E-Paper

এক সাংস্কৃতিক চেতনার ফসল

অনুষ্ঠানটি দু’ভাগে বিভক্ত ছিল। প্রথম ভাগে ছিল গুণিজন সংবর্ধনা। এ দিন জীবনকৃতি সম্মান দেওয়া হয় নাট্যকার ও অভিনয়কর্মী সোহাগ সেন ও চলচ্চিত্রশিল্পী লিলি চক্রবর্তীকে। অ্যাওয়ার্ড অব এক্সেলেন্সে সম্মানিত করা হল রাখি সরকার, সোহিনী সেনগুপ্ত এবং কৌশিক বসুকে। মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন দেবশ্রী রায় ও শ্রাবণী সেন।

সৌম্যেন সরকার

শেষ আপডেট: ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৬:৪৭
মঞ্চে পাঠ করছেন সুজয়প্রসাদ ও সোহিনী।

মঞ্চে পাঠ করছেন সুজয়প্রসাদ ও সোহিনী। —নিজস্ব চিত্র।

সম্প্রতি জি ডি বিড়লা সভাঘরে অনুষ্ঠিত হয়েছিল এসপিসি ক্রাফট সংস্থার বার্ষিক অনুষ্ঠান। সংস্থার কর্ণধার সুজয় প্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের সাংস্কৃতিক চেতনার ফসল এই অনুষ্ঠান। শুরুতেই শিল্পী কোয়েল বসু শোনালেন একটি মেক্সিকান গান এবং সেই সঙ্গে তার বাংলা অনুবাদ। গানের সঙ্গে শিল্পীর ট্যাপ ডান্স পরিবেশন এক নতুন অভিজ্ঞতা। গানের ভাবটি তাঁর পরিবেশনায় চমৎকার ফুটে উঠেছিল।

অনুষ্ঠানটি দু’ভাগে বিভক্ত ছিল। প্রথম ভাগে ছিল গুণিজন সংবর্ধনা। এ দিন জীবনকৃতি সম্মান দেওয়া হয় নাট্যকার ও অভিনয়কর্মী সোহাগ সেন ও চলচ্চিত্রশিল্পী লিলি চক্রবর্তীকে। অ্যাওয়ার্ড অব এক্সেলেন্সে সম্মানিত করা হল রাখি সরকার, সোহিনী সেনগুপ্ত এবং কৌশিক বসুকে। মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন দেবশ্রী রায় ও শ্রাবণী সেন।

প্রাক্‌-স্বাধীনতা ও স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে যে মহিলা শিল্পীরা সঙ্গীত ও নৃত্যকলায় পারদর্শী ছিলেন, তাঁদের জীবনের উপরে আধারিত অনুষ্ঠান ‘দি শ্যান্ডেলিয়ার’ উপস্থাপন করলেন এসপিসি ক্রাফটের সভ্যবৃন্দ। সেই নারীদের যে প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয়েছিল, তাঁদেরই জীবন-আলেখ্য উপস্থাপিত হল এই অনুষ্ঠানে। ব্রিটিশ শাসন শুরু হওয়ার পর ভারতীয় জনজীবন ও পেশাগত জীবনে আমূল পরিবর্তন আসে। ইংরেজ শাসনের আগে পেশাগত পরিসর অনেকাংশে পুরুষদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। মধ্যবর্তী নারীদের স্থান ছিল অন্দরমহলে। কিন্তু ঔপনিবেশিক শাসনের পরবর্তী পর্যায়ে এই চিত্র ধীরে ধীরে বদলাতে থাকে। নারীশিক্ষা বাড়তে থাকে ক্রমশ। কখনও সঙ্গীতে, কখনও নৃত্যে, কখনও নাট্যমঞ্চে বা টকিজ়ে তাঁদের উপস্থিতি প্রকট হতে আরম্ভ করে। নিঃশব্দে ঘটে যায় একটি বিপ্লব। যখনই নারী ও বিনোদন এই দু’টি শব্দ পাশাপাশি এসেছে, তখনই সমাজের সকল শ্রেণির মানুষের কাছে যে বার্তা পৌঁছেছে, তা নেতিবাচক। যাঁরা বাইরে গান বা নৃত্য পরিবেশন করতেন, তাঁদের বাইজি, ক্যাবারে ডান্সার ইত্যাদি আখ্যা দেওয়া হত। কিন্তু সেই দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে বেরিয়ে নারী শিল্পীদের উদ্‌যাপন করার বার্তা দিয়ে গেল এ দিনের অনুষ্ঠান।

এই সন্ধ্যায় যাঁদের নিয়ে এই আলেখ্যটি উপস্থাপন করা হল, তাঁরা নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন পিতৃতান্ত্রিক সমাজের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে। ক্রমশ উচ্চকিত হয়েছে তাঁদের কণ্ঠ। তাঁদের সেই কণ্ঠে যে গান আমরা পেয়েছি, তা ব্যক্তিগত, রাজনৈতিক, প্রতিবাদী এবং স্বাধীন। যাঁদের গান পরিবেশিত হল, তাঁদের মধ্যে ছিলেন শুভলক্ষ্মী, জোহরা বাই, গওহরজান, ইন্দুবালা দেবী, বেগম আখতার, গঙ্গুবাই হাঙ্গল, কিশোরী আমনকর, মিস শেফালি, জাহানারা, সিদ্ধেশ্বরী দেবী, নটী বিনোদিনী, হুসনা বাই, ঊষা উত্থুপ, লতা মঙ্গেশকর প্রমুখ। এঁদের গানগুলি গাইলেন রাজ্যশ্রী ভট্টাচার্য। সারেঙ্গিতে সহযোগিতা করলেন কমলেশ মিত্র। শিল্পীর কণ্ঠে ‘বীতি যায়ে বরখা ঋতু’, ‘পিয়াকো ঢুঁড়না যাও সখী’, ‘ফাঁকি দিয়ে প্রাণের পাখি উড়ে গেল, আর এল না’, ‘নির্জনে বোলো বঁধুয়ারে, দেখা হবে রাতে ফুলবনে’, ‘আজি বাজায়ে কানহা বাঁসুরি’ উল্লেখযোগ্য। প্রত্যেক গানের মাঝে শিল্পীদের জীবন সম্পর্কে আলোচনার মাধ্যমে উপস্থাপিত হল এই পরিবেশনা। পাঠ করলেন সংস্থার সদস্যরা। তবে কিছু কিছু সময়ে ঠিক ভাবে পাঠ করার দিকে আর একটু সচেতন হওয়ার প্রয়োজন ছিল। অনুষ্ঠানটি কিছুটা সংক্ষিপ্ত হলে মনে হয় আরও ভাল হত। তবে অনুষ্ঠানের ভাবনা নিঃসন্দেহে প্রশংসার যোগ্য। দ্বিতীয়ার্ধের অনুষ্ঠানে পরিবেশিত হল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘রবিবার’ গল্পের ইংরেজি অনুবাদ ‘সানডে’-র শ্রুতি-অভিনয়। এই গল্পটির সার্থক অনুবাদ করেছেন মৈত্রেয়ী চট্টোপাধ্যায় ও অরুণাভ সিংহ, যা অত্যন্ত মনোগ্রাহী হয়ে উঠেছিল। নির্দেশনা ও নাটকের ব্যাখ্যায় ছিলেন সোহাগ সেন। শ্রুতি-অভিনয়ে সোহিনী সেনগুপ্ত এবং সুজয় প্রসাদ চট্টোপাধ্যায় উপস্থিত শ্রোতাদের মোহিত করে রেখেছিলেন। ওঁদের স্বতঃস্ফূর্ত-শ্রুতি অভিনয় মনে রাখার মতো। শ্রুতিনাটকের আবহে সন্দীপন গঙ্গোপাধ্যায়ের অপূর্ব বেহালা বাদন নাটকের মেজাজধরে রাখে।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Cultural Program

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy