E-Paper

বিকল্প ইতিহাসের আদল

ফরিদপুরের বাবা আর ঢাকার মায়ের বেশ বেশি বয়সের ‘সুটো পোলা’ খোকার দ্যাশের নাম যে কেন বিজয়গড়, সেই আখ্যানের ভিতরে পাঠক নিজের নিজের দেশের, এমনকি বিদেশের ইতিহাসের মারগুলো টের পাবেন। লেখকের জীবন সেই দেশে স্থিত হয়নি।

রুশতী সেন

শেষ আপডেট: ০৪ জুলাই ২০২৬ ০৬:১৩
স্মৃতিচিত্র: বিজয়গড়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীকে দেখতে ভিড়। ১৯৮৭।

স্মৃতিচিত্র: বিজয়গড়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীকে দেখতে ভিড়। ১৯৮৭।

নিজের দেশ-ঘর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এ পার-বাংলার কলোনির অধিবাসী হয়েছিলেন ও পার-বাংলার যে অগুনতি মানুষ, তাঁদের আর তাঁদের পরবর্তী প্রজন্মের জীবনযাত্রার ইতিহাস-ভূগোল, অর্থনীতি-রাজনীতি, সংস্কৃতি-বিনোদন, উদারতা-সঙ্কীর্ণতা মিশে আছে এই বইয়ের পরতে পরতে। কোনও প্রামাণ্য ইতিহাসের দাবি নেই, আছে অনুপুঙ্খের বৈচিত্র, ব্যক্তিক দুঃখ-সুখের ভার, ঠিক-ভুলের খোলামেলা নিকাশ। নৈর্ব্যক্তিকতার সতর্ক-সচেতন প্রয়াস অনুপস্থিত বলেই কি বিকল্প ইতিহাসের আদল পেয়ে যায় বইটি?

ফরিদপুরের বাবা আর ঢাকার মায়ের বেশ বেশি বয়সের ‘সুটো পোলা’ খোকার দ্যাশের নাম যে কেন বিজয়গড়, সেই আখ্যানের ভিতরে পাঠক নিজের নিজের দেশের, এমনকি বিদেশের ইতিহাসের মারগুলো টের পাবেন। লেখকের জীবন সেই দেশে স্থিত হয়নি। পরদেশ-বিদেশের বহু সঙ্গ করে, বিজয়গড়ের কাছাকাছি ফিরে এসেও নিজবাসভূমির নিশ্চয়তায় সে-জীবন রিক্ত। আজকের উন্নত নতুন বিজয়গড় খোকার দেশ নয়, খোকার সেই সাতপুরনো বিজয়গড় নিয়ে নতুন বিজয়গড়ের ঝকঝকে ছেলেমেয়েদের কোনও মাথাব্যথাও নেই। মাঝেমধ্যে এখনকার বিজয়গড়ে এক টুকরো টুটুন কি এক সন্ধ্যার আকস্মিক নিষ্প্রদীপ খোকাকে তার পুরনো বিজয়গড় ফিরিয়ে দেয়! কিন্তু লেখক হাড়ে হাড়ে জানেন, ওই সাবেক যদি ক্ষণিকের মেদুরতা থেকে বেশি বিস্তৃত হয়, তবে তাঁর বর্তমান অচল। সেই অচলতাকে স্বীকৃতি দিতেই কি এই বইয়ের মরমি চলন? পরবাসের দায়ভাগে নিজের ভূমিকা অস্বীকার করেননি লেখক।

ভাল-মন্দের ঢালা ছকে সাজেনি আখ্যান। ছিন্নমূল মানুষ তাঁদের কলোনির নামকরণে চেয়েছিলেন নিরাপত্তার নিশ্চিতি: ‘...যাদের নামের মধ্যে “গড়” আছে, মানে কেল্লা... লড়াই... ঢালতরোয়াল... নামগুলোতে যেন একদল মানুষের জীবনপণ সংগ্রামের ছাপ রয়ে গেছে’ (পৃ ২৪)। কলোনির প্রতি তার বাসিন্দাদের আনুগত্য সীমাহীন। আজকের বিজয়গড়ে যৌবনের কাছে তেমন পাড়ার হদিস নেই। এক দিকে ‘আমাগো বিজয়গড়ের পোলার গায়ে হাত দিসে, চল তো দেহি’ (পৃ ২৫), অন্য দিকে বিয়েবাড়িতে পরিবেশন থেকে হাসপাতালে রাত জাগা, মর্গ কিংবা শ্মশান পর্যন্ত পাড়ার ছেলেরা অপরিহার্য। ফুটবলে ইস্টবেঙ্গল থেকে সিনেমায় উত্তমকুমার পর্যন্ত সব উত্তেজনায় বিজয়গড়ের পরম ‘আমাগো’ ভাব। এমন দ্যাশ নিয়ে স্বতঃস্ফূর্ত রসিকতা হাসিতেই ফুরিয়ে যায় না; পাঠকের জন্য কার্যকারণ অনুসন্ধানের একটা জমি কৌতুকের ছলেই বানিয়ে দিতে পারেন লেখক। সুরবালামাসি বা রহিমের মায়ের মতো গৃহস্থালি-সহায়িকা, সমরবাবুর মতো ডাক্তার, কুলেন্দুদার মতো বামপন্থী আজকের বিজয়গড়ে এতখানিই আজগুবি যে, তাঁদের বিন্যাসে বহিরঙ্গের কৌতুক পেরিয়ে অন্তর্লীন সংবেদন গেঁথে দেওয়া সহজ ছিল না। রংগন চক্রবর্তীর মন আর কলম সেই দুরূহকে সম্ভব করেছে।

দেশের নাম বিজয়গড়

রংগন চক্রবর্তী

৪৫০.০০

দে’জ়

কৌতুকের আড়ালে জরুরি প্রশ্ন কম নেই। দেশ-হারানো মানুষগুলোর ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই কি কলোনির মনকে শৃঙ্খলা, নিয়ন্ত্রণ আর কর্তৃত্বের ব্যাপারে খানিকটা অসহিষ্ণু করে তুলেছিল? তাই বিজয়গড়ে আধুনিক কবিতাকে ভাবা হত অস্পৃশ্য? ‘কোনো মিউচুয়াল নাই’ শীর্ষক অধ্যায়ে (এ-বইয়ের প্রতিটি অধ্যায়েরই নামকরণ দারুণ জুতসই!) আছে, ‘সব... ক্ষমতাধররাই আনন্দবিরোধী... তাদের মত পালনেই আনন্দ... অন্য কিছুতে আনন্দ হলেই... মারমার..., কবিতা থেকে প্রেম, পিকনিক থেকে আড্ডা সবেতেই সব রকমের “বড়দের” আপত্তি। প্রশ্নটা সেই নিয়ন্ত্রণের, তাদের গোড়ার আশঙ্কা সেই ক্ষমতা বজায় রাখা নিয়ে’ (পৃ ১২৩)। অভিভাবক বা অভিভাবকতুল্যদের এই মনস্তত্ত্ব পঞ্চাশ-ষাট বছর আগেকার সেই সব খোকাখুকুকেও বইতে হয়েছে, যারা কলোনির ধারেকাছেও বেড়ে ওঠেনি। তবে কলোনি তৈরির স্মৃতি যাঁদের হাড়ে-মজ্জায়, তাঁদের এই চরম শৃঙ্খলাপরায়ণতা কি কোনও অসহায় ফস্কা গেরোর উপমা? খোকার বামপন্থী, সুশিক্ষক, কলেজের অধ্যক্ষ বাবা ‘...চাইতেন সবাই তাঁকে ভয় পাক’ (পৃ ১৯৯)। রাগী বাবার রোল মডেল থেকে বিজয়গড়ের সমাজে তৈরি হওয়া কুৎসিত পরম্পরা, রাজনীতিতে অনিয়ন্ত্রিত রাগ আর পিতৃতন্ত্র-স্বীকৃত হিংস্রতা— এই সব দেখে-শুনে-সয়ে বেড়ে উঠেছিল কলোনির ছেলেপুলেরা। অন্যায্য রাগ দেখানোর উত্তরাধিকারে তাদের ব্যক্তিগত ইতিহাস যে কতখানি দীর্ণ, সে-প্রসঙ্গও বাদ পড়েনি খোকার দেশ চেনানোর খোলামেলা কথকতায়।

অনুপ্রবেশের গেরো, মেয়েদের বহির্যাত্রায় অধিকার-অনধিকারের অসঙ্গতি, বামপন্থার দেগে দেওয়া ভাল-মন্দ (হিন্দি গান মানেই অপসংস্কৃতি, এমনকি উচ্চাঙ্গসঙ্গীতেও সামন্ততন্ত্রের প্রলেপ, অতএব পরিত্যাজ্য), ‘মধ্যবিত্ত বামেরা নিজেদের মধ্যে কোনোদিন “ক্লাস” ব্যাপারটাকে অতিক্রম করেনি, (পৃ ২২২)— এ-সব এমন চলনে বলা, যেন না-বললেও চলত! কিন্তু মনোযোগী পাঠক নিশ্চিত বুঝবেন, কৌতুকের আবরণে বেদনার তল খোঁজাই এ-বইয়ের লক্ষ্য! খোকার প্রিয় ছবি গুপী গাইন বাঘা বাইন প্রসঙ্গে বামপন্থীদের একাংশের বক্তব্য, যুদ্ধ না-চাওয়া মানে স্থিতাবস্থা বজায় রাখা! রংগন লিখেছেন, ‘এমনিতেই যুদ্ধ নিয়ে বামপন্থীদের রাজনীতি চূড়ান্ত গোলানো। তারা কখন যুদ্ধ চায়, কখন শান্তি সেটা(র)... তাল রাখা যায় না... এই রকম একটা ছবি... ওই রকম গান... সব বাদ দিয়ে “রাজনীতি” বলে কিছু হয় নাকি? নিশ্চয় হয়। বহু সমাজতান্ত্রিক দেশে আর আমাদের এই রাজ্যেও হয়েছে। কিন্তু তাই দিয়ে নতুন দেশ তৈরি হলে সেটা ভালো কিছু হতে পারে না’ (পৃ ১৮৮)।

এমন অনেক জরুরি কথায় ভর্তি দেশের নাম বিজয়গড়। তবে মুদ্রণপ্রমাদ অস্বস্তিকর, একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের শিরোনামই সূচিপত্রে বাদ পড়েছে!


(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

book review

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy