E-Paper

মন্দির-ভাবনায় এসে মিশেছে দেশ-কাল ছোঁয়া বৃহৎ বঙ্গ

আমাদের বাংলার মন্দিরের গৌরবান্বিত হয়ে ওঠা আর কথাকাহিনি মূলত এক ঘরোয়া সূত্রে বাঁধা। সে-সব মন্দিরের কিছু পাথরের হলেও, পোড়ামাটির পেলব আর অলঙ্কৃত দৃশ্যায়নই বৃহত্তর বাংলার সহজিয়া সংস্কৃতির সঙ্গে মিলেমিশে আছে।

দীপঙ্কর ঘোষ

শেষ আপডেট: ০৪ জুলাই ২০২৬ ০৬:০২
প্রাচীন: বিষ্ণুপুরের জোড়বাংলা মন্দিরের টেরাকোটা ফলক।

প্রাচীন: বিষ্ণুপুরের জোড়বাংলা মন্দিরের টেরাকোটা ফলক।

বছর দশেক আগে, বাঁকুড়ায়, ঊষর মেঠো পথ ধরে দূরের এক গ্রামে যাচ্ছিলাম। প্রাগিতিহাসের নিদর্শন-ক্ষেত্র হাটআশুরিয়া থেকে মধ্যযুগীয় জলসেচ ব্যবস্থার শুভঙ্করের দাঁড়া পেরিয়ে, ভ্রামরী দুর্গার অধিষ্ঠান দেখাই উদ্দেশ্য ছিল। গ্রামের সবাই বলছিলেন ‘ভামরি মাতা’। উচ্চারণেই গৃহদেবীর আপন হয়ে ওঠা। পুজোর আয়োজন অতি সাধারণ, কিন্তু যে মন্দির কল্পনা করছিলাম তা কোথায়? তবে পুজোর উপচারে ত্রিশূল, তরবারি, তির-ধনুক, বল্লম, খড়্গ থেকে পঞ্চমুখী শঙ্খ— এমন সব উপাদান মজুত। দুর্গাপুজোর আয়োজনের মধ্যেও এমন নিঝুম গ্রামে উৎসারিত অন্য গরিমা।

আমাদের বাংলার মন্দিরের গৌরবান্বিত হয়ে ওঠা আর কথাকাহিনি মূলত এক ঘরোয়া সূত্রে বাঁধা। সে-সব মন্দিরের কিছু পাথরের হলেও, পোড়ামাটির পেলব আর অলঙ্কৃত দৃশ্যায়নই বৃহত্তর বাংলার সহজিয়া সংস্কৃতির সঙ্গে মিলেমিশে আছে। দক্ষিণ ভারতের চোল-রাজের মন্দিরে গেলে কি এমন অনুভূতি হবে? হাজার বছরের পুরনো বৃহদীশ্বর শিবমন্দিরে ঢুকতে গেলেই বিশালত্বে আর পাথুরে মহিমায় চমকিত হতে হয়। শুধু প্রবেশদ্বারের বৈভবের সঙ্গে আমাদের বাংলার কোনও মূল মন্দিরেরও যেন তুলনা হবে না। সাম্রাজ্যের বহিঃপ্রকাশ, রাজরাজড়ার দ্যুতি আর ঐশ্বর্যের মহাসমারোহ সেখানে!

এমনই কথালাপের ধরতাই নিয়ে বাংলার মন্দির-চৰ্চার কাঠামোতে এসে মিশেছে সামাজিক ইতিহাসের চলন আর বুনন। ইতিহাসের কালক্রমে নানা যুগ, বহু যুগন্ধর ব্যক্তি, অনেক কীর্তির পর্যায়ক্রমিক বিন্যাস মিশে আছে এই সব মন্দিরে। এ ক্ষেত্রে তা গুপ্ত-শুঙ্গ-জৈন-বৌদ্ধ-পাল-সেন-মুসলমান এবং পরবর্তী কালে ব্রিটিশ শাসনাধীন হয়ে বাংলার সংস্কৃতিতে মন্দির-ভাবনার কালানুক্রমিক আলোকপাত। বাংলার মন্দির-চর্চার নানামুখী যে আগ্রহ ও উৎসাহ সাম্প্রতিক সময়কালে দেখা যাচ্ছে তা নজরে পড়ে। কিন্তু সেখানে তথ্য নিবন্ধীকরণের ধাঁচের বাইরে সামাজিক তত্ত্বালোচনার উদ্দেশক পরিসর মুখ্য হয়ে ওঠেনি। সেই পরিচিত সূত্রের বাইরে, ধর্মতান্ত্রিকতার সঙ্গে সামাজিক তথ্য ও নানা সংস্কৃতিধারার ইঙ্গিত কথকতার মতো বর্ণনা করে গেছেন কৌশিক দত্ত।

হিতেশরঞ্জন সান্যালের মতো সমাজ-গবেষকের আলোচনার নির্দিষ্ট ঝোঁক ছিল, কিন্তু তথ্যভিত্তিতে তাও সর্বব্যাপী বিন্যস্ত হয়নি। বর্ণভেদী অভিঘাতে এক সময় হিন্দু সমাজ রিক্ততায় পূর্ণ হয়ে যাচ্ছে। বৌদ্ধ-ধর্মমূলক ধর্মঠাকুরের আশ্রয় নিয়ে নিজস্ব সত্তা বজায় রাখা আবার মুসলমান শাসনের বিস্তারও তখন আশ্রয় হয়ে উঠল। মন্দির স্থাপনার কথা এমন নানা সামাজিক গতিময়তার মধ্যেও পাওয়া যায়। পুরাণ ও সমাজ, সামাজিক প্রেক্ষাপট, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, ধর্মের বিবর্তন— এ-সবের অধ্যায়ভিত্তিক আলোচনার অন্তিম পর্বে ‘মুসলমানি শাসন, জাতিভেদ ও বাংলার মন্দির’ আলোচ্য বইটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সমাজ, ধর্মাচরণ, সামাজিক দ্বন্দ্ব আর জাতিগোষ্ঠীর বিষয়বৈশিষ্ট্যের আদানপ্রদান এ লেখার ভরকেন্দ্র। বইটির অন্তর্গঠন তুলনামূলক ভাবনায় তাত্ত্বিক আলোকপাত, যেখানে হয়তো ক্ষেত্রসন্ধানী সুপ্রচুর উদাহরণ অনুপস্থিত। তথ্যভাবনায় বিশ্লেষণের আড়ালে ঐতিহ্য রক্ষায় লেখকের আকাঙ্ক্ষার মনোভাবও প্রকাশ পেয়েছে। তবে ধর্মীয় স্থাপত্য নিয়ে কৌশিকের পাঠ-চর্চা আর অজস্র উদ্ধৃতির সঙ্গতে আলোচনার বনিয়াদ মজবুত হয়েছে।

রাজনৈতিক ক্ষমতা, জাতিভেদ ও ধর্মের বিবর্তনে বাংলার মন্দির

কৌশিক দত্ত

৩৭৫.০০

খড়ি প্রকাশনী

বাংলার মন্দির-ভাবনায় মিশেছে বৃহৎ বঙ্গ যা প্রকৃতই দেশকাল ছুঁয়েছে। যেখানে মহাকাব্য, পুরাণ, রাজকাহিনি, লোকগাথার বহু ঘটনাক্রম। তাই এই ক্রমিক বর্ণনা ও উপর্যুপরি বিষয়-সংলাপে পাঠকের কাছে কোনও ক্ষেত্রে জটিল বিন্যাস মনে হতে পারে। ফেলে আসা অতীতকে যখন সমসময়ের আয়নায় বিশ্লেষণ করা হয়, তাতে থাকে নানা ছবি, নানা চরিত্র-সহ মন্দির-চর্চার অন্তর্গত দিশা। সে সূত্রে সমাজ-ইতিহাসের বিষয় জানতে মন্দিরফলকের তথ্যও জরুরি। যদিও লেখক তা নির্দিষ্ট ভাবে পর্যালোচনা করেননি। এখনও বাংলাব্যাপী মন্দিরের সঠিক তথ্যভান্ডারই নেই! সূত্র-উল্লেখে লেখক যেমন অবিভক্ত মেদিনীপুর জেলার মন্দিরের সংখ্যা প্রায় পাঁচশোটি বলেছেন। কিন্তু বাস্তবে তা এর দ্বিগুণ। কিন্তু আলোচনার অন্তর্গত পরিসর তো শুধু বাংলা নয়, বাংলার মন্দির-ভাবনার সামাজিক বিষয়বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে তার বিস্তার ঘটেছে বাস্তুতন্ত্রের বৈজ্ঞানিক দিক-নির্দেশেও। সেই সঙ্গে আছে ধর্মীয় স্থাপত্যের নিরিখে গোটা ভারতে কোন অঞ্চলে জৈন, বৌদ্ধ বা শৈব ধর্মের বিস্তার ও প্রাবল্য কেমন ভাবে হয়েছে।

মন্দিরের স্থাপত্যের প্রসঙ্গে গুরুসদয় দত্তের মন্তব্য আজও প্রাসঙ্গিক। তাঁর কথায়, প্রাক্‌-মুসলিম বাংলার শিল্প-সংস্কৃতি গ্রাস করেছিল গুপ্ত এবং পাল ঐতিহ্যের পুরোহিততান্ত্রিক সর্বভারতীয় সংস্কৃতি। প্রসঙ্গত লেখক বলছেন যে, ভারতে মন্দির তৈরির ব্যাপকতা ছিল গুপ্ত রাজাদের আমলে। গুপ্ত রাজারা যে সচেতন ভাবে মন্দিরপ্রতিষ্ঠার বিষয়গুলি পাথরে খোদাই করে রেখে যান, সামাজিক রাজনৈতিক অর্থনৈতিক ভিত্তিতে আকর তথ্য তা। মন্দির হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের আরাধনার কেন্দ্র, আর সংশ্লিষ্ট মন্দিরলিপি ইতিহাসের বহমান নথি। ইতিহাসবিদ কল্যাণকুমার গঙ্গোপাধ্যায়ের ভরসার কথাও এ আলোচনায় বলতেই হয়, “সত্য বলতে কি রাজনৈতিক পরাধীনতা যে বাঙ্গালীকে কখনই পঙ্গু করতে পারেনি, তার প্রাণের সঞ্চয় যে কখনও নিঃশেষ হয় নাই মুসলমান আমলে রচিত বাংলা সাহিত্যে, শ্রীচৈতন্যের প্রবল ধর্ম আন্দোলনে এবং মন্দিরাশ্রিত বিপুল শিল্প কর্মে তার প্রমাণ অত্যন্ত স্পষ্ট।” ষোড়শ শতকের শেষ দিকে খেতুরি মহোৎসবে ব্যাপকভাবে শ্রীকৃষ্ণ ও চৈতন্যের বিগ্রহ স্থাপনার প্রস্তাব করা হয়। সাধারণ ব্রাত্য অবহেলিত মানুষের উৎসাহ ও অধিকার এল চৈতন্যের ভক্তিধর্মের স্রোতে। অজস্র মন্দির গড়ে উঠতে থাকে। সেই বাংলার মন্দিরের ধূসর কালযাপনের তত্ত্বকথা আমাদের সামনে এনে, লেখক চর্চার বহুমুখী পরিসরকে উস্কে দিয়ে ধন্যবাদার্হ হয়েছেন।


(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

book review Bengali Literature Bishnupur

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy