E-Paper

আধুনিকতার নীরব পাঠ

প্রদর্শনীতে চিত্রকলা ও ভাস্কর্যের নিবিড় মিলন লক্ষণীয়। ভারতীয় রেনেসাঁ থেকে সমকাল পর্যন্ত প্রসারিত এক ক্লাসিক দৃশ্যপট। নন্দলাল বসু, যামিনী রায়, মকবুল ফিদা হুসেন, বিকাশ ভট্টাচার্য, রাম কুমার, শ্যামল দত্তরায়, প্রকাশ কর্মকার— প্রতিটি নামই এক-একটি অধ্যায়।

পিয়ালী গঙ্গোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৬:৫৯
গভীরতর: নক্ষত্র গ্যালারিতে আয়োজিত শিল্প ও ভাস্কর্যের প্রদর্শনীর চিত্রকর্ম।

গভীরতর: নক্ষত্র গ্যালারিতে আয়োজিত শিল্প ও ভাস্কর্যের প্রদর্শনীর চিত্রকর্ম। —নিজস্ব চিত্র।

নক্ষত্র আর্ট গ্যালারিতে সম্প্রতি আয়োজন করা হয়েছিল এক বিশেষ শিল্প ও ভাস্কর্যের প্রদর্শনী। শিরোনাম, ‘এথেরিয়্যাল এক্সপ্রেশনস’। ভারতীয় আধুনিক শিল্পের দীর্ঘ পথচলার একটি সময়-সেতু। এ প্রদর্শনী কোনও নির্দিষ্ট আখ্যান নয়, এক ধরনের মৃদু প্রকাশ যেন! দৃশ্যমান শিল্পে অদৃশ্যের সন্ধান। বলা যেতে পারে, স্মৃতির রেশ, ক্ষণিক আলো, ধোঁয়াশা অনুভব— অর্থাৎ যা ধরা যায় না, সেই সবই হয়ে উঠেছে এখানে শিল্পের বিষয়। এখানে কোনও পুনরাবৃত্তি নেই, কোনও আপস নেই। এই ধরনের কাজে রেখা অনেক সময়ে ভাঙা, রং হালকা বা ধূসর। খালি স্পেসের ব্যবহার বেশি। কারণ শিল্পী চান, দর্শক নিজের মতো করে ছবির মধ্যে প্রবেশ করুন।

গভীরতর: নক্ষত্র গ্যালারিতে আয়োজিত শিল্প ও ভাস্কর্যের প্রদর্শনীর চিত্রকর্ম।

গভীরতর: নক্ষত্র গ্যালারিতে আয়োজিত শিল্প ও ভাস্কর্যের প্রদর্শনীর চিত্রকর্ম। —নিজস্ব চিত্র।

প্রদর্শনীতে চিত্রকলা ও ভাস্কর্যের নিবিড় মিলন লক্ষণীয়। ভারতীয় রেনেসাঁ থেকে সমকাল পর্যন্ত প্রসারিত এক ক্লাসিক দৃশ্যপট। নন্দলাল বসু, যামিনী রায়, মকবুল ফিদা হুসেন, বিকাশ ভট্টাচার্য, রাম কুমার, শ্যামল দত্তরায়, প্রকাশ কর্মকার— প্রতিটি নামই এক-একটি অধ্যায়। পাশাপাশি ভাস্কর সোমনাথ চক্রবর্তী, প্রফুল্ল সিংহ, তুষার কান্তি দাস রায়, মিলন সেনগুপ্ত, তাপস সরকার, দেবব্রত দে-র নির্মাণও ছিল সমান আকর্ষক। আধুনিক ও সমকালীন শিল্পের বিভিন্ন ধারার এই দর্শন বাস্তবিকই তাৎপর্যপূর্ণ। গ্যালারিতে ভারতীয় আধুনিকতার যে বিস্তৃত পরিসর দেখা যায়, তার একটি মৌলিক ধারণা তৈরি হয় নন্দলাল বসুর নম্র রেখা থেকে, রাম কুমারের বিমূর্ত ভূমিচিত্রে।

নন্দলাল বসুর সৃষ্টি দিয়ে শুরু করা যাক। কাগজের উপরে পেন-ইঙ্কে করা মোনোক্রম— ‘ভিলেজ লেডি’। নির্বাক গ্রামজীবনের সুদূর প্রান্তর। কোমরে কলসি নিয়ে পল্লিবধূর সেই চিরায়ত ভঙ্গি। দেহসৌষ্ঠবে শ্রমের ছাপ, আর রেখায় মমতার প্রলেপ। আদ্যোপান্ত জুড়ে নরম টোনে ধরা এক শান্ত চিত্রপট। পাশাপাশি জলরঙের শিব। নন্দলালের কাজে বরাবরের মতোই স্পষ্ট ভারতীয় ঐতিহ্যের সংযত উপস্থিতি। বাদামি পটভূমিতে টেম্পারায় আঁকা যামিনী রায়ের গ্রাম্যবধূ। এখানে রংই মূল ভাষা। দৃশ্যত সরল হলেও, তার ভিতরে লুকিয়ে আছে শক্ত কাঠামো। দুই পাশে দুই অনুষঙ্গ। মধ্যে কেন্দ্রীয় অবয়ব। লোকশিল্পের ছন্দে আধুনিক চেতনার স্বীয় স্থাপত্য।

গভীরতর: নক্ষত্র গ্যালারিতে আয়োজিত শিল্প ও ভাস্কর্যের প্রদর্শনীর চিত্রকর্ম।

গভীরতর: নক্ষত্র গ্যালারিতে আয়োজিত শিল্প ও ভাস্কর্যের প্রদর্শনীর চিত্রকর্ম। —নিজস্ব চিত্র।

প্রদর্শনীতে কাজের সংখ্যা বেশি হওয়ার কারণে স্পেস কিছুটা ঘন। দেখার ক্ষেত্রে কোথাও কোথাও অসুবিধে হয়। চোখ সময় নিতে চায়। তবুও দৃষ্টি আটকে যায় মকবুল ফিদা হুসেনের ছোট্ট একটি স্কেচে (১৯৬১)। গাছের নীচে উপবিষ্ট এক গ্রামের বধূ। কয়েকটি মাত্র রেখায় সম্পূর্ণ একটি দৃশ্য নির্মাণ। হুসেনের চিরচেনা স্বাক্ষরে ‘নারী ও প্রকৃতির যাপন’ (১৯৯০) মিশ্র মাধ্যমে রাতের আলাপ। রৈখিক আধারে ছবির রং যেমন রমণীয়, তেমনই কাজের টেক্সচার কৌতূহল বাড়ায়। বিকাশ ভট্টাচার্যের পেপারবোর্ডের কাজটি ষাটের দশকের দলিল। মোনোক্রমিক এই কাজটি আজও সমান প্রাসঙ্গিক। চেনা বাস্তবতার ভিতরে জমে থাকা অস্বস্তির ক্ষত।

জলরঙের অন্যতম বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী শ্যামল দত্তরায়। তাঁর শিরোনামহীন কাজটি (১৯৭৫) রিয়্যালিস্টিক হলেও ধারণাগত স্তরে গভীর। দৃশ্যের আড়ালে ভাবনার বিস্তার। প্রকাশ কর্মকারের নৌকা জল ছুঁয়ে আছে, আবার জল থেকে দূরেও। তেলরঙের চড়া নীল জল, মোটা দাগ ও কঠিন রেখা। প্রকৃতি এখানে একটি মানসিক অবস্থান (১৯৯৫)। একটি স্বপ্নিল কাঠামো। শিল্পী রাম কুমারের (১৯৯৫) নির্জন কঠিন স্থানচিত্রটি অ্যাক্রিলিক রঙের। জমির ক্ষেত্র বিভাজনের আনাচকানাচে ছড়িয়ে আছে স্মৃতির কর্কশ দাগ।

ভাস্কর্যের অংশে প্রবেশ করলে অভিজ্ঞতা বদলায়। এখানে শরীর কথা বলে। প্রফুল্ল সিংহের ‘ব্রাঞ্চিং পিস’ এক স্বর্ণাভ ধ্যানমগ্নতা। স্বচ্ছ রেজিনের ভিতরে আলো, বাইরে হাতে ধরা ব্রোঞ্জের প্রকৃতি। শরীর স্থির, মন প্রসারিত। এই ভাস্কর্যে শান্তি কোনও বিমূর্ত ধারণা নয়, এটি এক মানবিক অভ্যাস। ধ্যান আর জীবনের মিলন। অন্য দিকে পথের ধারে থাকা শৈশবে নিয়ে যায় তুষার কান্তি দাস রায়ের ‘বায়োস্কোপ’। ব্রোঞ্জের গায়ে জমে থাকা সময়। যন্ত্রের ভিতরে দৃশ্য, দৃশ্যের ভিতরে জীবন। সেখানে ছবি দেখাই ছিল এক সামাজিক উৎসব।

প্রদর্শনীতে উল্লেখযোগ্য নির্মাণ সোমনাথ চক্রবর্তীর ব্রোঞ্জে ‘ফিশারম্যান’, ‘অভিমন্যু’, ‘রিদম অব লাইফ’। শরীরের ভিতরে জমে থাকা শক্তির প্রকাশ। তীব্র চক্রাকার গতি। ফাইবার গ্লাসে শম্ভু মিত্রের প্রতিকৃতি নির্মাণে নিজেকে প্রমাণ করেন মিলন সেনগুপ্ত। সুর ও শরীরের মিলনে তৈরি ‘উয়োম্যান উইথ হারমোনিয়াম’ কাজটিতেও শিল্পী একই দক্ষতা দেখান। আর এক পারদর্শী ভাস্কর দেবব্রত দে-র একটি কাজ ‘উধম সিং’। ব্রোঞ্জে নিংড়ানো এক যুগ-প্রতিনিধি। ইতিহাসের ভার বহন করে চলা এক যন্ত্রণার দলিল। তাপস সরকারের ব্রোঞ্জে ব্যাক-আর্চিং ভঙ্গির ‘রিদম’-এ গতি আর ছন্দ সমান্তরাল। দেবজ্যোতি পুরকায়স্থর কাজ আবেশ পর্যায়ের। ব্রোঞ্জ নির্মিত ‘বিভোর’, ‘মাদার অ্যান্ড চাইল্ড’ কাজগুলিতে সংস্পর্শই মূল উদ্দেশ্য। শিল্পী সেখানে সফল।

গভীরতর: নক্ষত্র গ্যালারিতে আয়োজিত শিল্প ও ভাস্কর্যের প্রদর্শনীর চিত্রকর্ম।

গভীরতর: নক্ষত্র গ্যালারিতে আয়োজিত শিল্প ও ভাস্কর্যের প্রদর্শনীর চিত্রকর্ম। —নিজস্ব চিত্র।

ভারতীয় আধুনিক শিল্পের ইতিহাসে যে বহুমুখী প্রবাহ যুগপৎ সক্রিয় থেকেছে, এই প্রদর্শনী তারই একটি সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা মাত্র। সমকালীন সময়ে দাঁড়িয়ে ক্লাসিক ধারার এক প্রয়োজনীয় স্মরণ। আক্ষেপের বিষয় যেটি, শহরময় আঁকিয়ের ছড়াছড়ি। কিন্তু এই সব ঐতিহ্যের প্রতি আগ্রহ ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসছে। কিছু গ্যালারি দায়িত্ব নিয়ে আজও এই ধরনের প্রদর্শনী করেন, যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত ছবি দেখার অভ্যেস ফিরিয়ে আনার এক প্রচেষ্টা, যা এক সময়ে আর্ট কলেজে অবশ্যপাঠ্য ছিল। আজকের শিল্পীরা হয়তো আবার সে দিকেই ফিরবেন, যদি তাঁরা প্রকৃতই ছবির গভীরে প্রবেশ করতে চান।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Art exhibition Art Gallery

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy