কখনও কখনও এমন হয়, প্রচুর কাজের নির্বিচার প্রদর্শন দৃষ্টিসুখকে ব্যাহত করে। অ্যাকাডেমি অব ফাইন আর্টসের গ্যালারির একটি ঘরে কাঠের পার্টিশনের দু’টি দিকে ও সমগ্র দেওয়াল জুড়ে মোট সাতান্ন জনের কিছু বেশি শিল্পী-ভাস্করের প্রচুর কাজ ও এক অংশের অনেকটা নিয়ে জীবন্ত মানুষ ও ভিডিয়ো প্রোজেকশনের মাধ্যমে অন্য ধরনের উপস্থাপনার ফলে গোটা প্রদর্শনীটি জটিলতার জালে জড়িয়ে গিয়েছে। কাজের মানদণ্ডের বিচারে মঁমার্তের প্রদর্শনীর অনেক কাজই সে ভাবে দাগ কেটে যেতে পারেনি। এতে যে সমস্যাটা প্রবল আকার ধারণ করেছে, তা হল— কোনও ভাল কাজের গায়ে গায়েই একটি দুর্বল বা নিম্ন মানের কাজ প্রদর্শিত হয়েছে। দু’টি ছবির মাঝের স্পেস এত কম হওয়ায় দৃষ্টিসুখের মুহূর্তটি বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে।
আমন্ত্রিত শিল্পী সনাতন দিন্দাকে ভাবিয়েছিল বর্তমান পৃথিবীর বিবিধ অত্যাচারের ঘোর কৃষ্ণ পরিমণ্ডল—যুদ্ধোন্মাদ তাণ্ডবের উচ্ছৃঙ্খলতার ঠিক পাশাপাশি অবিচার, নিষ্ঠুরতা, হত্যার দৃশ্য, নির্বিচার মারণাস্ত্র ব্যবহারের বারুদ-বিস্ময় কিংবা রক্তধারার নৃশংস কাহিনি। সিরিয়ায় ছ’শো বাহান্নটি শিশুমৃত্যুর যন্ত্রণাও মানুষ অচিরেই বিস্মৃত হয়। শিল্পীর ভাবনায় এটিই প্রধান ছিল যে, এত ভয়ঙ্কর ভয়াবহতা কী ভাবে ভুলে যায় মানুষ! সমস্ত কিছু দেখে শুনে পড়ে জেনেও মানুষ সব কিছুই গা থেকে ঝেড়ে ফেলে দেয়! এই ঝেড়ে ফেলে দেওয়াটাকে সনাতন তাঁর ভিডিয়ো প্রোজেকশনের মাধ্যমে বিভিন্ন শব্দ ও জীবন্ত মানুষ ব্যবহার করে, প্রতীকী অর্থে তাকে যে সম্যক উপস্থাপনা করেছেন— তাতে একঘেয়েমি ও অগভীরতা প্রকাশ পেয়েছে। সম্পূর্ণ সাদা পোশাকে ঢাকা এক জন মানুষ আক্ষরিক অর্থেই গা-হাত-পা থেকে যেন ধুলো ঝাড়ার মতোই ‘অদৃশ্য যন্ত্রণা’ ঝেড়ে ফেলে দিচ্ছে। আর এক সাদা চৌকো কক্ষের পটভূমিকায় হত্যা-মৃত্যু-রক্তপাতের ভিডিয়ো প্রোজেকশন ক্রমাগত চলছে বিভিন্ন শব্দ-সহ। অজস্র ছোট ছোট উড়ন্ত কাগজের ফালির আন্দোলিত এ দৃশ্য কী প্রমাণ করছে? এটাই কি ঝেড়ে ফেলা?
প্রায় পনেরো বছর আগের করা ছোট্ট এক ‘মুখমণ্ডল’ রবীন মণ্ডলের। অনুরূপ ক্ষুদ্র ‘মুখ’ নিয়ে করা কাজ ওয়াসিম কপূরের। এ ছাড়া আমন্ত্রিত শিল্পীদের মধ্যে মানবেন্দ্র সরকারের ভাস্কর্য রীতিমতো দৃষ্টিনন্দন। কালচে রঙের আধুনিকার শরীরের উচ্চাবচ অবস্থা ও সমগ্র ছন্দের মধ্যে ভাস্কর্যের সমুন্নতি, লাবণ্য ও নীরবতা চমৎকার এক অনুভূতি জাগায়। রেড পাইনে বানানো কাঠের পরিতলের ছন্দোবদ্ধ নকশার মতোই ত্বকবিশিষ্ট একজোড়া ডলফিনের ভঙ্গিকে আরও আন্দোলিত করে গোপাল সরকারের ভাস্কর্য। ছবি ও ভাস্কর্যের ক্ষেত্রে অনেকের কাজের পাশে কোনও পরিচিতিই নেই। অথবা প্রদর্শনীতে কাজ থাকলেও, মুদ্রিত ক্যাটালগে অনেকেই অনুপস্থিত। তা ছাড়া এক জনের কাজে অন্য জনের পরিচিতির লেবেল লাগানো হয়েছে। ডিসপ্লে ও ক্যাটালগ তৈরির সময় এ সব মারাত্মক ভুল শুধরানোই হয়নি!