পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) সংক্রান্ত মামলায় সুপ্রিম কোর্ট বিচার বিভাগীয় আধিকারিক নিয়োগের যে নির্দেশ দিয়েছে, তাকে কেন্দ্র করে শুরু হল রাজনৈতিক তরজা। পুরো ঘটনাকে রাজ্যবাসী ও মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘প্রতিবাদের জয়’ বলে ইতিমধ্যেই প্রচারে নেমেছে তৃণমূল কংগ্রেস। আর উদ্ভূত পরিস্থিতির জন্য পাল্টা রাজ্য সরকারকেই দায়ী করেছে বিজেপি। তবে এই নির্দেশ আদতে নির্বাচন কমিশন ও রাজ্য সরকারের ‘অপদার্থতা’র প্রমাণ বলে দাবি করেছে বাম ও কংগ্রেস। এই আবহে ২৮ ফেব্রুয়ারি চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ সম্ভব কি না, আর তা না-হলে পরিস্থিতি কোন দিকে গড়ায়, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে সংশ্লিষ্ট নানা শিবির।
সুপ্রিম-নির্দেশ সামনে আসার পরেই শুক্রবার ‘বাংলার জন্য জয়’ বলেছে শাসক দল। সেই সঙ্গে, এই মামলায় সুপ্রিম কোর্টে মুখ্যমন্ত্রীর সওয়ালের কথা মনে করিয়ে দিয়ে দলীয় ভাবে দাবি করা হয়েছে, ‘সুপ্রিম কোর্ট মান্যতা দিল মুখ্যমন্ত্রীর দাবিকেই! মুখ্যমন্ত্রীর বলিষ্ঠ আবেদনের পরে সর্বোচ্চ আদালত ঐতিহাসিক রায় দিয়েছে।’ বিজেপি ও জাতীয় নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের ‘আঁতাঁত’ও এই নির্দেশের ফলে প্রমাণিত হল হল বলে দাবি করেছে তারা। দলের সাংসদ মহুয়া মৈত্র বলেছেন, “কমিশন সু্প্রিম কোর্টের আগের নির্দেশ অমান্য করছিল। ইআরও, এইআরও-দের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নতুন করে পর্যালোচনায় পাঠাচ্ছিল। এই নির্দেশের ফলে বিজেপির সঙ্গে মিলে মানুষের নাম বাদ দেওয়ার ফন্দি সফল হবে না।” পাশাপাশি, পোর্টাল বন্ধের ফলে যে নথি ‘আপলোড’ করা যায়নি, এ দিন তা নিয়ে দেওয়া নির্দেশকেও ইতিবাচক বলে মনে করছে তৃণমূল।
তবে পুরো ঘটনার প্রেক্ষিতে রাজ্য সরকারকেই নিশানা করেছে বিজেপি। কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার বলেছেন, “কোর্টের পর্যবেক্ষণ, রাজ্য বাংলা জানা গ্রুপ-এ আধিকারিক দেয়নি বলে এত সমস্যা। কেন্দ্রের আধিকারিকেরা মাইক্রো অবজ়ার্ভার। তাঁদের ক্ষমতা নেই! গুজরাতে আমাদের পরে এসআইআর শুরু হয়ে তালিকা বেরিয়ে গেল। রাজ্য সরকারের ব্যর্থতা ও ইচ্ছাকৃত গাফিলতির জন্য পশ্চিমবঙ্গে সমস্যা হচ্ছে।” তবে এই বিষয়ে সরাসরি মন্তব্য না-করে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর বক্তব্য, “আমরা ত্রুটিমুক্ত ভোটার তালিকা চাই। আগেই বলেছি, সবে প্রাতরাশ হয়েছে। চূড়ান্ত ভোটার তালিকা বেরোনোর পরে বাকি কথা বলব।”
এই আবহে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে নিশানা করেছে সিপিএম। দলের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম বলেছেন, “কেন্দ্র, রাজ্য সরকার ও কমিশন কতটা অপদার্থ হলে বিচার বিভাগীয় আধিকারিকদের যুক্ত করতে হয়। বিচার ব্যবস্থা বলছে, সরকার ও কমিশনের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাসের অভাব। মানুষের ভরসা উঠে যাচ্ছে।” দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুজন চক্রবর্তীরও বক্তব্য, “সুপ্রিম কোর্ট কমিশন ও রাজ্য সরকারকে ভর্ৎসনা করেছে। এই নির্দেশের ফলে সরকারের অপদার্থতা প্রমাণিত হল। কমিশন বিজেপির হয়ে কাজ করে। আর নিজের রাজ্যের মানুষের জন্য নির্ভুল ভোটার তালিকা তৈরি রাজ্য সরকারের কর্তব্য হলেও, মিথ্যাচার করে তারা প্রমাণ করল, সেটা লক্ষ্য নয়। আসলে, রাজ্য সরকার ও কমিশন মিলে ভোটার তালিকা নিয়ে ছ্যাবলামি করছে!” যুক্তিগ্রাহ্য অসঙ্গতি (লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি) ও নথি যাচাইয়ের নামে যা চলছে, তার প্রতিবাদ জানাতে আজ, শনিবার রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের (সিইও) দফতরে যাবে সিপিএম। তার পরে ২৭ তারিখ দিল্লিতে কমিশনে যাওয়ার কথা সেলিমদের।
প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকারও বলেছেন, “রাজ্যে নির্বাচনী ব্যবস্থা যে ভেঙে পড়েছে, এই নির্দেশ তার প্রতিফলন। কমিশন ও রাজ্য সরকার সাংবিধানিক প্রক্রিয়া লঙ্ঘন করার জন্যই এই হাল। বিচার ব্যবস্থার কাছে আমাদের আবেদন, ২৮ তারিখ চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের আগে ফর্ম ৬, ৭, ৮-এর আওতায় থাকা সব আবেদনের যথাযথ শুনানি হোক।” চূড়ান্ত ভোটার তালিকা থেকে ‘অন্যায়’ ভাবে কারও নাম বাদ গেলে ভোটের আগে তাঁদের আবেদনের সময় দেওয়ার দাবিও জানিয়েছে কংগ্রেস।
এরই মধ্যে ক্যানিং পূর্ব বিধানসভা এলাকায় প্রায় ৩৫ হাজার ৬০০ ভোটারের নাম বাদ পড়ার আশঙ্কায় কমিশনের বিরুদ্ধে জীবনতলা থানায় অভিযোগ করেছেন স্থানীয় তৃণমূল বিধায়ক সওকাত মোল্লা-সহ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ৭ জন ভোটার। পুলিশ জানিয়েছে, বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। বিধায়কের অভিযোগ, “পরিকল্পিত ভাবে দরিদ্র ও সংখ্যালঘুদের ভোটাধিকার কাড়ার চেষ্টা চলছে।” পুরো বিষয়টিকেই ‘রাজনৈতিক নাটক’ বলে কটাক্ষ করেছে বিজেপি।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)