রীরামের ভক্ত ও দূত বলে পরিচয় দেন। তিনি সীতাকে বলেন যে, খুব শীঘ্রই রাম ও লক্ষ্মণ লঙ্কা আক্রমণ করে তাঁকে উদ্ধার করবেন। সীতা হনুমানকে মনে করেন কোনও মুখোশধারী রাক্ষস, তাঁর কথা বিশ্বাস করতে পারেন না। হনুমান তখন শ্রীরামের দেওয়া স্বর্ণ-অঙ্গুরী নিদর্শনস্বরূপ সীতার হাতে তুলে দেন। শ্রীরামের আংটি পেয়ে সীতা আনন্দে কেঁদে ফেলেন এবং হনুমানকে পরম আপনজন হিসেবে গ্রহণ করেন। সীতা হনুমানের কাছে জানতে চান, কবে শ্রীরামচন্দ্র তাঁকে উদ্ধার করে নিয়ে যাবেন। উত্তরে হনুমান বলেন, খুব শীঘ্রই রামচন্দ্র তাঁর বানরসেনা নিয়ে আসবেন। এর পর সীতা তাঁর মস্তক থেকে চূড়ামণি নিয়ে তাঁর হাতে দিয়ে, সেটি শ্রীরামচন্দ্রকে দিতে বলেন। হনুমান সমতলে ওই চূড়ামণি নিয়ে ভক্তিভরে সীতাকে প্রণাম করে, ফিরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন।
বিশ্বাস, ভালবাসা আর অবিচল ভক্তির রসে জারিত রামায়ণের এই চিরন্তন আখ্যানটিকে সুন্দর ভাবে কথাকলি নৃত্যশৈলীতে ফুটিয়ে তুলেছেন কথাকলি নৃত্যশিল্পীদ্বয়— প্রলয় সরকার এবং রম্যাণী রায়। এই প্রথম বার কথাকলি নৃত্যের ইতিহাসে কোনও উপাখ্যান অওয়ধি ভাষায় রচিত হল। ‘সীতা অঞ্জনেয় কথা’ উপাখ্যানটির সংলাপ গৃহীত হয়েছে ‘রামচরিতমানস’ থেকে। প্রাচীন মণিপ্রভলম ভাষার সঙ্গে মলয়ালম এবং সংস্কৃত ভাষার চমৎকার মেলবন্ধনে রচিত হয়েছে এই উপাখ্যান।
সে দিনের সন্ধ্যায় প্রলয় সরকার এবং রম্যাণী রায় তাঁদের অনন্য সাধারণ কথাকলি নৃত্যভঙ্গিমা, অভিনয়, মুদ্রাপ্রয়োগ এবং যথাযথ সাজসজ্জা দ্বারা দর্শকমণ্ডলীকে মোহিত করে রেখেছিলেন। সপ্তসিন্ধু পার হয়ে লঙ্কায় এসে পৌঁছনো, শ্রীরামের রূপবর্ণনা, মাঝেমাঝে হনুমানের স্বভাবসিদ্ধ গা চুলকানো...হনুমানরূপী প্রলয় সরকার তাঁর অসামান্য কথাকলি নৃত্যশৈলী ও অভিনয় দ্বারা এবং মুদ্রা প্রয়োগের সাহায্যে হনুমানের চরিত্রটিকে জীবন্ত করে তুলেছেন। সীতার ভূমিকায় রম্যাণী রায়ও তুলনারহিত। শ্রীরামের জন্য সীতার আবেগ, কান্না ইত্যাদি ভাবগুলিকে রম্যাণী অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে নিপুণ ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। হনুমানের পক্ষে সীতাকে শ্রীরামের অঙ্গুরী দেওয়া এবং বিনিময়ে শ্রীরামকে দেওয়ার জন্য সীতার মাথার চূড়ামণি হনুমানের হাতে দেওয়ার দৃশ্য দু’টি ছিল চমৎকার। পরিশেষে সীতার চূড়ামণি নিয়ে শ্রীরামের কাছে প্রত্যাবর্তনের দৃশ্যে প্রলয় সরকারের অসামান্য পদচালনার দ্বারা কথাকলি নৃত্যের অংশটি সে দিনের দর্শকমণ্ডলীকে এতটাই মুগ্ধ করেছিল যে, তাঁরা দাঁড়িয়ে উঠে করতালির মধ্য দিয়ে শিল্পীদের স্বাগত জানান।
এই মনোমুগ্ধকর সন্ধ্যাটি উপস্থাপন করেন প্রলয় সরকার ও রম্যাণী রায়— যার সূচনা করেন তাঁদের ছাত্রী দীপাঞ্জনা দাস,‘পুরাপ্পাদু’ নামে প্রচলিত কথাকলি নৃত্যপদটি দিয়ে।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)