E-Paper

মাইহারের সুরে রঞ্জিত সন্ধ্যা

শিল্পীরা বিলম্বিত ঝাঁপতালে একটি বন্দিশ বাজান। শিল্পীদের তবলায় সহযোগিতা করছিলেন ফারুক্কাবাদ ঘরানার খলিফা উস্তাদ সাবির খান এবং তার পুত্র আসিফ খান।

গৌরব দত্ত

শেষ আপডেট: ০৩ জানুয়ারি ২০২৬ ০৮:২৫
(বাঁ-দিক থেকে) তবলায় সাবির খান, সরোদে অলোক লাহিড়ী, অভিষেক লাহিড়ী এবং তবলায় আসিফ খান।

(বাঁ-দিক থেকে) তবলায় সাবির খান, সরোদে অলোক লাহিড়ী, অভিষেক লাহিড়ী এবং তবলায় আসিফ খান।

গত নভেম্বর মাসে প্রবাদপ্রতিম সেতারশিল্পী পণ্ডিত মনোজ শঙ্করের স্মৃতিতে জ্ঞান মঞ্চে অনুষ্ঠিত হল ‘ইকোজ় ফ্রম মাইহার’ শীর্ষক এক মনোজ্ঞ সঙ্গীতানুষ্ঠান। অনুষ্ঠানটির আয়োজন করেছিল নাট্যসংস্থা কুহক। সারা দিনব্যাপী এই অনুষ্ঠানের সান্ধ্য অধিবেশন শুরু হয় দ্বৈত সরোদবাদনে। পণ্ডিত অলোক লাহিড়ী, তাঁর পুত্র ও শিষ্য অভিষেক লাহিড়ীর পরিবেশনা শুরু হয় রাগ হেমন্ত দিয়ে। অনুষ্ঠানের মূল ধারণা ও ঋতুর সঙ্গে শিল্পীদের রাগ চয়ন বিশেষ ভাবে মিলে যায়। মাইহার ঘরানার প্রাণপুরুষ আচার্য বাবা আলাউদ্দিন খানের সৃষ্ট এই রাগটি যেন নভেম্বরের সন্ধ্যায় মাইহার ঘরানার সঙ্গীতের প্রতি এক যোগ্য শ্রদ্ধার্ঘ্য। শুরুর আলাপ এবং জোড়ে দুই শিল্পী যেন বয়ে নিয়ে এলেন হেমন্তের সায়াহ্নে উত্তুরে হাওয়ার শীতল শৃঙ্গার। জোড় অঙ্গ থেকে দ্রুত লয়ে গিয়ে ঝালা বা থোক ঝালা-র প্রদর্শন বিশেষ ছিল না। তবে ডান হাতের সূক্ষ্ম কাজে বোল-বাণীর ব্যবহার এবং ষড়জ-পঞ্চম বা ষড়জ-মধ্যম এই দুই তারের উপরে সুরের মূর্ছনায় চিকারীর অভাব কিছুমাত্র উপলব্ধি হয়নি।

এর পর শিল্পীরা বিলম্বিত ঝাঁপতালে একটি বন্দিশ বাজান। শিল্পীদের তবলায় সহযোগিতা করছিলেন ফারুক্কাবাদ ঘরানার খলিফা উস্তাদ সাবির খান এবং তার পুত্র আসিফ খান। ঝাঁপতালের অংশে কিছু সুন্দর লয়কারি শুনতে পেলেন শ্রোতারা। দুই সরোদশিল্পীর সঙ্গে সাবির খানের সাঙ্গীতিক বোঝাপড়ায় ধরা পড়ে অভিজ্ঞতার ছাপ। এর পর মধ্যলয় তিনতালে একটি বন্দিশ ধরে শিল্পীরা কিছুটা দ্রুত লয়ে নিয়ে গিয়ে ক্রমে ঝালা দিয়ে সমাপ্তিতে আসেন। পণ্ডিত অলোক লাহিড়ী এবং অভিষেক লাহিড়ীর দ্বৈত বাদনে স্পষ্ট হয় পরম্পরা এবং উদ্ভাবনের এক অসামান্য মেলবন্ধন। পিতার সঙ্গে পরিবেশনার মধ্যে যে পরিমিতি বোধ এবং সেই গণ্ডির মধ্যে থেকেও যে নিত্যনতুন উদ্ভাবন অভিষেক দেখালেন, তাতে অনায়াসে ওঁকে এ যুগের শ্রেষ্ঠ সরোদবাদকদের মধ্যেগণ্য করা যায়।

(বাঁ-দিক থেকে) তবলায় সমর সাহা, বাঁশিতে বিবেক সোনার এবং অনিকেত মহারানা।

(বাঁ-দিক থেকে) তবলায় সমর সাহা, বাঁশিতে বিবেক সোনার এবং অনিকেত মহারানা।

সমগ্র পরিবেশনার পরিসমাপ্তি ঘটে শিল্পীদ্বয়ের হাতে কাফি ঠাটের বুনটে বাঁধা একটি ধুন দিয়ে। দীপচণ্ডী তালের পরিমিত দোলার সঙ্গে তাল রেখে পিতা-পুত্র কখনও ভীমপলশ্রীর মধ্যমে, কখনও সাহানার ধৈবতে, পটদীপের নিষাদে বিশ্রাম নিতে নিতে চললেন। উত্তরাঙ্গে কখনও মধুবন্তী, কখনও সরস্বতীর ছোঁয়া দিয়ে ধুনের মুখে এনে শেষ করলেন পরিবেশনা। শেষের দিকে প্রথাগত লগ্গি না বাজিয়ে তবলায় কিছু সাহসী লয়কারিরপ্রচেষ্টা যদিও শ্রুতিসুখকর হল না, কিন্তু তাতে মূল ধুনটির রসে কোনও খামতি হয়নি।

অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় ভাগের শিল্পী ছিলেন বর্ষীয়ান বাঁশি-সম্রাট পণ্ডিত হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়া। কিন্তু আকস্মিক অসুস্থতার কারণে পণ্ডিতজি সে দিন উপস্থিত থাকতে অপারগ ছিলেন। ওঁর পরিবর্তে বাজালেন দুই শিষ্য বিবেক সোনার এবং অনিকেত মহারানা। রাগ যোগের উপর এবং অন্তিমে রাগ হংসধ্বনীর উপরে দু’জনে সঙ্গীত পরিবেশন করেন। দু’জনের বাজনাতেই পণ্ডিতজির তালিমের স্পষ্ট ছাপ রয়েছে এবং মাইহার ঘরানার বাঁসুরীর বাজকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা ওঁরা রাখেন। তবলায় সহযোগিতা করেছিলেন পণ্ডিত সমর সাহা।

সমগ্র অনুষ্ঠানটির তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে ছিলেন বিশিষ্ট সেতারশিল্পী পণ্ডিত পার্থ বসু।

অনুষ্ঠা

প্রদীপ প্রজ্জ্বলনের মাধ্যমে সূচনা।

প্রদীপ প্রজ্জ্বলনের মাধ্যমে সূচনা।

  • বাংলা আধুনিক গানে জয় সরকার, শুভমিতা বন্দ্যোপাধ্যায়, অর্ণা শীল উল্লেখযোগ্য তিন ব্যক্তিত্ব।‌ কুড়ি বছর আগে তৈরি হয়েছিল ‘বৃষ্টি পায়ে পায়ে’ গানটি। সম্প্রতি জি ডি বিড়লা সভাঘরে আবার তিনজন একসঙ্গে এলেন ‘বৃষ্টি পায়ে পায়ে’-এর কুড়ি বছরের অনুষ্ঠানে। জয়, শুভমিতা, অর্ণা পরিবেশন করলেন এক বিশেষ সঙ্গীতসন্ধ্যা। প্রথমার্ধে ছিল জয়ের সুরের গান, যা শুভমিতা গেয়েছিলেন। অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্বে ছিল শুভমিতার একক সঙ্গীত পরিবেশনা। অনুষ্ঠানের আয়োজক বেঙ্গল ওয়েব সলিউশন। সংবর্ধনা জানানো হয় ‘বৃষ্টি পায়ে পায়ে’ গানের মূল যন্ত্র সঙ্গীতশিল্পীদের।
  • উদয়শঙ্করের ১২৫তম জন্মবার্ষিকীতে শান্তিনিকেতনে হয়ে গেল দু’দিন ব্যাপী উদয়শঙ্কর নৃত্য উৎসব। শান্তিনিকেতনের সৃজনী শিল্পগ্রামে হয়ে গেল ‘আলমোরা’। রাজ্যের নানা প্রান্ত থেকে মোট ২২টি নাচের দল অংশগ্রহণ করল। অনুষ্ঠানের উদ্যোগে ওয়েস্ট বেঙ্গল ডান্স গ্রুপ ফেডারেশন, সহযোগিতায় ইস্টার্ন জ়োনাল কালচারাল সেন্টার। উৎসবের সূচনায় ফেডারেশনের পক্ষ থেকে একটি পুস্তিকা প্রকাশ করেন মমতাশঙ্কর, চন্দ্রোদয় ঘোষ, প্রদীপ্ত নিয়োগী, জোনাকি সরকার, সুস্মিতা নন্দী প্রমুখ। প্রথম দিনে অংশগ্রহণ করেছিল মমতাশঙ্কর ডান্স কোম্পানি, শিল্পবিতান, সঙ্গীত নৃত্য কলাকেন্দ্র, সাহাপুর সূচীছন্দম, বাঁকুড়া প্রমিথিউস, সূচনা। দ্বিতীয় দিনে ডান্সার্স গিল্ড, নাদ-ব্রহ্ম, কলাপী, ঘুঙুর, আলোর পাখি সেন্টার ফর পারফর্মিং আর্টস, বাঁকুড়া আঙ্গিক, বলাগড় পায়েল নৃত্য কলাকেন্দ্র, স্বস্তিকা কলাকেন্দ্র-সহ বিশিষ্ট কিছু নৃত্যসংস্থা।
  • সম্প্রতি বালিগঞ্জের দাগা নিকুঞ্জে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল ‘ফ্যাব্রিক অব মিউজ়িক’ অনুষ্ঠান, যেখানে মেলবন্ধন ঘটেছিল সঙ্গীত, বস্ত্রবয়ন ঐতিহ্য, গল্পকথন এবং শিল্পচর্চার। শেষ দিনে মঞ্চে একক সরোদ বাদনে ছিলেন শিল্পী সৌমিক দত্ত। সঙ্গে তবলায় দেবজিৎ পূততুণ্ড। সৌমিক সরোদে রাগ কৌশিকী কানাড়াতে আলাপ, জোড়ের পর শোনালেন বিলম্বিত ঝাঁপতাল এবং তিনতালে মধ্যলয় গৎ-এর পরে দ্রুত ঝালা দিয়ে অনুষ্ঠান শেষ করেন। দেবজিতের তবলা সঙ্গতও ছিল উপভোগ্য। এ দিন বাংলার বয়ন ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার নিয়ে ‘টেক্সটাইলস অব দ্য বেঙ্গল ডেল্টা: এ পার ও পার’ তথ্যচিত্রও দেখানো হয়। প্রথম ও দ্বিতীয় দিনে আয়োজিত হয় শিল্প কর্মশালা, যাতে অংশ নেন তরুণ সঙ্গীতশিল্পীরা। সহযোগিতায় ছিল সঙ্গীত আশ্রম ও অলকা জালান ফাউন্ডেশন।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Gyan Manch

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy