E-Paper

খণ্ডিত ফর্মে সময়ের প্রতিধ্বনি

সুমন দে-র শিল্পজীবনের শুরু মাইথোলজি ও ফিগারেটিভ চর্চার মধ্য দিয়ে। সেই সব কাজ তাঁকে পরিচিতি ও বাণিজ্যিক সাফল্য এনে দিলেও, এক সময়ে তিনি অনুভব করেন যে, একটি নির্দিষ্ট ছকের মধ্যে তিনি আবদ্ধ হয়ে পড়ছেন।

পিয়ালী গঙ্গোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ০৪ জুলাই ২০২৬ ০৫:০০
কালধ্বনি: ইমামি আর্টে সুমন দে-র একক প্রদর্শনীর শিল্পকর্ম।

কালধ্বনি: ইমামি আর্টে সুমন দে-র একক প্রদর্শনীর শিল্পকর্ম। — নিজস্ব চিত্র।

ইমামি আর্টে আয়োজিত সুমন দে-র দ্বিতীয় একক প্রদর্শনী ‘চান্স রিমেন্স অব অ্যানাদার টাইম’ মূলত সময়, স্মৃতি এবং নগর-অভিজ্ঞতার প্রতিফলন। শিল্পীর সাম্প্রতিক কাজে বিমূর্ততার ভাষা যেমন তৈরি হয়েছে, তেমনই উঠে এসেছে এক গভীর ব্যক্তিগত ও সামাজিক মনস্তত্ত্ব। এই প্রদর্শনী তাঁর শিল্প-পরিক্রমার একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়কে চিহ্নিত করে।

সুমন দে-র শিল্পজীবনের শুরু মাইথোলজি ও ফিগারেটিভ চর্চার মধ্য দিয়ে। সেই সব কাজ তাঁকে পরিচিতি ও বাণিজ্যিক সাফল্য এনে দিলেও, এক সময়ে তিনি অনুভব করেন যে, একটি নির্দিষ্ট ছকের মধ্যে তিনি আবদ্ধ হয়ে পড়ছেন। সেই আত্মসচেতনতা থেকেই শুরু হয় তাঁর ভাষা বদলের অনুসন্ধান। ২০১৪ সাল থেকে দু’বছর টানা অনুশীলন, আর্থিক অনিশ্চয়তা ও শিল্পগত সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তিনি ধীরে ধীরে পৌঁছন বিমূর্ততার এক স্বতন্ত্র পরিসরে। বর্তমান প্রদর্শনীটি সেই দীর্ঘ অনুসন্ধানেরই একটি পরিণত প্রকাশ।

তিন বছর আগে ইমামি আর্টে আয়োজিত সুমনের প্রথম একক প্রদর্শনীতে ব্যক্তিগত স্মৃতি ও বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতা প্রধান হয়ে উঠেছিল। এ বারের প্রদর্শনীতে তাঁর দৃষ্টি আরও বহির্মুখী। ব্যক্তিগত পরিসর প্রসারিত হয়েছে। এখানে শহরের ভাঙন, পরিবেশের পরিবর্তন, ক্রমশ মুছে যাওয়া প্রকৃতি এবং সময়ের ক্ষয়িষ্ণু অভিঘাত এক নতুন ভিসুয়াল ব্যাকরণে প্রকাশ পেয়েছে।

প্রদর্শনীটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক নিঃসন্দেহে এর পলিপ্টিক বিন্যাস। খণ্ড খণ্ড ফ্রেম, বিচ্ছিন্ন আকার, অসম্পূর্ণ জ্যামিতিক গঠন— সব মিলিয়ে একাধিক প্যানেলে একটি ভাঙা নগরের সার্বিক ছায়া। শিল্পী ছোট ছোট অংশকে পাশাপাশি সাজিয়ে একটি বৃহত্তর মানসিক ভূদৃশ্য নির্মাণ করেছেন। কোথাও অর্ধবৃত্ত, কোথাও জং ধরা কাঠের টেক্সচার, কোথাও বা দরজা-জানলার বিমূর্ত সঙ্কেত— সব মিলিয়ে কাজগুলি স্মৃতি ও স্থাপত্যের মাঝামাঝি এক কাতর আবহ তৈরি করে।

কালধ্বনি: ইমামি আর্টে সুমন দে-র একক প্রদর্শনীর শিল্পকর্ম।

কালধ্বনি: ইমামি আর্টে সুমন দে-র একক প্রদর্শনীর শিল্পকর্ম। — নিজস্ব চিত্র।

প্রদর্শনীর আর একটি বড় শক্তি হল তার নীরবতা। এই কাজগুলি উচ্চকিত ভাবে নয়, বরং ধীরে ধীরে দর্শকের মধ্যে প্রবেশ করে। অনেক ছবিতেই শূন্যস্থান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফাঁকা জায়গা, ম্লান রং, ক্ষয়িষ্ণু টেক্সচার— এ সব যেন দৃশ্যমানের পাশাপাশি অদৃশ্যেরও ভাষা তৈরি করে। ফলে কাজগুলি কেবল দেখার অভিজ্ঞতা নয়, গভীর অনুভবের অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়। শিল্পী এখানে স্মৃতিকে সরাসরি আঁকেন না, বরং স্মৃতি মুছে যাওয়ার প্রক্রিয়াকেই দৃশ্যমান করতে চান।

এ ছাড়াও শিল্পীর কাজে বারবার ফিরে আসে সময়ের স্তরবিন্যাস। পুরনো দেওয়ালের মতো জমে থাকা রং, চুঁইয়ে পড়া দাগ কিংবা ক্ষয়ে যাওয়া কাঠের আবরণ যেন ইতিহাসের নীরব সাক্ষী। এই সব টেক্সচার দর্শককে কেবল দৃশ্যের সামনে দাঁড় করায় না, বরং তাকে সময়ের ভিতর প্রবেশ করায়। ফলে কাজগুলি এক ধরনের ধ্যানমগ্ন অভিজ্ঞতা তৈরি করে।

‘উচ্চাকাঙ্ক্ষা’ নামের ন’টি খণ্ডচিত্র বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য। ছবিটির প্রতিটি স্তরে ছড়িয়ে রয়েছে মধ্যবিত্ত জীবনের প্রাথমিক চাহিদা ও আকাঙ্ক্ষার বিমূর্ত সঙ্কেত— রুটি, বাড়ি, বই, জীবিকার প্রতীক। শিল্পী অত্যন্ত সূক্ষ্ম ভাবে দেখিয়েছেন, মানুষের জীবন কী ভাবে প্রয়োজন, সাফল্য ও অনিশ্চয়তার প্লাস-মাইনাসে ক্রমাগত দুলতে থাকে। ছবির নীচে ভাসমান নৌকার প্রতীক সেই জীবনযাত্রার এক অন্তহীন পরিক্রমা— যেখানে টিকে থাকাই আসল লড়াই।

প্রদর্শনীর ‘নেচার’ সিরিজ়ে শিল্পীর সংবেদনশীলতা অন্য মাত্রা পায়। চলাচলের পথে দেখা শুকনো পাতা, কীটপতঙ্গ, ভাঙা ডাল বা পাথরের খণ্ড এখানে কেবল প্রকৃতির অনুষঙ্গ নয়, বরং বিলুপ্ত হতে থাকা কোমলতার স্মারক। আগে যে পৃথিবী মাটি, গাছপালা ও জীবন্ত প্রকৃতিতে ভরপুর ছিল, আজ সেখানে কংক্রিটের আধিপত্য। এই হারিয়ে যাওয়া জৈব অভিজ্ঞতাই শিল্পী বিভিন্ন জ্যামিতিক ফর্ম, প্রজাপতির ভাঙা ডানা কিংবা অসম্পূর্ণ বৃত্তের মাধ্যমে ধরতে চেয়েছেন।

কালধ্বনি: ইমামি আর্টে সুমন দে-র একক প্রদর্শনীর শিল্পকর্ম।

কালধ্বনি: ইমামি আর্টে সুমন দে-র একক প্রদর্শনীর শিল্পকর্ম। — নিজস্ব চিত্র।

রঙের ব্যবহার অত্যন্ত সংযত এবং তাৎপর্যময়। ধূসর, ক্ষয়িষ্ণু সবুজ, মাটি-রং, পোড়া বাদামি এবং ফ্যাকাসে গোলাপি এক ধরনের সময়-ক্ষয়ের অনুভূতি তৈরি করে। কোথাও স্যাঁতসেঁতে ভাব, কোথাও জং ধরা আবরণ—এ সবই শিল্পীর দীর্ঘ পর্যবেক্ষণ থেকে উঠে আসা। বিশেষত কিছু কাজে গোলাকার ফর্ম বারবার ফিরে এসেছে, যা কখনও চাঁদ, কখনও লক্ষ্যচিহ্ন, কখনও বা সময়ের চক্রের ইঙ্গিত বহন করে।

মাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সুমন দে উল্লেখযোগ্য পরীক্ষানিরীক্ষা করেছেন। ফেব্রিয়ানো ও হ্যান্ডমেড পেপারের উপরে অ্যাক্রিলিক, চারকোল, পেনসিলের পাশাপাশি প্লাইউড, কেমিক্যাল কোটিং এবং পেপার পাল্পের ব্যবহার তাঁর কাজকে বস্তুগত গভীরতা দিয়েছে। দীর্ঘ দিন ব্যবহৃত কাঠের বেঞ্চে যে ক্ষয়, দাগ ও আর্দ্রতা জমে থাকে, শিল্পী সেই অভিজ্ঞতাকেই ছবির শরীরে পুনর্নির্মাণ করেছেন। ফলে তাঁর কাজ কেবল দৃশ্যত নয়, প্রায় স্পর্শগত অনুভূতিও তৈরি করে।

সুমন দে-র এই প্রদর্শনী কেবল বিমূর্ত শিল্পের প্রদর্শন নয়, বরং আমাদের সময়, নগরসভ্যতা ও হারিয়ে যাওয়া সংবেদনশীলতার এক নীরব দলিল। তাঁর কাজ দর্শকের কাছে সরাসরি কোনও বক্তব্য নিয়ে পৌঁছয় না, বরং স্মৃতি, ভাঙন ও অস্তিত্বের ভিতর দিয়ে ধীরে ধীরে প্রবেশ করতে বাধ্য করে। এই সংযত অথচ গভীর শিল্পভাষাই তাঁকে সমকালীন বাংলা বিমূর্ত শিল্পচর্চায় স্বতন্ত্র করে তোলে।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Art exhibition Emami Art Gallery Art artist exhibition

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy